আসিফ মাথা উঁচু করেই জেলে গেছেন, আর করে গেছেন নিপীড়ক রাষ্ট্রযন্ত্র আর তার সুবিধালেহনকারীদের গালে সজোরে চপেটাঘাত।
আমি একটা লেখা লিখেছিলাম বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এ ‘ব্লগারদের বাকস্বাধীনতায় চাই না হস্তক্ষেপ’ শিরোনামে[৬৬]। ২০১৩ সালের ২৩ শে মার্চ অন লাইন পত্রিকায় প্রকাশিত সেই লেখাটিতে বলেছিলাম,
‘ফেসবুকে এখনো বাঁশের কেল্লা আর নিউ বাঁশের কেল্লার মতো সাইট উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের এই সাম্প্রদায়িক উস্কানির বলি হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন শত শত সংখ্যালঘু পরিবার। ধর্ষিতা হয়েছেন, গুম খুন হয়েছেন। রেল লাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে, হয়েছে হাজার হাজার বৃক্ষ কর্তন। চাঁদে সাইদীর মিথ্যা ছবি প্রচার করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষকে সম্মোহিত করার প্রচেষ্টা করেছে। তাদের সাইট বন্ধ হয়নি, বন্ধ করা যায়নি তাদের কর্মকাণ্ড। আর বাঁশের কেল্লাই বা বলি কেন? বাঁশের কেল্লার চেযেও উগ্র সাইট বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছে। মাহমুদুর রহমানের আমার দেশ এবং নয়া দিগন্তের মত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে মিথ্যার কুৎসিত বেসাতি দিনের পর দিন। একে তাকে নাস্তিক আখ্যা দেয়া হয়েছে, মৃত ব্লগারের ব্যক্তিজীবন নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করা হয়েছে। অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত মোল্লা যাদের ব্লগ সম্বন্ধে কোন ধারনা নেই, তাদের দিয়ে উস্কানি দেয়া হয়েছে, চট্টগ্রামের মহাসমাবেশ পণ্ড করে দেয়া হয়েছে। সরকার সে সব বন্ধ করেনি। করতে পারেননি হিযবুত তাহরীরের মত উগ্রবাদী দলগুলোর প্রচারণাও। এই যে হিযবুত তাহরীরের সাইডকিক— ‘আনসারউল্লাহ বাংলা টিম’ নামের উগ্রপন্থী গ্রুপ যাদের কয়েকজন সদস্য রাজীব হত্যায় জড়িত ছিল, তাদের সাইটে গেলে যে কেউ দেখবে, বাংলা ভাষায় কিভাবে বোমা বানানোর নির্দেশিকা দেওয়া আছে, আছে নানা ধরণের উস্কানিমূলক বার্তা। রান্নাঘরে বসেই কিভাবে বোমা বানানো যায়— এ ধরণের শিরোনামে নির্দেশিকা আছে; আছে নারীদের আত্মঘাতী হামলায় উদ্বুদ্ধ করার মতো পোস্ট—’ইমানদার বোনেদের দায়িত্ব কর্তব্য’ শিরোনামে। রাজীবের হত্যাকারীদের ‘বীর’ হিসেবে উপাধি দেয়া হয়েছে এগুলো সাইটে। ভিডিও ছাড়া হয়েছে— চেরি পিকিং’ করে ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স কিংবা ধর্মপ্রচারকদের কর্মকাণ্ড দিযেও রাজীব হত্যাকে বৈধতা দিতে চেয়েছেন এই সব উগ্র ধর্মান্ধরা। অথচ মাননীয় সরকারের চোখে এগুলো পড়ছে না তারা খড়গ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রগতিশীল কিছু ব্লগারদের যারা কাউকে চাপাতি দিয়ে কোপাননি, কাউকে উস্কানি দেননি, আক্রমণ করেননি; বরং আক্রান্ত হয়েছেন, যারা কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রতা আর ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। যেখানে সাধারণ মানুষ ছাব্বিশে মার্চের মধ্যে জামাত শিবিরকে নিষিদ্ধ দল হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, তাদের নিষিদ্ধ না করে নিষিদ্ধ করছেন ধর্মের প্রভাবমুক্ত প্রগতিশীল ব্লগারদের, যারা মূলত জামাত শিবির সহ সব মৌলবাদী দলগুলোর বিরুদ্ধেই সোচ্চার। ‘সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ’!
আর তার চেয়েও বিচিত্র এবং নজিরবিহীন ব্যাপারটি হল– মিডিয়ার সামনে তিনজন ব্লগারকে যেভাবে দাগি আসামীর মত উপস্থাপন করা হল তার অভিনব পরিবেশনা। এর আগে কখনোই এটি দেখা যায়নি। কতটা নির্বোধ এবং নির্লজ্জ হলে এই কাজটি কেউ করাতে পারে, তা বোধগম্য হয় না। যেখানে সরকারের মধ্যেই থাকে। শামীম ওসমানের মত ফুলেল চরিত্র, যেখানে সাগর রুনীদের হত্যাকারীদের, ত্বকীর হত্যাকারীদের খুঁজে পেতে গলদঘর্ম হতে হয়ে যায় পুলিশ আর দেশের পুঁদে গোযেন্দারা, সেই তারাই আবার ক্যামেরার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকারী লেখক এবং ব্লগারদের হাতকড়া পরাবার মতো ছবি তুলে বিধ্বংসী পোজ নিয়ে। সহ ব্লগার নিঝুম মজুমদার পরদিন তার স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন,
“অপরাধীদের ধরলে যেমন অস্ত্র, গোলাবারুদ এগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে ডিবি ছবি তোলে, ঠিক তেমনি এই তিন ব্লগারকেও কিছু কম্পিউটারের সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন কযেকজন মানুষ কম্পিউটার চুরি করে বাংলাদেশের দুর্দান্ত নব্য রক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা খেয়েছে। একজন ব্লগার হিসেবে আমি সিম্পলি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছি এই ছবি দেখে”।
আমি নিশ্চিত এই লজ্জা নিঝুমের কেবল একা লাগেনি, লজ্জা আমাদের সবার। লেখালিখির সাথে জড়িত সকল ব্লগারেরই। সেই লজ্জা আর অপমান থেকে সেসময় ব্ল্যাক আউটে চলে গিয়েছিল আমার ব্লগ, সচলায়তন, মুক্তাঙ্গন, মুক্তমনা, নাগরিক ব্লগ, আমরা বন্ধু, চতুর্মাত্রিক, ক্যাডেট কলেজ ব্লগ, ইস্টিশন ব্লগ এবং সরব ব্লগ। সরকারের মৌলবাদ তোষণ এবং ব্লগার গ্রেফতারের প্রতিবাদ প্রতিরোধে শুরু হয়েছিল এ ব্ল্যাক আউট। কিন্তু লজ্জাটা যাদের লাগার কথা ছিল তারা শেষ পর্যন্ত বেহায়া আর নির্লজ্জই থেকে গেল। পরিতাপের বিষয় সেটিই।
আমাকে বিজ্ঞান লেখক হিসেবেই সবাই চেনেন, অন্তত যারা আমার লেখালিখির সাথে পরিচিত। কিন্তু ব্লগারদের গ্রেফতারের পর থেকে সে সময় অন্তত দুই মাস আমি একটাও বিজ্ঞানের লেখা লিখতে পারিনি, পারিনি অন্য কোন বিষয়ে মনঃসংযোগ করতে। যারা সে সময় আমার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখেছেন তারা জানেন সে সমস্ত স্ট্যাটাসে আমি একঘেয়ে ভাবে কেবল ব্লগারদের মুক্তির দাবীর কথাই বলে গিয়েছিলাম। আমার সব কিছু যেন হঠাৎ করেই কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, সময় গিয়েছিল থমকে দাঁড়িযে। ব্লগারদের মুক্তি না হলে আমি এই আঁধার থেকে বেরুতে পারতাম না।
