চিত্র। পেজ ১০৮
চিত্র : আমাদের পূর্বপুরুষেদের মধ্যেও ঈর্ষা যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। যাদের মধ্যে ঈর্ষা ছিল না তাঁরা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না, তারা কোনো উত্তরসূরী রেখে যান নি।
তবে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন ঈর্ষা এবং প্রতারণার রকমফের নারী পুরুষে ভিন্ন হয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অনুকল্প অনুযায়ী যৌনতা সংক্রান্ত হিংসা কিংবা ঈর্ষার ব্যাপারটি আসলে জৈবিকভাবে অনেকটাই পুরুষদের একচেটিয়া, যাকে বলে–’সেক্সুয়াল জেলাসি বা যৌন-ঈর্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-কেবল পুরুষদেরই যৌন ঈর্ষা থাকবে কেন? কারণ হচ্ছে, সঙ্গমের পর গর্ভধারণ এবং বাচ্চা প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটা নারীরা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে, পুরুষদের আর কোনো ভূমিকা থাকে। ফলে পুরুষরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী–আধুনিক ‘ডিএনএ টেস্ট আসার আগ পর্যন্ত আসলে কোনো পুরুষের পক্ষে একশত ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা সম্ভব ছিল না যে সেই তার সন্তানের পিতা। কিন্তু মাতৃত্বের ব্যাপারটা কিন্তু নয়। মাকে যেহেতু গর্ভধারণ করতে হয়, প্রত্যেক মাই জানে যে সেই তার সন্তানের মা। অর্থাৎ, পিতৃত্বের ব্যাপারটাশতভাগ নিশ্চিত না হলেও মাতৃত্বের ব্যাপারটা নিশ্চিত। এখন চিন্তা করে দেখি আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন বনে জঙ্গলে ছিল অর্থাৎ শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে জীবন চালাতো, তখন কোনো সুনিয়ন্ত্রিত একগামী পরিবার ছিল না। ফলে পুরুষদের আরও সমস্যা হতো নিজেদের ‘পিতৃত্ব নিয়ে। পিতৃত্বের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ বিবর্তনের স্বার্থপর জিনের (selfish gene) ধারকেরা স্বার্থপরভাবেই চাইবে কেবল তার দেহেরই প্রতিলিপি তৈরি হোক। কিন্তু চাইলেই যে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে তা তো নয়। সম্পর্কে প্রতারণা হয়। তার স্ত্রী যে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি করে গর্ভধারণ করবে না, তা সে কীভাবে নিশ্চিত করবে? আদিম বন-জঙ্গলের কথা বাদ দেই, আধুনিক জীবনেও কিন্তু প্রতারণার ব্যাপারটা অজানা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় শতকরা প্রায় ১৩ থেকে ২০ ভাগ পুরুষ অন্যের সন্তানকে নিজ সন্তান’ ভেবে পরিবারে বড় করে। জার্মানিতে সেই সংখ্যা ৯ থেকে ১৭ ভাগ। সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার শতকরা ৯ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়[১১৫]। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অন্যের (অর্থাৎ নন- জেনেটিক) সন্তানকে নিজ সন্তান ভেবে বড় করার এই প্রতারণাকে বলা হয় কাকোন্ট্রি (cuckoldry), যার বাংলা আমরা করতে পারি—কোকিলাচরণ[১১৬]।
চিত্র। পেজ ১০৯
চিত্র : সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার (কোকিলাচরণ) শতকরা ৪ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়। যে সমস্ত পুরুষেরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান (উপরের গ্রাফে লো কনফিডেন্স গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত), তাদের পরিবারে নন জেনেটিক সন্তান বেশি পাওয়া গেছে, প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ[১১৭]।
এখন কথা হচ্ছে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রভাবকী? প্রভাব হচ্ছে, কাকোল্ড্রি বা কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা পুরুষের জন্য এক ধরনের অপচয়। কারণ সে ভুল ভাবে অন্যের জিনের প্রতিলিপি নিজের প্রতিলিপি হিসেবে পালন করে শক্তি বিনষ্ট করবে। এর ফলে নিজের জিন জনপুঞ্জে না ছড়িয়ে সুবিধা করে দেয় অন্যের জিন সঞ্চালনের, যেটা ‘সেলফিশ জিন’ পারতপক্ষে চাইবে না ঘটতে দিতে। ফলাফল? ফলাফল হচ্ছে, পুরুষেরা মূলত ‘সেক্সয়ালি জেলাস’ হিসেবে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বেড়ে উঠে। তারা নিশ্চিত করতে চায় যে, তার যৌনসঙ্গী বা স্ত্রী, কেবল তার সাথেই সম্পর্ক রাখুক, অন্য পুরুষের সম্পর্ক এড়িয়ে কেবল তার সাথেই চলুক। এইটা বজায় রাখতে পারলেই সে শতভাগনা হোক, অন্তত কিছুটা হলেও নিশ্চয়তা পাবে যে, তার এই সম্পর্কের মধ্যে কোকিলাচরণ ঘটার সম্ভাবনা কম। এজন্যই ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ ট্রেডিশনাল সমাজগুলোতে মেয়েদের হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয়, কিংবা বাইরে কাজ করতে দেয়া হয় না– এগুলো আসলে প্রকারান্তরে পুরুষতান্ত্রিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’রই বহিঃপ্রকাশ।
চিত্র। পেজ ১১০
চিত্র : ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ সনাতন সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের যে হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয়–এগুলো আসলে প্রকারন্তরে পুরুষতান্ত্রিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’-রই বহিঃপ্রকাশ।
আসলে নারীকে অন্তরীণ করে, তাদের অধিকার এবং মেলামেশা সীমিত করার মাধ্যমে সে সব দেশে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার জিনের প্রতিলিপিই তার স্ত্রীর শরীরে তৈরি হোক, অন্য কারো নয়। কারণ স্ত্রীর কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা তার জন্য হয়ে উঠে সময় এবং অর্থের অপচয়’। পুরুষালি ঈর্ষার মূল উৎস এখানেই। ডেভিড বাস তার ‘Human Mating Strategies’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে সেজন্যই লিখেছেন[১১৮]—
যেহেতু মানব শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণুর নিষেকের পুরো প্রক্রিয়াটিই নারীর দেহাভ্যন্তরে ঘটে, পুরুষের মধ্যে নিজের সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। অপর পক্ষে মাতৃত্ব নিয়ে একটি নারীর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, এখানে নিশ্চয়তা শতভাগ, তা সেটা যে শুক্রাণু দিয়েই নিষিক্ত হোক না কেন! কাজেই যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততা কেবল একটি পুরুষের (জেনেটিক) পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে, নারীর মাতৃত্ব থেকে নয়।… এ সকল কারণে, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোনো আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মনক্ষুণ্ণ হবে।
