—বাঃ চমৎকার!
—তাহলে কাল—ধরুন এই তিনটে—এখানে এসে চা খাবেন?
—ইয়ে—কাল? কাল আবার ভবানীপুরে একটু কাজ ছিল—
—না না, তা হবে না! একটা বই আরম্ভ করে মাঝে ফাঁক দিলে ইমপ্রেশন কেটে যায়—একটানা না-শুনলে। আসুন কাল। সময় খুব কম হাতে।
অগত্যা রাজি হতে হল। পরদিনও গেলাম। সেদিন খাতা শেষ হয়ে গেল— আমার সৌভাগ্য বলেই সেটা ধরতে পারতাম যদি না-রামতারণবাবু পড়ার শেষে খাতাখানা আমার ঘাড়ে চাপাতেন প্রকাশক খুঁজে দেওয়ার জন্যে।
বললেন—তাহলে এইবার একটু ভালো করে চেষ্টা করুন। শুনলেন তো সবটা? এ ধরনের বই আজকাল কেউ লিখতে পারবে না মশাই—নিজের মুখেই বলছি, তা আপনি যা-ই ভাবুন। অথর হলেই হল না।
আমার ভাবনা অবশ্য একটু ভিন্ন পথে গেল। এ যুগে চেষ্টা করলেও অমন বই লেখা যায় না ঠিকই। যুগের হাওয়া বদলেছে, রামতারণবাবুর যুগ পঁয়ত্রিশ বছর পিছিয়ে পড়ে গিয়েছে।
চেষ্টা করিনি তা নয়। সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম। প্রকাশকেরা হেসেই কথাটা উড়িয়ে দেয়। সোজা কথা শুনিয়ে দেয় অনেকে, কেন আমি বৃথা চেষ্টা করছি, ও বই চলবে না। লেখকের নাম নেই বাজারে।
বললাম—কেন থাকবে না? একসময় তাঁর বইয়ের যথেষ্ট আদর ছিল।
—যখন ছিল তখন ছিল। এখন ও অচল।
রামতারণবাবুর সঙ্গে দেখা করতে সংকোচ হয়। অন্য চায়ের দোকানে চা খাই, গোলদিঘির ত্রিসীমানা মাড়াই না। কিন্তু একদিন তিনি আমার মেসে এসে হাজির। আমি ওঁকে দেখে একটু থতোমতো খেয়ে গেলাম।
উনি বললেন—কী ব্যাপার? দেখিনে যে?
—আসুন। শরীর খারাপ। বেরোইনি।
—বইখানার কতদূর কী হল বলুন তো। আমার ছোটো নাতনির অসুখ, কিছু টাকা বড়ো দরকার। কে কি বললে তাই বলুন।
বড়ো বিপদে পড়ি। কেউ কিছুই বলেনি যে, এ কথা তাঁকে শোনাতে আমার বড়োই বাধে। প্রবীণ লেখকের মনে সে রূঢ় আঘাত কেমন করে দিই? অবশেষে বললাম—একজনদের সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছে।
—খাতা তারা নিয়ে নিয়েছে নাকি?
—নাইয়ে-খাতা আমার কাছেই রামতারণবাবু যেন দুর্ভাবনার দায় এড়িয়ে হাঁপ ছাড়লেন। প্রকাশকদের বিশ্বাস নেই, তারা অনেক সময় ভালো বই পেলে মেরে দেয়, আমি যেন খুব সাবধানে কাজ করি। অনেক সদুপদেশ দিলেন। আমি বেশ মন দিয়ে চেষ্টা করছি তো?
দু-তিন জায়গায় ঘুরলাম আরও। রীতিমতো অনুনয়-বিনয় করলাম দু-এক জায়গায়।
তারা হেসে বলে—আপনি অমন করছেন কেন ওঁর জন্যে বলুন তো? ওঁর বই চলবে না। আপনার নিজের বই আছে? থাকে নিয়ে আসুন। কালই প্রেসে দিচ্ছি।
একজন অনভিজ্ঞ লোক বই ছাপবার ব্যাবসা করতে এল মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে। আমার কাছে দিনকতক ঘোরাঘুরি করলে। পয়সা বেশি নেই, কম টাকায় কাজ হাসিল করতে চায়। তাকে পাঠিয়ে দিলাম রামতারণবাবুর কাছে। সে চেনে না বিশেষ কোনো গ্রন্থকারকে। আমার মুখে শুনলে রামতারণবাবুর খ্যাতির কথা। ওঁর বাসার ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম ওঁর কাছে। সন্ধ্যার পরে লোকটা এল আমার বাসায়! খুব খুশি। মস্ত বড়ো ‘অথার’ ধরিয়ে দিয়েছি তাকে। আমার কাছে সে কৃতজ্ঞ থাকবে চিরকাল নাকি। অতবড়ো একজন লোক! বঙ্কিমচন্দ্রের মতো খ্যাতি ছিল এককালে! ইংরেজি কাগজে পর্যন্ত নাম বেরিয়েছে, তাও এখানকার কাগজে নয়, চিন দেশের!
বুঝলাম রামতারণবাবু তাঁর পুরোনো খাতাপত্র সব বের করেছিলেন এর সামনে।
দিন পাঁচ-ছয় কেটে গেল। দুজনের কারও সঙ্গে দেখা হয় না। মনে মনে আশা হল, রামতারণবাবুর নৌকো ডাঙায় ভিড়েছে এতদিনে।
পরদিন আমি রামতারণবাবুর বাড়ি গেলাম। রামতারণবাবু স্নান করে উঠেছেন সবে, ভিজে গামছা পরেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন, হাতে এক ড্যালা বড়ো কাপড়কাচা সাবান। বললেন—কে? ও, আপনি? আমি বলি বুঝি সেই ভদ্রলোক—
—কে?
—ওই যাঁকে আপনি পাঠিয়েছিলেন। বেশ লোক।
—কী ঠিক হল?
—বসুন। আমি কাপড় ছেড়ে এসে সব বলছি। চা দিতে বলি?
—না, এতবেলায়—আসুন আপনি। রামতারণবাবুর মনে খুব স্ফূর্তি। ফিরে এসে আমার কাছে বসলেন।
আমি বললাম—কী ব্যাপার বলুন।
—এখনই আসবেন উনি। আজ টাকা দেবার কথা।
—কথা পাকাপাকি হয়ে গেল? কত টাকায় মিটল?
—দেড়-শো টাকা।
দুজনেই বসে রইলাম অনেকক্ষণ। কেউ এল না। আমি উঠে বাড়ি চলে এলাম।
সেই প্রকাশকটি আমার কাছে দুপুরের পরেই এসে হাজির। বললাম—আপনি গেলেন না ওখানে? কতক্ষণ বসেছিলাম আমরা।
—না মশাই, ওঁর বই নেব না।
—কেন?
—চলবে না, সবাই বারণ করছে। উনি সেকেলে লেখক–ওঁর বই একালে বিক্রি হবে না।
তবুও আমি অনেক বোঝালাম। ফল বিশেষ কিছু হল না। সেই যে চলে গেল, আর আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি।
এই ঘটনার পরে দু-তিন মাস কেটে গেল। রামতারণবাবুর আর কোনো খবর পাইনি। সে চায়ের দোকানেও তিনি আর আসেন না।
তিন মাস পরে একদিন তাঁর বাড়ি গেলাম। ওঁর নাতি আমায় বললে—আসুন, দাদুর বড়ো অসুখ। উনি আপনার কথা প্রায়ই বলেন। চলুন ওঘরে।
সে ঘরে গিয়ে দেখি, রামতারণবাবু মলিন শয্যায় শুয়ে চোখ বুজে রয়েছেন। রোগীর মতো চেহারা নয় কিন্তু—বেশ সৌম্য মূর্তি, পাশে একখানা খবরের কাগজ —বোধ হয় কিছু আগে পড়েছিলেন। বিছানার পাশে একখানা বেঞ্চিতে ময়লা কাপড়ের ঘেরাটোপে পুরোনো কয়েকটি বাক্স-তোরঙ্গ। দেওয়ালে ক্যালেন্ডার থেকে কাটা ছবি টাঙানো। কাঠের বাঁধাই সেকেলে আয়না একখানা।
বিছানার পাশে একটা টুলে রামতারণবাবু আমায় বসবার নির্দেশ করলেন।
বললাম—কেমন আছেন এখন?
—ওই অমনি। বুড়ো বয়সের জ্বর। শরীরটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
