একটি সার্থক কৌতুক আসলে একটি সার্থক মিমের উদাহরণ। চিন্তা করে দেখুন– একটা জোক আসলে কিছুই নয়, কেবল কতগুলো তথ্যের সমাহার। অথচ সেটাই পুনরাবৃত্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আমার আপনার মস্তিষ্ক তথা হোস্টের প্রেষণার মাধ্যমে।
একটি কৌতুক, তা যত সরলই হোক না কেন, মিমের কাজ বোঝার জন্য খুব ভাল একটা উদাহরণ। তবে কৌতুককে মিম হলেও ঠিক সেভাবে ‘ভাইরাস’ বলা যাবে না। কারণ এর মধ্যে ভীতিকর কোন নির্দেশনা নেই, নেই কোন অনিষ্টের আলামত। সেগুলো যদি যুক্ত হয় তবে মিমের অবস্থা কী দাঁড়ায় সেটা আমরা দেখব পরের অনুচ্ছেদে।
.
ভয়াল নির্দেশিকা
যারা প্রথম প্রথম ইমেইল ব্যবহার শুরু করেন, তাদের প্রায় সবাইকেই একটা বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ধাতস্থ হতে হয়। স্প্যাম এবং চেইন ইমেইল। আমি যখন প্রথম প্রথম হটমেইল এবং ইয়াহু মেইল ব্যবহার করা শুরু করা শুরু করেছিলাম, তখন প্রায় প্রতিদিনই গাদা খানেক ইমেইল পেতাম, যেগুলোর নীচে লেখা থাকতো ‘দ্যা করে অন্তত ৫ জনকে মেইলটি ফরওয়ার্ড করুন, নইলে সমূহ বিপদ। এক ভদ্রলোক এই ইমেইল পেযেও চুপ করে বসে ছিলে। তাকে দুই দিনের মাথায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে…’ ইত্যাদি। আমার বন্ধুদের অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সেটা তার অন্য বন্ধুদের কাছে ফরওয়ার্ড করে দিতেন। যারা আমার মতো একটু সংশয়বাদী ধাঁচের তারা হয়তো মুচকি হেসে ট্রাশে চালান করে দিতেন। তবে বিশ্বাসী মস্তিষ্কের কাছে এই চেইন ইমেইলগুলো একেকটি সার্থক ভাইরাস। দেদারসে তারা সেগুলো তাদের বন্ধু তালিকার সবাইকে চালান করে দিতেন। এমনও হত যে, সেই একই ইমেইল আবার ঘুরে ঘুরে আমার কাছে চলে আসতো মাস খানেক পর চেইনের আকার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেযে।
তো এই যে আমি নিজেকে এত সংশয়বাদী হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাচ্ছি, সেই আমিও একবার ‘রাম ধরা খেয়ে গিয়েছিলাম। তবে চেইন ইমেইলের ক্ষেত্রে নয়, আরেকটি ক্ষেত্রে। সেই গল্প বলি।
তখন সবে মাত্র চাকরিতে ঢুকেছি আটলান্টার একটা ছোট কোম্পানিতে। একদিন সকালে অফিসে গিয়ে ইমেইল খুলেই দেখি একটা ইমেইল। ইংরেজিতে লেখা ইমেইলের বাংলা করলে দাঁড়াবে এরকমের:
‘প্রিয় প্রাপক,
খুব জরুরী। এইমাত্র পেলাম। আপনি আপনার সহকর্মীদের মধ্যে বিলি করুন। নতুন ড্রাইভিং জরিমানা প্রবর্তন করা হয়েছে জর্জিয়ায় ২০০৮ থেকে।
১। কারপুল লেন— ১ম বার ১০৬৮.৫০ ডলার জরিমানা, প্রযুক্ত হবে ৭/১/০৮ তারিখ থেকে। যে হাইওয়েতে টিকেট খাচ্ছেন, সেই হাইওযেতে পুনর্বার যাবেন না। কারণ, ২যবার সেটা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ৩য় বার তিনগুণ জরিমানা দিতে হবে। চতুর্থবার লাইসেন্স সাসপেন্ড।
২। ভুল লেন বদল— জরিমানা ৩৮০ ডলার। সলিড লেন কিংবা ইন্টারসেকশন ক্রস করবেন না।
৩। ইন্টারসেকশন ব্লক করলে— ৪৮৫ ডলার।
৪। রাস্তার শোল্ডারে ড্রাইভ করলে— ৪৫০ ডলার।
৫। কনস্ট্রাকশন এলাকায় সেলফোন ব্যবহার করলে জরিমানা করা হবে। ৭/১/০৮ তারিখ থেকে দ্বিগুণ হবে।
৬। গাড়িতে সিট বেল্ট ছাড়া কোন প্যাসেঞ্জার থাকলে ড্রাইভার এবং প্যাসেঞ্জার উভযেই পুলিশের তরফ থেকে টিকেট পাবেন।
৭। রাস্তায় স্পিড লিমিটের মাত্র ৩ মাইল উপরে গেলেই টিকেট দেয়া হবে।
৮। ডিইউআই = জেল। দশ বছরের জন্য ড্রাইভিং রেকর্ডে এর উল্লেখ থাকবে।
৯। ৭/১/০৮ তারিখ থেকে সেলফোন ‘হ্যান্ডস ফ্রি থাকতে হবে। টিকেট ২৮৫ ডলার।’
যথার্থ ভাল নির্দেশিকা, তাই না? আমার মত মানুষও ভীত হয়ে পড়ল। দেখলাম সহকর্মীদের সবাই ব্যাপারটা নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন। আমি খুব সতর্কতার সাথে গাড়ি চালিয়ে অফিসে যেতাম। কারণ যে জরিমানার কথা ইমেইলে লেখা আছে, সেটা দিতে হলে পাকস্থলী আমার গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে। আমিও আমার কাছের বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনদের সেটা ফরওয়ার্ড করে দিলাম। অযাচিত ফাঁইনের গ্যাঁড়াকলে পরিচিতরা পড়ুক— কেই বা চায়!
কিন্তু তিন চার দিনের মধ্যেই একটা নির্ভরযোগ্য ওযেব সাইট থেকে জানলাম পুরো ব্যাপারটাই বোগাস! ভুয়া ইমেইল। কিন্তু এর মধ্যেই এটা কয়েকশ লক্ষ বারের উপরে বিনিময় করা হয়েছে। চারিদিকে যাকেই জিজ্ঞাসা করেছি, সবাই এই ইমেইল পেয়েছেন, এবং তারাও আমার মতো এতদিন আতঙ্কিত ছিলেন।
এই ইমেইলটা নিঃসন্দেহে একটা সফল মিম, যা আমাদের মস্তিষ্কের আবেগ এবং যুক্তিকে ব্যবহার করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ার জন্য যা। যা বৈশিষ্ট্য দরকার সবই ছিল ইমেইলটায়—
– এটি ছিল বিশ্বাসযোগ্য
– এটি ছিল প্রাসঙ্গিক—
– এটি বহন করেছিল ভয়াল বার্তা।
– সহজেই অন্যের মধ্যে সঞ্চালনযোগ্য।
এ ধরণের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে ধ্যান ধারণা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে কেন— এটা বুঝলে ধর্ম যে একটা ভাইরাস সেটাও বোধগম্য হবে আশা করি। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী থাকে, যেগুলো না মানলে নরকের ভয়, শাস্তির ভয় দেখানো হয়, সেই নির্দেশাবলীগুলোকে যতদূর সম্ভব প্রাসঙ্গিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং বিভিন্ন উপায়ে মানুষের মধ্যে সঞ্চালন করার প্রয়াস নেয়া হয়। এভাবেই সংক্রমিত হয় বিশ্বাসের ভাইরাস, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
.
প্যারাসাইটিক সংক্রমণ
