যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চুর্ণ হইয়াছে। আমরা প্রথমত যাহা মানি নাই, তাহা পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য করিয়াছি। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষ-গন ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষোচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে।
ধর্মে বিশ্বাস রেখে পুরুষের সমান অধিকারও দাবি করাটা নারীদের জন্য অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতোই হাস্যকর ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। ধর্ম আঁকড়ে থাকতে গেলে এর চেয়ে বিপরীত চিত্র আশা করা যায় না। কারণ ধর্ম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দেয়নি। অশিক্ষিত মোল্লা, পুরোহিতরা দেবে এমন ভাবনা হাস্যকর। তারা নারীদের উন্নয়নের কথা ভাবে না, বরং তারা ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠানের সর্বাঙ্গীণ সেবাদাস। নন্দিনীর মতে, ‘খোদ ‘ধর্ম বিষয়টাই উপড়ে ফেলতে পারলে, মানব সভ্যতা রক্ষা পেলেও পেতে পারে। নন্দিনীর মত অন্য সকল নারীরা এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, তত তাড়াতাড়ি হয়তো ঘটবে বিশ্বাসের ভাইরাস থেকে মুক্তি।
০৭. ধর্মগুলো টিকে আছে কীভাবে?
একটি যুক্তি আমাকে প্রায়ই মোকাবেলা করতে হয়– ধর্ম ব্যাপারটা যদি এতো ক্ষতিকারক হয় তাহলে সেটা পৃথিবীতে টিকে আছে কীভাবে? শুধু ধার্মিকেরা নয়, এমনকি যারা বিবর্তনে বিশ্বাস করেন তাদের জন্যও ব্যাপারটা অনেকটা ধাঁধার মতো। প্রায়ই এধরণের বাক্য আমরা উচ্চারিত হতে দেখি–
‘ধর্মের যদি কোন উপযোগিতাই না থাকে, যদি সেটা নিষ্ফল এবং ক্ষতিকারকই হয়ে থাকে, তবে লক্ষ লক্ষ বছরের প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার ছাকনিতে পড়ে সেটা কি বিলুপ্ত হয়ে যাবার কথা ছিল না?
উপরের উক্তিটি এক ধর্মীয় ব্যঙ্গনবিশ (religious satirist) বেকি গ্যারিসনের। তবে গ্যারিসনেরটা আলোচনার জন্য তুলে দিলেও এ ধরণের উক্তি সব জায়গাতেই কমবেশি দেখা যায়। পাওয়া যায় বাংলা ব্লগ সাইটগুলোতেও। এমনকি আমাদের দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানও শাহবাগ আন্দোলনের সময় নাস্তিকদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী কিছু লেখা লিখেছিলেন, সেখানে তিনি কিছু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছিলেন, এবং বলতে চেয়েছেন, ধর্মের উপযোগিতা আছে বলেই সেটা পৃথিবীতে টিকে আছে।
কিন্তু সত্যই কি তাই? আমরা এই প্রবন্ধে প্রদত্ত যুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা করব। বলা বাহুল্য, এখানে আমি নতুন কিছু পাঠকদের জন্য শোনাচ্ছি না। বহু বিশ্লেষকই অতীতে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ যুক্তিমালা চ্যালেঞ্জ করেছেন, এর দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছেন। সেগুলোই মূলত আলোচনায় আনব। যেমন, এ প্রসঙ্গে ক্রেইগ এ জেমসের ‘দ্য রিলিজিয়ন ভাইরাস’ বইটির কথা বলা যায়। বইটির নাস্তিকদের ধাঁধা’ শিরোনামের একটি অধ্যায়ে বেকি গ্যারিসনের যুক্তিগুলো নিয়ে জেমস পুঙ্খানুপুঙ্খা আলোচনা করেছেন। আসলে বেকির এই ধাঁধার উত্তর খুব সহজ। বেকি যে বলেছেন, কোন কিছু ক্ষতিকর মনে হলেই যে সেটা প্রাকৃতিক নির্বাচনের হাঁকনিতে পড়ে বাতিল বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, সেটা ঠিক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে উলটো। বহু ভাইরাস, প্যারাসাইট প্রকৃতিতে টিকে আছে তারা জীবজগতের জন্য ক্ষতিকারক প্রমাণিত হবার পরেও। সত্য বলতে কি ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা জীবজগতের সামগ্রিক সংখ্যার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। আমাদের দেহেই দেহকোষের চেয়ে অন্তত দশগুণ বেশি ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার বাসা আর কোন কিছু ক্ষতিকারক হলেই যদি সেটা বিলুপ্ত হয়ে যেত, তবে, আমাদের দেহে ক্যান্সারের মতো মরণরোগ বাসা বাঁধতে পারত ন, এইচআইভি ভাইরাস হুমকি হয়ে দাঁড়াতো না। সোয়াইন ফ্লু, সার্স, ম্যাড কাউ সহ হাজারটা অণুজীব নিয়ে আমাদের এখনো প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হতে না। ধর্মও মানব সমাজে প্রোথিত হয়ে আছে, টিকে আছে অনেকটা ভাইরাসের মতোই।
.
ধর্মের উপযোগিতা?
বেকি গ্যারিসনের যুক্তিকে অন্যভাবেও মোকাবেলা করা যেতে পারে, যেটি করেছেন অধ্যাপক রিচার্ড ডকিন্স তার বহুল বিক্রিত ঈশ্বর বিভ্রান্তি গ্রন্থে।
ডকিন্স মানব সভ্যতাকে অনেকটা শিশুদের মানসজগতের সাথে তুলনা করেছেন। আমরা জানি ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় বড়দের কথা মেনে চলার, তাদের কথা শোনার। আমার মনে আছে আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম যে কবিতা ‘নার্সারি রাইম হিসেবে মুখস্থ করেছিলাম সেটি ছিল এরকমের–
‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি
সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে
আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে’।
এই যে ‘গুরুজনেরা যে আদেশ করবেন সেটা ‘ভাল মনে করে যেতে হবে সেটা ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়। এর কারণ আছে। শিশুদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই একটা সময় পর্যন্ত অভিভাবকদের সমস্ত কথা নির্দ্বিধায় মেনে চলতে হয়। নদীর পাড়ে যায় না, ওখানে কুমির থাকে’, ‘চুলায় হাত দেয় না, হাত পুড়ে যাবে’, ‘না ধুয়ে আপেল খায় না, পেট খারাপ করবে’– বড়দের দেয়া এই ধরনের অভিভাবকদের দেয়া উপদেশাবলি আমরা বংশপরম্পরায় বহন করি– কারণ এ উপদেশগুলো সঠিকভাবে পালন করলে আমরা প্রকৃতিতে সফলভাবে টিকে থাকতে পারি, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। যে শিশুরা অভিভাবকের অবাধ্য হয়ে নদীর পারে গেছে হয়তো কুমীরের খাদ্য হয়েছে, যে শিশু মায়ের উপদেশ না শুনে আগুনে হাত দিয়েছে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে, তারা কোন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রেখে যেতে পারেনি। প্রজন্ম সফলভাবে রক্ষা করতে পেরেছে সে সমস্ত শিশুরাই যারা অভিভাবকদের কথা বিশ্বাস করেছে, তাদের উপদেশের অবাধ্য হয়নি। ফলে বিবর্তনগতভাবে একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে শিশুদের উপর যে অভিভাবকদের কথা, গুরুজনদের উপদেশ, গোত্ৰাধিপতিদের নির্দেশ পালন করতে হবে, নইলে টিকে থাকতে সমস্যা হবে। এখন কথা হচ্ছে– তারাই যখন অসংখ্য ভাল উপদেশের পাশাপাশি আবার কিছু মন্দ অর্থহীন কিংবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন উপদেশও দেয়– মঙ্গলবারে মন্দিরে পাঁঠাবলি না দিলে অমঙ্গল হবে’, কিংবা গোলাধিপতি যখন বলেন, সূর্যগ্রহণের সময় নামাজে কুসূফ পড়তে হবে, নইলে সূর্য আর আকাশে উঠবে না‘– তখন শিশুর পক্ষে সম্ভব হয় না সেই মন্দ বিশ্বাসকে অন্য দশটা বিশ্বাস কিংবা ভাল উপদেশ থেকে আলাদা করার। সেই মন্দ-বিশ্বাসও বংশপরম্পরায় সে বহন করতে থাকে অবলীলায়। গুরুজনদের উপদেশ বলে কথা! সব বিশ্বাস হয়তো খারাপ কিংবা ক্ষতিকর নয়, কিন্তু অসংখ্য মন্দ বিশ্বাস অনেক সময়ই জন্ম দিতে পারে বিশ্বাসের ভাইরাসের’। তখন গোত্ৰাধিপতিদের কথাকে শিরোধার্য করে তার একনিষ্ঠ অনুগামীরা বিধর্মীদের হত্যা করা শুরু করে, ডাইনি পোড়ানোতে কিংবা সতীদাহে মেতে উঠে, কখনো গণ-আত্মহত্যায় জীবন শেষ করে দেয় কিংবা বিমান নিয়ে সোজা হামলে পড়ে টুইন টাওয়ারের উপর।
