ঈশ্বর (সডোম এবং গোমরাহ) উপত্যকার সমস্ত নগর ধ্বংস করলেন। কিন্তু ঈশ্বর ঐ নগরগুলি ধ্বংস করার সময় অব্রাহামের কথা মনে রেখেছিলেন এবং তিনি অব্রাহামের ভ্রাতুস্পুত্রকে ধ্বংস করেন নি। লুত ঐ উপত্যকার নগরগুলির মধ্যে বাস করছিলেন। কিন্তু নগরগুলি ধ্বংস করার আগে ঈশ্বর লুতকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
পয়গম্বর লুত যোয়ার শহরে গিয়ে এক পাহাড়ে দুই মেয়েকে নিয়ে বাস করতে লাগলেন। তিনি শহরে বাস করতে ভয় পাচ্ছিলেন আর আর সেই কারণে পাহাড়ের একটি গুহায় বাস করতে লাগলেন।
বড় কন্যাটি তার ছোট বোনটিকে বললো, “আমাদের পিতা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এবং নগরী ধ্বংস হয়ে যাবার পর আমাদের সন্তানাদি দিতে পারে এমন অন্য পুরুষ এখানে নেই। চল আমরা আমাদের বাবাকে মদ খাইয়ে করিয়ে মাতাল করে ফেলি এবং তার সাথে সঙ্গমের বন্দোবস্ত করি– যাতে করে আমরা আমাদের বাবার বীজকে সংরক্ষণ করতে পারি। আমাদের পরিবার রক্ষা করার জন্যে আমরা এইভাবে আমাদের পিতার সাহায্য নেব!”
অতঃপর তারা সেই রাত্রে তাদের বাবাকে মদ্যপান করালো এবং প্রথম কন্যাটি তার সাথে রাত্রি যাপন করলো। কখন মেয়েটি আসলো, রাত্রি যাপন করলো এবং উঠে চলে গেলো, তিনি (পয়গম্বর লুত) কিছুই জানতে পারলেন না।
পরের রাত্রে প্রথম কন্যাটি তার ছোট বোনটিকে বললো, “গত রাত্রে আমি পিতার সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েছি। আজ রাতে আবার তাকে দ্রাক্ষারস পান করিয়ে বেহুঁশ করে দেব। তাহলে তুমি তাঁর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করতে পারবে। এভাবে আমরা সন্তানাদি পেতে আমাদের পিতার সাহায্য নেব। এতে আমাদের বংশধারা অব্যাহত থাকবে”।
অতঃপর সেই রাত্রেও তারা তাদের বাবাকে মদ্যপান করালো এবং ছোট কন্যাটি তার সাথে রাত্রি যাপন করলো। কখন মেয়েটি আসলো, রাত্রি যাপন করলো এবং উঠে চলে গেলো, তিনি (পয়গম্বর লুত) কিছুই জানতে পারলেন না।
আর এভাবেই পয়গম্বর লুতের দুই মেয়ে তাদের পিতার ঔরসজাত সন্তান গর্ভে ধারণ করলো। প্রথম কন্যার গর্ভে একটি ছেলে সন্তান জন্ম হলো– যার নাম রাখা হলো মোয়াব। তিনিই হলেন মোয়াবাইটস জাতির পিতা (অর্থাৎ তার বংশধরেরা মোয়াবাইটস নামে পরিচিতি লাভ করলো)। ছোট কন্যাটিও এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। তার নাম বিন্-অম্মি। বর্তমানে যে অম্মোন জাতি আছে তাদের আদিপুরুষ হলেন বিন্-অম্মি।
এই হচ্ছে বাইবেলের সুমহান নৈতিকতার কাহিনি। নারী নিপীড়নেও যেন ধর্মগুলো একেবারে ‘আয় তব সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি। হিন্দু ধর্ম শেখায়, নারীর অধরে পীযুষ আর হৃদয়ে হলাহল, এ জন্যই তাদের অধর আস্বাদন এবং হৃদয়ে পীড়ন করা কর্তব্য। নারীর শুধু হৃদয়ে পীড়ন করাই নয়, শারীরিক নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে, শতপথ ব্রাহ্মণের ৪/৪/২/১৩ নং শ্লোকে : “বজ বা লাঠি দিয়ে মেরে নারীকে দুর্বল করা উচিৎ, যাতে নিজের দেহ বা সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার না থাকতে পারে”; বৃহদারণ্যক উপনিষদে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেন : “স্ত্রী স্বামীর সম্ভোগকামনা চরিতার্থ করতে অসম্মত হলে প্রথমে উপহার দিয়ে স্বামী তাকে ‘কেনার চেষ্টা করবে, তাতেও অসম্মত হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মেরে তাকে নিজের বশে আনবে” (৬/৪/৭, ১/৯/২/১৪ দ্রঃ)। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই বিধানটা ইসলাম ধর্মের সাথেও যেন একেবারে মিলে যায়। নারীকে প্রহার করার জন্য আল্লাহ বিধান দিয়েছেন কোরআন শরিফের সুরা নিসায়: “ওয়াল্লা-তি তাখা-ফু-না নুশু-জাহুন্না ফাআ-জিহুন্না ওয়াহজুরু-হুন্না ফি আলমাদা-জিয়ি ওয়াদরিবুহুন।” বাংলা হচ্ছে, নারী যদি পুরুষের অবাধ্য হয়, যদি নারী বিদ্রোহ করে, তাদেরকে প্রথমে বুঝাও, তাতে যদি কাজ না হয় তাহলে তোমার বিছানায় আসতে নিষেধ করো, তাতেও যদি বশ না মানে, তাদেরকে প্রহার করো (সুরা ৪, নিসা, আয়াত ৩৪)।
নারীকে আজ বেঁচে উঠতে হবে। বেরুতে হবে এই প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের নাগপাশ থেকে। নিজেকে গড়ে তুলতে হবে এই সমস্ত নারীবিদ্বেষী ভাইরাসের এন্টিবডি হিসেবে। আশার কথা বর্তমানে বহু রাষ্ট্রই এই সব মধ্যযুগীয় বিশ্বাসের ভাইরাস প্রতিরোধ করে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। পেছনে পড়ে রয়েছে কেবল কিছু মুখচেনা ‘ভাইরাস আক্রান্ত রাষ্ট্র। সেখানে মেয়েরা গৃহবন্দি থাকে। গাড়ি চালাতে পারে না, পুরুষদের সাথে বাইরে কাজ করতে পারে না, আবৃত করে রাখতে হয় সর্বাঙ্গ। কখনো চার সতীনের সাথে ঘর করে, কখনো বা থাকতে হয় কোন বাদশাহর হারেমের অংশ হয়ে। পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরবের মত রাষ্ট্রগুলোতে জেনা এবং হুদুদ আইন ধর্ষনকারীদের রক্ষা কবচ হিসবে ব্যবহৃত হয়। ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য চারজন সাক্ষী’ প্রায় কোন ক্ষেত্রেই মেয়েটির পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব হয় না, ফলে শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, ধর্ষণকারীর ঘটে মুক্তি, আর ‘জেনা’ করার দায়ে মেয়েটার কপালে জুটে ‘শরিয়ার রজম’। অনেক সময় দেখা যায়, মেয়েটির পরিবারই হতভাগ্য মেয়েটিকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দেয় পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য।
ধর্মগুলোর রচয়িতা পুরুষ। কোন ধর্মই যেহেতু নারীর প্রয়োজনে বা নারীর কল্যাণে সৃষ্টি হয়নি; নারীর ধর্ম-কাতরতা আর ধর্ম-মাদকতা তাই দূর করা প্রয়োজন, তাদের নিজেদেরই কল্যাণের জন্য। ধর্ম রচিত হয়েছে পুরুষদের দ্বারা, পুরুষদের জন্য, নারীর কল্যাণের জন্য নয়। বেগম রোকেয়া এ প্রসঙ্গে আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেন–
