—কী?
—তুমি মনে মনে কি ভেবেচ জিজ্ঞেস করি? তোমার এতবড়ো আস্পর্ধা, তুমি বলো আমি পায়ে পায়ে তোমার বাড়ি যাব? তুমি জানো, কার সামনে তুমি দাঁড়িয়ে আছ? তোমার মুণ্ডুটা যদি কেটে ফেলি তা হলে খোঁজ হয় না, তুমি জানো? এত বড়োলোক তুমি হলে কবে?
রূপো কাকাও সমানে গলা চড়িয়ে উত্তর দিলে—তা তুমি মাথা কাটবে না? এখন কাটবে না? এখন কাটবে বই কী! হ্যাঁরে সীতেনাথ, তোকে যে কোলে করে মানুষ করেছিলাম একদিন, মনে পড়ে? এখন তুমি বড়ো হয়েচ, বাবু হয়েচ, সীতেবাবু—এখন তুমি আমার মুণ্ডু কাটবা না? বড্ড গুণবন্ত হয়েচিস তুই, হ্যাঁ সীতেনাথ—
‘তুমি’ ছেড়ে রূপো কাকা, সামান্য সাড়ে তিন টাকা মাইনের কর্মচারী হয়ে মনিবকে ‘তুই’ বলেই সম্বোধন আরম্ভ করলে সকলের সামনে।
বাবা বললেন—যা যা, বকিসনে—
—না বকব না—তুই বড্ড তালেবর হয়েচিস আজকাল, বড্ড বাবু হয়েচিস— তুই আমার মুণ্ডু নিবি না তো কে নেবে?
বলেই রূপো কাকা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললে।
আমার ঠাকুরমা ছিলেন বাড়ির মধ্যে। রূপোর কান্না শুনে তিনি বাইরে ছুটে এসে বাবাকে যথেষ্ট বকলেন।
বাবা বললেন—তা বলে আমায় ওরকম বলে কেন?
ঠাকুরমা বললেন—তুই কাকে কী বলিস সীতে, তোর একটা কাণ্ডজ্ঞান নেই? তুই কি পেলি?
বাবা কলম ছেড়ে বাড়ির মধ্যে উঠে এলেন, তারপর রূপো কাকার হাত ধরে বললেন—রূপোদা, তুই কিছু মনে করিসনে। আমার বলা ভুল হয়ে গিয়েচে, বড্ড ভুল হয়েছে।
রূপো কাকার রাগ কমে না, বললে—না, আমার দরকার নেই কাজে। ঢের হয়েছে। নে, তোর গোলার চাবিছড়া রেখে দে—মুই আর ওসব ঝামেলা পোয়াতে পারব না। নে তোর চাবিছড়া।
কতবার বোঝানো হল, রূপো কাকা কিছুতেই শুনবে না। চাবির থোলো সে খুলে বাবার সামনে ছুড়ে ফেলে দিলে।
শেষে বাবা বললেন—বেশ, তা হলে আমিই বাড়ি ছেড়ে যাই। রইল গোলাপালা, প্রজাপত্তর। আমি কাল সকালের গাড়ি তেই বেরুচ্চি—
রূপো কাকা ঝাঁঝের সঙ্গেই বললে—তুই চলে যাবি তা তোর কাচ্চাবাচ্চা মানুষ করবে কেডা?
—কেন, তুমি?
—মোর দায় পড়েছে। তোরে কোলেপিঠে করে মানুষ করলাম বলে কী তোর ছেলে-পিলেও কোলেপিঠে করে মানুষ করব? আমি কি আর জোয়ান আছি? এখন বুড়ো হইচি না? ওসব ঝামেলা আমার দ্বারা আর হবে না—
-না, আমি আর থাকব না। কালই যাব চলে।
—কোথায় যাবি?
—মরেলডাঙা চলে যাব। ঠিক বলচি যাব। আমার বড় কষ্ট হয়েচে রূপোদা, তুমি আমায় এমন করে বললে শেষকালে। আমি গৃহত্যাগী হব, হব হব—বলেই বাবা ফেললেন কেঁদে।
রূপো কাকা অমনি উঠে এসে বাবার হাত ধরে বললে—কাঁদিসনে সীতেনাথ, কাঁদিসনে, ছিঃ—মুই আর তোরে কী বললাম? তুই-ই তো কত কথা শুনিয়ে দিলি—কাঁদিসনে—
শেষে দুজনেরই কান্না।
আমরা ছেলেমানুষ, অবাক হয়ে চেয়ে দেখতে লাগলুম দুই বড়ো লোকের কান্না। দাদা আমায় কনুইয়ের গুঁতো মেরে মুখে হাত চেপে হি হি করে হেসে উঠল। আমরা অবিশ্যি দূরে গোলার নিমতোলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ব্যাপারটা শেষপর্যন্ত অবিশ্যি মিটমাট হয়ে গেল। বাবাও দেশত্যাগী হলেন না, রূপো কাকাও চাকরি ছাড়লেন না।
রূপো কাকা রাত্রে চৌকিদারি করত। অনেক রাত্রে আমাদের বাড়ি এসে ঠাকুরমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলত—ওঠো বউমা, জাগন থাকো। রাত খারাপ। চণ্ডীমণ্ডপে সন্নিসি ঘোষ ও হীরু মাস্টার শুয়ে থাকত, তাদের জাগিয়ে দিয়ে বলত—একেবার অত নাক ডাকিয়ে ঘুমোও কেন? ওঠো, মাঝে মাঝে তামুক খাও আর গোলাগুলোর চারিধারে বেড়িয়ে এসো না—
একটা অদ্ভুত দৃশ্য কতদিন হীরু মাস্টার দেখেছে।
আমাদের গল্প করেচে সকালবেলা।
সব গ্রাম ঘুরে এসে অনেক রাত্রে চৌকিদারি পোশাক পরে লাঠি হাতে রূপো কাকা অন্ধকারে আমাদের চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠার ওপর বসে থাকত।
এক-একদিন হীরু মাস্টার বাইরে এসে ওকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করত— কে বসে?
–মুই রূপো।
—বসে কেন? এত রাতে?
—তোমরা তো দিব্যি ঘুমোচ্চ, তোমাদের আর কী? গোলার ধান যাবে সীতেনাথের যাবে। চোরের যা উপদ্রব হয়েছে তার খবর কী জানবা? মোর ওপর ঝুঁকি কত! মোর তো তোমাদের মতো ঘুমুলি চলবে না। সীতেনাথের এ ঝামেলা আর কদ্দিন পোয়াব? এবার এলি চাবিছড়া তার হাতে দিয়ে মুই খোলসা হব। এ আর পারি না বুড়ো বয়সে রাত জাগতি—
হীরু মাস্টার বলে—ঘুমোও গো যাও—
—কিন্তু মুই যে তোমাদের মতো নিশ্চিন্দি হতে পারিনে তার কি হবে। ধানগুলোর ঝক্কি যে মোর ঘাড়ে ফেলে সে বাবু দিব্যি চাঙা হয়ে বসে আছেন! এবার আসুক, কিছুতেই আর এ বোঝা ঘাড়ে রাখচিনে মুই।
কিন্তু নিজের ইচ্ছেতে তার ছাড়তে হয়নি। বৃদ্ধ বয়সে তিনদিনের জ্বরে রূপো কাকা আমাদের গোলার দায়িত্ব নামিয়ে চলে গেল। এও সাত-আট বছর পরের কথা। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। সবসুদ্ধ ত্রিশ-বত্রিশ বছর ও ছিল আমাদের বাড়ি।
বাবার সঙ্গে আমরাও দেখতে গেলাম রূপো কাকাকে।
রূপো কাকার ছোটো চালাঘর। একদিকে ডোবা, একদিকে বাঁশঝাড়। ছেড়া মলিন কাঁথা মুড়ি দিয়ে শীর্ণ, সাদা দাড়ি রূপো কাকা পুরোনো মাদুরে শুয়ে। রূপো কাকার ছেলের নাম বেজা, লোকে বলে বেজা বাঙাল। বেজা আমাদের দেখে বললে—আসুন বাবুরা, দেখুন দিকি বাবারে? জ্ঞান নেই, ভুল বকছে—
বাবা ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন—ও রূপোদা? কেমন আছ, ও রূপোদা—
রূপো কাকা চোখ মেলে বললে—কেডা? সীতেনাথ? কবে এলে?
—এই পরশু এসেছি।
—বেশ করেচ। এই শোনো, খাতার মুড়োয় লিখে রাখো, মুই চিঁড়ে খাবার বেনামুরি ধান নিইচি চার কাঠা, আহাদ মণ্ডল কলাই দু-কাঠা, বাড়ি দু-কাঠা, বিষ্ণু ধেরিসি ছ-কাঠা ধান, বাড়ি চার কাঠামোর ধান পোষ মাসের ইদিকে দিতি পারব না বলে দিচ্চিভুলে যাব, লিখে রাখো–
