একটা হাতীর আকার একটা ব্যাকটেরিয়ার থেকে প্রায় ১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ (১০১৮ গুন) বড়। কিন্তু তারপরেও তারা দুজনেই একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিনিময় করে। দুজনেরই ডিএনএ আছে, এবং তারা নিজেদের প্রতিলিপি করে ডিএনএ কপি করে করে বংশবৃদ্ধি করে। ধ্যান ধারণাগুলো সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারগুলোও তেমনি। কীভাবে ধ্যান ধারণাগুলো জনপুঞ্জে দ্রুত ছড়িযে পড়ে তার কিছু ব্যবহারিক উদাহরণ দেখা যাক। কৌতুক বা joke ছড়ানোর ব্যাপারটি একটি চমৎকার উদাহরণ।
.
কৌতুক যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে
একটা জোক বলা যাক। জোকটা এরকমের :
‘ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স সুদূর আফ্রিকান এক আদিম ট্রাইবে প্রকৃতি বিবর্তন এবং সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েছেন, সেখানে তিনি একবছর থাকবেন আর তার নতুন বই লিখবেন ‘আউট অফ আফ্রিকা নিয়ে। তিনি আফ্রিকান ট্রাইবের মধ্যে বাস করে তাঁদের সংস্কৃতির অনেক কিছু শিখছেন, আবার তাঁদেরও শেখাচ্ছেন অনেক কিছু— বিশেষত: পশ্চিমা জগতের বিজ্ঞান, কারিগরি, প্রযুক্তির কিছু দিক। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন খবর পাওয়া গেল ট্রাইবের নেতার স্ত্রীর এক সন্তান হয়েছে, কিন্তু গায়ের রঙ ধবধবে সাদা! ট্রাইবের সবাই হতবাক। প্রফেসরকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে ট্রাইবের সর্দার বললেন— হুনেন প্রফেসর সাব, এইখানে আপনেই আছেন একমাত্র এইরকম সাদা। আমরা এর আগে কোন সাদা চেহারার মানুষই দেখি নাই। কোইথিকা কী হইছে, এইডা বুঝতে জিনিয়াস হওন লাগে না।
প্রফেসর একটু ভেবে বললেন, না, না চিফ। আপনি ভুল বুঝছেন। প্রকৃতিতে এরকম ঘটনা মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। বিজ্ঞানে আমরা এটাকে বলি Albinism এই যে আপনার উঠানে দেখেন সবগুলা ভেড়া সাদা, খালি একটা ভেড়া কালো রঙের। প্রকৃতিতে এরকম হয় মাঝে সাঝে, আপনি শান্ত হন।
ট্রাইবের সর্দার বেশ কিছুক্ষণ ধরে চুপ থেকে ডকিন্সকে বললেন, ‘শোনেন, আপনের লগে একটা ডিলে আসি। আপনে ভেড়া নিয়ে আর কাউরে কিছু কইযেন
না, আমিও সাদা শিশু লইয়া আপনেরে কিছু কমু না!’
কেমন লাগলো এ কৌতুকটা? আমি নিশ্চিত কৌতুকটা যদি আপনি পড়েন, এবং যদি আপনার ভাল লাগে, হয়তো আপনি সেটা আপনার অন্য কোন বন্ধুকে গিয়ে বলবেন। এভাবেই কৌতুক ছড়ায়। আমি আসলে আপনার মস্তিষ্ককে এই জোকের হোস্ট হিসেবে ব্যবহার করছি। অনেকটা ভাইরাসের মতোই কিন্তু। এই বইয়ের পাঠক যত বাড়বে, বাড়বে হোস্টের সংখ্যাও। এবং সেই সাথে এটা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও।
আধুনিক প্রযুক্তি এসে আমাদের এই কৌতুক ছড়ানোর কাজ খুব সহজ করে দিয়েছে। এই কৌতুকটা ফেসবুকে দেওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যে শ খানেক লাইক আর গণ্ডা খানেক শেয়ারের বন্যায় ভেসে যায়। ফেসবুক খুব ভাল ক্রাইটেরিইযা বোঝার জন্য কোন কৌতুক ‘লাইকেবল’ আর কোনটা নয়। কোনটা টিকে থাকবে, আর কোনটা হারিয়ে যাবে বিস্তৃতির আড়ালে। একটা কৌতুক প্রচণ্ড রকম শেয়ার হয়েছিল ফেসবুকে একসময়, জোকটা এরকমের:
‘জুকার্নায়েকের বড় আশা ছিল তিনি মৃত্যুর পর বেহেস্ত-বাসী হইবেন। তা আশা করবেনই বা না কেন? এতদিন ধরে আল্লাহর পথে জিহাদ করছিলেন, নানা ভাবে বিবর্তনের বিরুদ্ধে গীবত গাইছেন, বিভিন্ন লেকচারে আল্লা আল্লা আর ইসলাম ইসলাম কইরা ফ্যানা ভুইলা ফেলাইলেন, কোরআনের মইধ্যে বিজ্ঞান পাইলেন, পৃথিবীর আকার পাইলেন উটের ডিমের লাহান, উনি বেহেস্তবাসী না হইলে হইবো কে?
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর ঈশ্বর আরেক। কোন এক অজ্ঞাত কারণে ঈশ্বরের শেষ বিচারে জুকার্নায়েকের বেহেস্তে স্থান হইলো না। স্থান হইলো দোজখো ভবে হাজার হলেও তিনি স্বনামখ্যাত জুকার্নায়েক। ঈশ্বর তাকে ডেকে নিয়ে দাপরাবশতঃ বললেন, তোমাকে দোজখের বিভিন্ন প্রকৃতি ঘুরাইয়া দেখানো হবে। তোমার যেটা পছন্দ বেছে নেওয়ার তৌফিক দেয়া হইল, জুকার্নায়েকজী।
মন্দের ভাল, কি আর করা। জুকার্নায়েককে প্রথম একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হইল। সেখানে এক পাপিষ্ঠকে উলঙ্গ করে চাবুক কষা হচ্ছে। আর চাবুকের বাড়ি খেয়ে পাপিষ্ঠ ব্যাটা তারস্বরে চ্যাঁচাচ্ছে। জুকার্নায়েক দেখে বললেন, কতক্ষণ এ ব্যাটাকে চাবুক মারা হবে? উত্তর আসলো এক হাজার বছর। এর পর এক ঘণ্টা বিরতি। তারপর আবার … জুকার্নায়েক শুনে বললেন, নাহ এটা আমার জন্য নয়, চলুন অন্য ঘরে যাই।
দ্বিতীয় ঘরে গিয়ে জুকার্নায়েক দেখলেন, সেখানেও এক ব্যক্তিকে ধরে গরম কড়াইয়ে বসিয়ে পোড়ানো হচ্ছে, আর ব্যথার চোটে উহ আহ করছে। জুকার্নায়েক সে ঘর থেকেও বিদায় নিয়ে বললেন, আরো অপশন কী আছে দেখা যাক।
তৃতীয় ঘরে গিয়ে দেখেন এক লোককে উলঙ্গ করে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, আর এক সুন্দরী তন্বী হাঁটু গেড়ে বসে ভদ্রলোকের ‘উহা মুখে নিয়ে মনিকা লিউনস্কির মতন মুখমেহন করে চলেছেন। কিছুক্ষণ টেরা চোখে অবলোকন করে জুকার্নায়েক ভাবলেন, এটা তো মন্দ নয়। নিজেকে চেনবাধা ভদ্রলোকের জায়গায় কল্পনা করে আমোদিত ভাব নিয়ে ঈশ্বরকে বললেন, এই দোজখই আমার পছন্দের।
ঈশ্বর ঘুরে সুন্দরী তন্বীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কাজ শেষ। এখন থেকে জুকার্নায়েক পরবর্তী এক হাজার বছর ধরে এই সার্ভিস দেবেন।’
