সুশীলা পিছন ফিরিয়াই শাশুড়িকে দেখিয়া যেন কেমন হইয়া গেল। তাহার চোখমুখের ভাব দেখিয়া মোক্ষদার সন্দেহ আরও বাড়িল—তিনি বাটিটা হাতে তুলিয়া লইয়া দেখিলেন তাহাতে সবুজ মতো কী একটা বাটা।
তিনি কড়াসুরে জিজ্ঞাসা করিলেন—কী বেটেছ এতে?
তিনি দেখিলেন পুত্রবধূ উত্তর দিতে পারিতেছে না, তাহার মুখ লাল হইয়া উঠিয়াছে।
ইহার পর একটা ভয়ানক কাণ্ড ঘটিল। মোক্ষদা ঠাকরুন বাটি হাতে—ওমা কী সর্বনাশ! আর একটু হলেই হয়েছিল গো,—বলিয়া উঠানে আসিয়া চীৎকার করিয়া হাট বাধাইলেন।
কিশোরী দালান হইতে উঠিয়া আসিল, রামতনু আসিলেন, গাঙ্গুলী-বাড়ির মেয়ে-পুরুষ আসিল, আরও অনেকে আসিল।
মোক্ষদা সকলের সামনে সেই বাটিটা দেখাইয়া বলিতে লাগিলেন, দ্যাখো তোমরা সকলে, তোমরা ভাব শাশুড়ি-মাগি বড়ো দুষ্টু—নিজের চোখে দেখে নাও ব্যাপার, কী সর্বনাশ হয়ে যেত এখনি, যদি আমি না-দেখতাম—দোহাই বাবা তারকনাথ, কী ঠেকানই আজ ঠেকিয়েছ…
এক-উঠান লোক—সকলেই শুনিল রামতনুর দুরন্ত পুত্রবধূ স্বামীর ভাতে বিষ না কী মিশাইয়া খাওয়াইতে গিয়া ধরা পড়িয়াছে। কেউ অবাক হইয়া গেল, কেউ মুচকি হাসিয়া বলিল—ও-সব আমরা অনেককাল জানি, আমরা রীত দেখলেই মানুষ চিনি, তবে পাড়ার মধ্যে বলে এতদিন…
কে একজন বলিল—জিনিসটা কী তা দেখা হয়েছে?…
মোক্ষদা ঠাকরুনের গাল-বাদ্যের রবে সে কথা চাপা পড়িয়া গেল।
গাঙ্গুলী মহাশয় রামতনুকে বলিলেন—গুরু রক্ষা করেছেন। এখন যত শিগগির বিদেয় করতে পারো তার চেষ্টা করো, শাস্ত্রে বলে, দুষ্টা ভার্যে! আর একদিনও এখানে রেখো না।
সমস্ত দিন পরামর্শ চলিল।
সন্ধ্যার সময় ঠিক হইল কাল সকালেই গাড়ি ডাকিয়া আপদ বিদায় করা হইবে, আর একদিনও এখানে না, কী জানি কখন কী বিপদ ঘটাইবে। বিশেষত পাড়ার মধ্যে ও-রকম দজ্জাল বউ থাকিলে পাড়ার অন্য বউ-ঝিও দেখাদেখি ওইরকমই হইয়া উঠিবে।
সেদিন রাত্রে সুশীলাকে অন্য এক ঘরে শুইতে দেওয়া হইল—ইহা মোক্ষদা ঠাকরুনের বন্দোবস্ত—কাল সকালেই যখন যেখানকার আপদ সেখানে বিদায় করিয়া দেওয়া হইবে, তখন আর তাহার সঙ্গে সম্পর্ক কীসের?
রাত্রে শুইয়া শুইয়া কত রাত পর্যন্ত তাহার ঘুম আসিল না। ঘরের জানালা সব খোলা, বাহিরের জ্যোৎস্না ঘরে আসিয়া পড়িয়াছিল। তাহার মনে কাল ও আজ এই দুইদিন অত্যন্ত কষ্ট হইয়াছে—সে স্বভাবত নির্বোধ, লাঞ্ছনা ভোগের অপমান সে ইহার পূর্বে কখনও তেমন করিয়া অনুভব করে নাই, যদিও মারধর ইহার পূর্বে বহুবার খাইয়াছে। তাহার একটা কারণ এই যে আজ ও কালকার দিনের মতো শ্বশুর-শাশুড়ি ও এক-উঠান লোকের সামনে এভাবে অপমানিতাও সে কোনোদিন হয় নাই। তাই আজ সমস্ত দিন ধরিয়া তাহার চোখের জল বাঁধ মানিতেছে না— কাল মার খাইয়া পিঠ কাটিয়া গিয়াছে ও হাত দিয়া ঠেকাইতে গিয়া হাতের কাচের চুড়ি ভাঙিয়া হাতও ক্ষতবিক্ষত হইয়াছে। তাহার সেই স্বামী, যে স্বামী পাঁচ-ছয় বৎসর পূর্বে এমন সব রাতে তাহাকে সমস্ত রাত ঘুমাইতে দিত না, সে পান খাইতে চাহিত না-বলিয়া কত ভুলাইয়া পান মুখে গুজিয়া দিত—সেই স্বামী এরূপ করিল?
পান খাওয়ানোর কথাটিই সুশীলার বারবার মনে আসিতে লাগিল। রাত্রের জ্যোৎস্না ক্রমে আরও ফুটিল। তখন চৈত্রমাসের মাঝামাঝি, দিনে তখন নতুন-কচি পাতা-ওঠা গাছের মাথার উপর উদাস অলস বসন্ত-মধ্যাহ্ন ধোঁয়া ধোঁয়া রৌদ্রের উত্তরীয় উড়াইয়া বেড়ায়…দীর্ঘ দীর্ঘ দিনগুলি প্রস্ফুট-প্রসূন-সুরভির মধ্য দিয়া চলিয়া চলিয়া নদীর ধারের শিমুলতলায় সন্ধ্যার ছায়ার কোলে গিয়া ঢলিয়া পড়ে…পাড়াগাঁয়ের আমবনে, বাঁশবনে জ্যোৎস্না-ঝরা বাতাসে সারারাত কত-কী পাখির আনন্দ-কাকলী…বসন্ত লক্ষ্মীর প্রথম প্রহরের আরতির শেষে বনের গাছপালা তখন আবার নূতন করিয়া টাটকা ফুলের ডালি সাজাইতেছে।…
শুইয়া শুইয়া সুশীলা ভাবিল, জগতে কেউ তাহাকে ভালোবাসে না—কেবল ভালোবাসে তাহার মৌরীফুল। মৌরীফুল পত্র লিখিয়াছে, তাহার কথা মনে করিয়া সে রোজ রাত্রে কাঁদে, তাহাকে না-দেখিয়া কলিকাতার ফিরিয়া তাহার কষ্ট হইতেছে। সত্যই যদি কেউ তাহাকে ভালোবাসে তো সে ওই মৌরীফুল— ভালোবাসে ওই ছোটো-বউটা। আহা, ছোটো-বউ-এর বড়ো কষ্ট! ভগবান দিন দিলে সে ছোটো-বউ-এর দুঃখ ঘুচাইবে।…কিন্তু স্বামী যে তাহাকে বিদায় করিয়া দিতেছে? ও কিছু না, অভাবে পড়িয়া উহার মাথা খারাপ হইয়া যাইতেছে, নহিলে সেও কী এমন ছিল? মৌরীফুলের বর তো কত জায়গায় বেড়ায়, মৌরীফুলকে একখানা পত্র লিখিয়া দেখিলে হয়, যদি উহার কোনো চাকরি করিয়া দিতে পারে। চাকরি হইলে সে আর তার স্বামী একটা আলাদা বাসায় থাকিবে, আর কেহই সেখানে থাকিবে না, মাঠের ধারের ছোটো ঘরখানি সে মনের মতো করিয়া সাজাইয়া রাখিবে, উঠানে কুমড়ার মাচা বাঁধিবে, বাজার-খরচ কমিয়া যাইবে। লোকে বলে সে গোছালো নয়, একবার বাসায় যাইলে সে দেখাইয়া দিবে যে সে গোছালো কিনা। আচ্ছা, ওই বাড়িখানায় যদি আগুন লাগে! না—আগুন দিবে কে? ছোটো-বউ, উঁহু, দিলে তাহার শাশুড়ি ঠাকরুনই দিবে, যে রকম লোক!
জানালার বাহিরে জ্যোৎস্নায় ওগুলো কি ভাসিতেছে? সেই যে তাহার স্বামী গল্প করিত জ্যোৎস্না-রাত্রে পরিরা সব খেলা করিয়া বেড়ায়, তাহারা নয় তো?…তাহার বিবাহের রাত্রে কেমন বাঁশি বাজাইয়াছিল, কেমন সুন্দর বাঁশি, ওরকম বাঁশি নদীর ধারে কত পড়িয়া থাকে…আচ্ছা পিয়োনে মৌরীফুলের একখানা চিঠি দিয়া গেল না কেন? লাল চৌকা খাম, খুব বড়ো, সোনার জল দেওয়া, আতর না কী মাখানো…
