তাঁহার এ বানপ্রস্থ অবলম্বনের আকাঙ্ক্ষার জন্য দায়ী একমাত্র তাঁহার পুত্রবধূ সুশীলা। সুশীলা সকাল নাই সন্ধ্যা নাই একটা কিছু না-বাধাইয়া থাকিতে পারে না। সে অত্যন্ত আনাড়ি, কোনো কাজই গুছাইয়া করিতে পারে না, অথচ দোষ দেখাইতে যাইলে ক্ষেপিয়া যায়। তাহার জন্য রামতনু মুখুয্যের বাড়িতে কাক চিল বসিবার উপায় নাই। শ্বশুর-শাশুড়িকে সে হঠাৎ আঁটিয়া উঠিতে পারে না বটে, কিন্তু এজন্য তাহার চেষ্টার ত্রুটি দেখা যায় না।
অনেক রাত্রে কিশোরী বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, তাহার ঘরে খাবার ঢাকা আছে এবং স্ত্রী ঘুমাইতেছে। খাবারের ঢাকা খুলিয়া আহারাদি শেষ করিয়া সে শুইতে গিয়া দেখিল, স্ত্রী ঘুম-জড়ানো চক্ষে বিছানার উপর উঠিয়া বসিয়াছে। স্বামীকে দেখিয়া একটু অপ্রতিভের সুরে বলিল—কখন এলে? তা আমায় একটু ডাকলে না কেন?
কিশোরী বলিল—আর ডেকে কী হবে? আমার কী আর হাত-পা নেই! নিতে জানিনে?
হঠাৎ তাহার স্ত্রী রাগিয়া উঠিল—নিতে জানেনা তো জেনো। কাল থেকে আমার এখানে আর বনবে না। এ যেন হয়েছে শক্রপুরীর মধ্যে বাস—বাড়িসুদ্ধ লোক আমার পেছনে এমন করে লেগেছে কেন শুনতে চাই। না-হয় বরং…
কান্নায় ফুলিয়া সে বালিশের উপর মুখ গুঁজিল।
কিশোরী দেখিল স্ত্রী রাতদুপুরের সময় গায়ে পড়িয়া ঝগড়া করিয়া একটা বিভ্রাট বাধাইয়া তোলে বুঝি। এরকম করিয়া আর সংসার করা চলে না—ভাত ঢাকা ছিল, খুলিয়া লইয়া খাইয়াছে, ইহাতেও যদি স্ত্রী চটিয়া যায় তাহা হইলে আর পারা যায় না; কিছু না, ওই একটা ছল; ওই সামান্য সূত্র ধরিয়া এখনি সে একটা রাম রাবণের যুদ্ধ বাধাইয়া তুলিবে।
কিশোরী বলিল—যা খুশি কালকে কোরো—এখন একটু ঘুমুতে দাও। ঘুমুচ্ছিলে বলেই আর ডাকিনি এই তো অপরাধ? তা বেশ, কাল থেকে ওঠাব, চুলের নড়া ধরে ওঠাব।
সুশীলা কথাও বলিল না, মুখও তুলিল না, বালিশে মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া রহিল।
পরদিন সকালে উঠিয়া রামতনু মুখুয্যে শুনিলেন, চৌধুরীরা খবর পাঠাইয়াছে কয়েকটি নতুন সাক্ষীর তালিম দিতে হইবে। যাইবার সময় তিনি বলিলেন—ও বউমা। একটু সকাল সকাল ভাত দিয়ো, কোর্টে যেতে হবে।
বেলা নয়টার সময় ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন—সুশীলা স্নান করিয়া আসিয়া রৌদ্রে কাপড় মেলিয়া দিতেছে, গৃহিণী মোক্ষদাসুন্দরী রান্নাঘরে বসিয়া রাঁধিতেছেন। স্বামীকে দেখিয়াই মোক্ষদা চৌকিদার হাঁকার সুরে বলিতে লাগিলেন—হয় আমি একদিকে বেরিয়ে যাই, না-হয় বাপু এর বিহিত করো। সেই সকাল থেকে ঘুরপাক দিয়ে দিয়ে বেড়াচ্ছে, বলছি—ও বউমা, দুটো ভাত চড়িয়ে দাও, ওগো যা হয় দুটো-কিছু রাঁধো—হাতে-পায়ে ধরতে কেবল বাকি রেখেছি। কার কথা কে শোনে?—এই বেলা-দুপুরের সময় রানি এখন এলেন নেয়ে…
সুশীলা রক হইতেই সমান গলায় উত্তর দিল—মাইনে করা দাসী তো নই, আমি যখন পারব রান্না চড়াব—সকাল থেকে বসে আছি নাকি? এত খাটুনি সেরে আবার আটটার মধ্যে ভাত দেব—মানুষের তো আর শরীর নয়—যার না-চলবে সে নিজে গিয়ে বেঁধে নিক।…
একথার উত্তরে মোক্ষদা খুন্তি হাতে রান্নাঘরের দাওয়ায় আসিয়া নটরাজ শিবের তাণ্ডব নর্তনের একটা আধুনিক সংস্করণ শুরু করিতে যাইতেছিলেন—একটা ঘটনায় তাহা বন্ধ হইয়া গেল।
একটা দশ-বারো বৎসরের ছেলে, রংটা বড়োই কালো, ম্যালেরিয়ায় শরীর জীর্ণ শীর্ণ, পরনে অতিময়লা এক গামছা, শীতের দিনেও তাহার গায়ে কিছু নাই, হাতে ছোটো একটা বাখারির ছড়ি লইয়া বাড়ির মধ্যে ঢুকিল। ছেলেটি পাশের গ্রামের আতর আলি ঘরামির ছেলে, গতবৎসর তার বাপ মারা গিয়াছে, দুটি ছোটো ছোটো বোন আর মা ছাড়া তার আর কেহ নাই। অবস্থা খুব খারাপ, সবদিন খাওয়া জোটে না, ছেলেটা পিঠে ছড়ি বাজাইয়া হাপু গাহিয়া মা ও বোন দুটিকে প্রতিপালন করে। সে এ-গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে আসিত কিন্তু মুখুয্যে-বাড়ি আর কখনো আসে নাই। তাহার একটা কারণ এই যে, দানশীলতার জন্য রামতনু মুখুয্যে গ্রামের মধ্যে আদৌ প্রসিদ্ধ ছিলেন না।
ছেলেটি উঠোনে দাঁড়াইয়া বগল বাজাইয়া নানারূপ সুর করিয়া উচ্চৈ:সুরে হাপু গাহিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে পিঠে জোর করিয়া লাঠির বাড়ি মারিতে লাগিল।
তিনটি নেহাত গোবেচারি সাক্ষীর তালিম দিতে অনেক ধস্তাধস্তি করিয়া রামতনুর মেজাজ ভালো ছিল না, ফিরিয়া চাহিয়া দেখিয়া মুখ খিঁচাইয়া বলিলেন— থাম—থাম ও-সব রাখ—এখন ও-সব দেখবার শখ নেই—যা অন্য বাড়ি দেখগে যা—যা…
সুশীলা কাপড় মেলিয়া দিতে দিতে অবাক হইয়া হাপু গাওয়া দেখিতেছিল— ছেলেটি সংকুচিত হইয়া বাহিরে যাইতেই সে তাড়াতাড়ি বাহিরের রকে গিয়া তাহাকে ডাকিয়া বলিল— শোন, তোর বাড়ি কোথায় রে?
—হরিপুর মা-ঠাকরুন।
—তোর বাড়িতে কে আছে আর?
—মোর বাপ মারা গিয়েছে আর-বছর মা-ঠাকরুন—মোদের আর কেউ নাই, মুই বড়ো, ছোটো দুটো বোন আছে…
–তাই বুঝি তুই হাপু গাস? হ্যাঁ রে, এতে চলে?
রামতনুর ধমক খাইয়া ছেলেমানুষ অত্যন্ত দমিয়া গিয়াছিল, সুশীলার কথার ভিতর সহানুভূতির সুর চিনিয়া লইয়া হঠাৎ তাহার কান্না আসিল—চোখের জল হু হু করিয়া পড়িতেই ম্যালেরিয়া-শীর্ণ হাতটি তুলিয়া চোখ মুছিয়া বলিল—না মা ঠাকরুন, চলে না। এসব লোকে আর দেখতে চায় না। মুই যদি ভালো গান গাইতে পারতাম তো যাত্রার দলে যাতাম, বড়ো কষ্ট মোদের সংসারে—এই শীতি মা ঠাকরুন…
সুশীলা বাধা দিয়া বলিল—দাঁড়া, আমি আসছি।
