‘ [ঈশ্বরের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে] আমরা কী হারাবো? আমরা হারাবো বৌদ্ধিক সততা, আত্মসম্মানবোধ, হারাবো একটা চৌকস জীবন-দর্শন। সংক্ষেপে, জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে যা যা লাগে, সবই হারিয়ে ফেলব আমরা। না প্যাস্কেলের ওয়েজার কোন নিরাপদ বাজি নয়, বরং এটি জীবন আর সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে কেনা ছলনা।
.
বিশ্বাস ও শিশু নিপীড়ন
একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। শিশুদের প্রসঙ্গে। আমরা কথায় কথায় আমাদের শিশুদের পরিচয় উদ্ধৃত করে বলি ‘মুসলিম শিশু’, ‘খ্রিস্টান শিশু’, ‘হিন্দু শিশু’ ইত্যাদি। অথচ, যে শিশুটিকে মুসলিম, খ্রিষ্টান বা হিন্দু পরিচয়ে বড় করা হচ্ছে তার পুরোটুকুই আসলে ছোটবেলা থেকে অভিভাবকের জোর করে চাপানো। স্বাধীনভাবে বুঝে শুনে শিশুকে ধর্ম গ্রহণের অধিকার দেয়া হয়নি, বরং ছোটবেলা থেকে বুদ্ধি শুদ্ধি হবার আগেই ধর্মীয় সবক শুনিয়ে করা হয়েছে ব্রেন ওয়াশ! চিন্তা করে দেখুন, প্রাত্যহিক। জীবনে অন্য অনেক কিছুই আমরা শিশুদের থেকে দূরে রাখি– তার পর্যাপ্ত বয়স হয়নি বলে, অথচ ধর্মের বেলায় নিয়ম কানুন একদম উল্টো। সঠিকভাবে চিন্তা করলে বলতেই হয়– ‘মুসলিম শিশু’ বলে কিছু নেই, বলা উচিৎ ‘মুসলিম অভিভাবকের শিশু। ঠিক তেমনি ‘খ্রিস্টান সন্তান না হয়ে হওয়া উচিৎ খ্রিস্টান পিতামাতার সন্তান। হিন্দুদের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু কে বুঝবে সেটা! নিজের বিশ্বাসের ভাইরাস’ শিশুদের মানসজগতের উপর জোর খাটিয়ে প্রবেশ করানো যে একধরণের পীড়ন– এই বোধটুকুই আমাদের সমাজে গড়ে উঠেনি। তবে আশার কথা যে, পশ্চিমা বিশ্বে মানবতাবাদী এবং যুক্তিবাদী দার্শনিকদের মধ্যে এ নিয়ে কিছুটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন, বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক রিচার্ড ডকিন্স এই জোর করে অভিভাবকদের নিজেদের (অপ) বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আচার আচরণ ও প্রথা শিশুর উপর চাপিয়ে দেয়াকে খুব সঠিকভাবেই এক ধরণের ‘শিশু নিপীড়ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন তার ‘গড ডিলুশন’ বইয়ে[২০৭], এবং এ নিয়ে সবাইকে সচেতন হতে পরামর্শ দিয়েছেন।
মুক্তমনা সদস্য অভীক দাশ একবার একটি চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছিলেন মুক্তমনায় ‘ধর্ম:শিশু নির্যাতনের এক স্বীকৃত হাতিয়ার’ শিরোনামে। প্রবন্ধটির, প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পুরো প্রবন্ধটি এখানে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি[২০৮]–
শিরোনাম দেখে আপনাদের অনেকেই ভাবছেন আমি হয়তো পশ্চিমা চার্চগুলোর যাজকদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের কথা বলছি। আসলে তা নয়। আমি এখানে বোঝাচ্ছি শিশুকে মানসিকভাবে পরিণত হওয়ার আগেই একটি ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়াও এক প্রকারের ‘শিশু নির্যাতন। আমেরিকা, ইউরোপের বিভিন্ন চার্চে শিশুদের উপর যাজকদের চালানো যৌন নির্যাতনের ভয়াল কাহিনি আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। পাশের দেশ ভারতেও ফঁস হয়ে গেছে প্রভাবশালী ধর্মগুরু নিত্যানন্দের যৌন কেলেঙ্কারির কথা। আমাদের দেশেও মাদ্রাসায় হুজুর কর্তৃক ছাত্র-ছাত্রীদের যৌন নির্যাতিত হওয়ার ঘটনার খবর কদিন পরপরই পত্রপত্রিকায় আসে। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় পাপের ও শাস্তির ভয় দেখিয়ে এসব শিশুদের ঘটনা চেপে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কখনো আবার হুজুর নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকেন এভাবে, “আমার উপর শয়তান ভর করেছিল। এতে আমার কি দোষ”। আমরা পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টকেও দেখেছি ভ্যাটিকানের যাজক, কার্ডিনালদের কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেয়ার জন্য ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে। তারা এমনও দাবি করেছে যে শিশুরাই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পছন্দ করে। নির্যাতনকারী নরপশুরা ভালভাবেই জানে, শিশুদের মনে এই ভয় কতটা প্রবলভাবে কাজ করে। এমন ঘটনা ওই শিশুদেরকে মানসিকভাবে যে আঘাত হানে, সে আঘাত অনেক ক্ষেত্রে তারা সারা জীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারে না। একইভাবে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল কোন শিশুর মস্তিষ্কে, কোন কিছু বোঝার মত বয়স হওয়ার আগেই কোন ধারণা বা বিশ্বাস চাপিয়ে দেয়াটাও কিন্তু শিশুদের জন্য কম ক্ষতিকর নয়।
কারও ধ্যান-ধারণাকে নিজের সন্তানের উপর চাপিয়ে দেয়ার কোন অধিকার যে কারও নেই সেটা লেবাননের বিখ্যাত কবি কাহলিল জিবরান তার ‘On Children কবিতায়ও উল্লেখ করেছেন,
‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়।
জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্রকন্যা।
তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়।
এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও।
তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,
কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে।
তুমি তাদের শরীরকে বাসগৃহ জোগাতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে নয়।
কারণ তাদের আত্মা বাস করে ভবিষ্যতের ঘরে। যেখানে তুমি যেতে পারো না,
এমনকি তোমার স্বপ্নের মধ্যেও নয়।
তুমি তাদের মতো হওয়ার সাধনা করতে পারো, কিন্তু
তাদের তোমার মতো বানানোর চেষ্টা কোরো না।
কারণ জীবন পেছনের দিকে যায় না, গতকালের জন্যে বসেও থাকে না।
তোমরা হচ্ছ ধনুক, আর তোমাদের সন্তানেরা হচ্ছে ছুটে যাওয়া তির।
ধনুর্বিদ অনন্তের পথে চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন তার তির ছোটে
দ্রুত আর দূরে।
