চিকিৎসা তখনও চলিতেছিল। গ্রামের বৃদ্ধ শিব কবিরাজ বলিলেন—তোমার রোগটা হয়েছে মানসিক। ঘুম হবে না এ কথা ভাব কেন শোবার আগে? খুব সাহস করবে, মনে মনে জোর করে ভাববে—আজ ঘুম হবে, নিশ্চয়ই হবে, আজ ঠিক ঘুমুব—এরকম করে দ্যাখো দিকি? আর সকাল সকাল শুতে যেয়ো না—যে সময় যেতে, সেই সময় যাবে।
কবিরাজের পরামর্শ মতো রাঘব সন্ধ্যার পর পুরোনো দিনের মতো রন্ধন করিয়া আহার করিলেন। দাওয়ায় বসিয়া গুনগুন করিয়া গানও গাহিলেন। তারপর ঠান্ডা জলে হাত-পা ও মাথা ধুইয়া শয়ন করিতে গেলেন। মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করিলেন—আজ তিনি নিশ্চয়ই ঘুমাইবেন—নিশ্চয়ই—নিশ্চয়ই।
কিন্তু বালিশে মাথা দিয়াই বুকটা কেমন যেন করিয়া উঠিল! ঘুম যদি না হয়?…পরক্ষণেই মন হইতে সে-কথা ঝাড়িয়া ফেলিয়া দিলেন—নিশ্চয়ই ঘুম হইবে। পাশ ফিরিয়া পাশ-বালিশটা আঁকড়াইয়া শুইলেন। ঘরের দেয়ালের একখানা বাঁধানো রাধাকৃষ্ণের ছবি বাতাস লাগিয়া ঠকঠক শব্দ করিতেছে দেখিয়া আবার বিছানা হইতে উঠিয়া সেখানা নামাইয়া রাখিলেন। পুনরায় শুইয়া পড়িয়া জোর করিয়া চোখ বুজিয়া রহিলেন। আধঘণ্টা…এক ঘণ্টা…। এইবার তিনি নিশ্চয়ই ঘুমাইবেন…বুকের মধ্যে গুরগুর করিতেছে কেন?…না, এইবার ঘুমাইবেনই।
দুই ঘণ্টা—তিন ঘণ্টা।…রাত একটা, গ্রাম নিশুতি, কোনোদিকে সাড়াশব্দ নাই —কাওরা-পাড়ায় এক-আধটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছাড়া।
—রাত বেশি হইয়াছে, আর রাঘব জাগিয়া থাকিবেন না, এইবার ঘুমাইবেন। বাঁ-দিকে শুইয়া সুবিধা হইতেছে না, হাতখানা বেকায়দায় কেমন যেন মুচড়াইয়া আছে, ডানদিকে ফিরিয়া শুইবেন। ছারপোকা?…না, ছারপোকা তো বিছানায় নাই?…যাহা হউক জায়গাটা একবার হাত বুলাইয়া লওয়া ভালো।—যাক, এইবার ঘুমাইবেন। এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হইলেন। রাত দুইটা!
কিন্তু নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন না। একটা হাট কী মেলা কোথায় যেন বসিয়াছে, রাঘব দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছেন। সব লোক চলিয়া গেল, তবুও দু দশজন এখনও হাটচালিতে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া শুটকি চিংড়ি মাছের দরকষাকষি করিতেছে—ইহারা বিদায় হইলেই রাঘব নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাইবেন। একটা লোক ঢলিয়া গেল—দুইটা—তিনটা—এখনও জন সাত পোক বাকি। রাঘব তাহাদের নিকট গিয়া চলিয়া যাইবার অনুরোধ করিতেছেন, অনুনয়বিনয় করিতেছেন—তিনি একটু এইবার ঘুমাইবেন, দোহাই তাহাদের, তাহারা চলিয়া যাক। এখনও জন তিনেক বাকি!…রাঘবের মনে উল্লাস হইল, আর বিলম্ব নাই।…এখনও দুইজন। এই দুইজন চলিয়া গেলেই ঘুমাইবেন। আর একজন মাত্র!…মিনিট পনেরো দেরি—তাহা হইলেই ঘুমাইবেন।
হঠাৎ রাঘব বিছানায় উপর উঠিয়া বসিলেন। হাট তো কোথাও বসে নাই! কীসের হাট কোথাকার হাট?…এসব কী আবোল-তাবোল ভাবিতেছেন তিনি! ঘুম তাহা হইলে বোধ হয়…
রাঘব কথাটা ভাবিতেও সাহস করিলেন না।
কত রাত?…ওটা কীসের শব্দ?…বীজপুরের কারখানায় ভোরের বাঁশি বাজিতেছে নাকি?… সে তো রাত চারটায় বাজে। এখনই রাত চারটা বাজিল? অসম্ভব! যাক, যথেষ্ট বাজে কথা ভাবিয়া রাত কাটাইয়াছেন। আর নয়। এইবার তিনি ঘুমাইবেন।
অল্প একটু ঘোর আসিয়াছিল কিনা কে জানে? ভোরের ঠান্ডা বাতাসে হয়তো একটু আসিতেও পারে। কিন্তু রাঘবের দৃঢ় বিশ্বাস তিনি এতটুকু ঘুমান নাই—চোখ চাহিয়াই ছিলেন। হঠাৎ একটা ব্যাপার ঘটিল। বিস্মিত রাঘব দেখিলেন, তাঁহার খাটের পাশের বাঁশের খুঁটিটা যেন ধীরে ধীরে একটা বিরাটকায় মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া তাঁহার মাথার শিয়রে আসিয়া দাঁড়াইল; ব্যঙ্গের সুরে অঙ্গুলি হেলাইয়া বলিল—মূখ! ঘুমোবার ইচ্ছা থাকে তো কালই গহনার বাক্স ফেরত দিস। ভাগনে বউয়ের গহনা চুরি করেছিস, লজ্জা করে না?…
বীজপুরের কারখানার বাঁশির শব্দে রাঘবের ঘোর কাটিয়া গেল। ফরসা হইয়া গিয়াছে। রাঘবের বুক ধড়ফড় করিতেছে, চোখ জ্বালা করিতেছে, মাথা যেন বোঝা, শরীর ভাঙিয়া পড়িতে চাহিতেছে! না, তিনি একটুও ঘুমান নাই—এতটুকু না। বাঁশের খুঁটি-টুটি কিছু না-ও-সব মাথা গরমের দরুন…
কিন্তু ঠিক একই স্বপ্ন রাঘব পর পর দুইদিন দেখিলেন। ঠিক একই সময়ে, ভোররাত্রে, বীজপুরের কারখানার বাঁশি বাজিবার পূর্বে।…ঘুমাই নাই, তবে স্বপ্ন কোথা হইতে আসিবে?
বীজপুরের বাসায় অন্য কেহ তখন ছিল না। নন্দলাল কাজে বাহির হইয়াছে, নন্দলালের স্ত্রী সাবান দিয়া কাপড় কাচিতেছিল। হঠাৎ রুক্ষ চুল, জীর্ণ চেহারায় মামাশ্বশুরকে বাসায় ঢুকিতে দেখিয়া সে বিস্মিত মুখে একবার চাহিয়াই লজ্জায় ঘোমটা দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। রাঘব চক্রবর্তী একবার চারিদিকে চাহিয়াই কাছে আসিয়া ভাগিনেয়-বধূর পা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। বলিলেন—মা তুমি মানুষ নও, তুমি কোনো ঠাকুর-দেবতা হবে। ছেলে বলে আমায় মাপ করো।
তারপর পুটুলি খুলিয়া সব গহনাগুলি ভাগিনেয়-বধূর হাতে প্রত্যর্পণ করিলেন, কিন্তু বাসায় থাকিতে রাজি হইলেন না।
—নন্দলালের কাছে কিছু বলিবার মুখ নেই আমার। তুমি মা—তোমার কাছে বলতে লজ্জা নেই, বুঝলে না? কিন্তু তার কাছে…
ইহার মাস পাঁচ-ছয় পরে রাঘব চক্রবর্তীর গুরুতর অসুখের সংবাদ পাইয়া নন্দলাল সস্ত্রীক গোরুরগাড়ি করিয়া তাঁহাকে দেখিতে গেল। ইহারা যাইবার দিন সাতেক পরে রাঘবের মৃত্যু হইল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁহার যাহা কিছু জমিজমা সব উইল করিয়া ভাগিনেয়-বধূকে দিয়া গেলেন। কিছু পোঁতা সন্ধানও দিয়া গেলেন।
