হঠাৎ গুণাঢ্যের দিকে চেয়ে সে বললে—চলুন, আপনার সঙ্গে যাব, আমায় সে মন্ত্রপূত জল দেবেন।
গুণাঢ্য বিস্ময়ে প্রদ্যুম্নের দিকে চেয়ে বললেন—বেশ করে ভেবে দেখো। এ ছেলেখেলা নয়। এ কাজ—
প্রদ্যুম্ন বললে—চলুন আপনি।
তারা যখন কুটীরের নিকটবর্তী হল তখন গুণাঢ্য বললেন—প্রদ্যুম্ন, আর একবার ভালো করে ভেবে দেখো, কোনো মিথ্যা আশায় ভুলো না, এ থেকে তোমায় উদ্ধার করবার ক্ষমতা কারুর হবে না—দেবীরও না। মন্ত্রবলে তোমার প্রাণশক্তি চিরকালের জন্য জড় হয়ে যাবে; বেশ বুঝে দেখো। মন্ত্রশক্তি নির্মম অমোঘ, কাউকে রেহাই দেবে না।
প্রদ্যুম্ন বললে—আপনি কি ভাবেন আমি কিছু গ্রাহ্য করি? কিছু না, চলুন। কুটীরে তারা তখন গিয়ে উপস্থিত হল, তখন রোদ বেশ পড়ে এসেছে। দেবী কুটীরের বাইরে ঘাসের উপর অন্যমনস্কভাবে চুপ করে বসে ছিলেন—প্রদ্যুম্নকে আসতে দেখে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন, হাসিমুখে বললেন—এসো, এসো! আমি তোমার কথা প্রায়ই ভাবি। তোমায় সেদিন কিছু খেতে দিতে না-পেরে আমার মন খুব খারাপ হয়েছিল। এখন তুমি এখানে কিছুদিন থাকো।
তিনি দুজনকে খেতে দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে কুটীরের মধ্যে চলে গেলেন।
প্রদ্যুম্ন বললে—কই আমায় মন্ত্রপূত জল দিন তবে?
গুণাঢ্য বললেন—সত্যিই তা হলে তুমি এতে প্রস্তুত?
প্রদ্যুম্ন বললে—আমায় আর কিছু বলবেন না, জল দিন।
দেবী কুটীরের মধ্যে আহারের স্থান করে দুজনকে খেতে দিলেন—আহারাদি যখন শেষ হল তখন সন্ধ্যার আর বেশি দেরি নেই। বেতসবনে ছায়া নেমে আসছে, রাঙা সূর্য আবার ঊরুবিন্দ গ্রামের উপর ঝুলে পড়েছে।
গোধূলির আলোয় দেবীর মুখপদ্মে অপরূপ শ্ৰী ফুটে উঠল।
তারপর তিনি ঘটকক্ষে প্রতিদিনের মতো নীচের ঝরনায় জল আনতে নেমে গেলেন।
গুণাঢ্য বললেন—আমি এখান থেকে আগে চলে যাই, তার পর এই ঘটপূর্ণ জল দেবীর গায়ে ছিটিয়ে দিও।
তাঁর চক্ষু অপূর্ণ হল। আবেগভরে তিনি প্রদ্যুম্নকে আলিঙ্গন করে বললেন— আমি কাপুরুষ, আমার সে সাহস নেই, নইলে-–
তিনি কুটীরের মধ্যে তাঁর দ্রব্যাদি সংগ্রহ করে নিলেন। তারপর সরু পথ বেয়ে বেতবনের ধার দিয়ে পাহাড়ের অপর পারে চলে গেলেন, তারই নীচে একটু দূরে মগধ থেকে বিদিশা যাওয়ার রাজবক্স।
প্রদ্যুম্ন চারিদিকে চেয়ে বসে বসে ভাবলে, ওই নীল আকাশের তলে বিশ বৎসর আগে সে মায়ের কোলে জন্মেছিল, তার সে মা বারাণসীতে তাদের গৃহটিতে বসে বাতায়ন-পথে সন্ধ্যার আকাশের দিকে চেয়ে হয়তো প্রবাসী পুত্রের কথাই ভাবছেন—মায়ের মুখখানি একবারটি শেষবারের জন্যে দেখতে তার প্রাণ আকুল হয়ে উঠল। ওই পূর্ব আকাশের নবমীর চাঁদ কেমন উজ্জ্বল হয়েছে! মগধ যাবার রাজপথে গাছের সারির মাথায় একটা তারা ফুটে উঠল। বেতবনের বেতডাঁটাগুলো তরল অন্ধকারে আর ভালো দেখা যায় না।
প্রদ্যুম্নের চোখ হঠাৎ অপূর্ণ হল।
সেই সময়ে সে দেখলে—দেবী জল নিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে আসছেন। মন্ত্রপূত জলপূর্ণ ঘট সে মাটিতে নামিয়ে রেখেছিল; দেবীকে আসতে দেখে সে তা হাতে তুলে নিলে।
দেবী কুটিরের সামনে এলেন, তাঁর হাতে অনেকগুলো আধ-ফোটা কুমুদ ফুল।
প্রদ্যুম্নকে জিজ্ঞাসা করলেন—সন্ন্যাসী কোথায়?
প্রদ্যুম্ন বললে—তিনি আবার কোথায় চলে গেলেন। আজ আর আসবেন না।
তারপর সে গিয়ে দেবীর পায়ের ধুলো নিয়ে তাঁকে প্রণাম করে বললে—মা, না-জেনে তোমার ওপর অত্যন্ত অন্যায় আমি করেছিলাম, আজ তারই শাস্তি আমাকে নিতে হবে। কিন্তু আমি তার জন্যে এতটুকু দুঃখিত নই। যতক্ষণ জ্ঞান লুপ্ত না-হয়ে যায়, ততক্ষণ এই ভেবে আমার সুখ যে, বিশ্বের সৌন্দর্যলক্ষ্মীকে অন্যায় বাঁধন থেকে মুক্ত করার অধিকার আমি পেয়েছি।
দেবী বিস্মিত দৃষ্টিতে প্রদ্যুম্নের দিকে চেয়ে রইলেন।
প্রদ্যুম্ন বললে শুনুন, আপনি বেশ করে মনে করে দেখুন দেখি, আপনি কোথা থেকে এসেছিলেন?
দেবী বললেন—কেন, আমি তো বিদিশার পথের ধারে—
প্রদ্যুম্ন এক অঞ্জলি জল তাঁর সর্বাঙ্গে ছিটিয়ে দিলে।
সদ্যোনিদ্রোর্থিতার মতো দেবী যেন চমকে উঠলেন।
প্রদ্যুম্ন দৃঢ়হস্তে আর-এক অঞ্জলি জল দেবীর সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দিলে। নিমেষের জন্যে তার চোখের সামনে বাতাসে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের স্নিগ্ধ প্রসন্ন হিল্লোল বয়ে গেল। তার সারা দেহমন আনন্দে শিউরে উঠল; সঙ্গে সঙ্গে তার মনে এল— বারাণসীতে তাদের গৃহে সন্ধ্যার-আকাশে-বদ্ধ-আঁখি বাতায়নপথবর্তিনী তার মা!
কুমারশ্রেণীর বিহারে আচার্য শীলব্রতের কাছে একটি মেয়ে অল্পবয়সে দীক্ষা গ্রহণ করে। তার নাম সুনন্দা, সে হিরণ্যনগরের ধনবান শ্ৰেষ্ঠী সামন্তদাসের মেয়ে। পিতামাতার অনেক অনুরোধ সত্বেও মেয়েটি নাকি বিবাহ করতে সম্মত হয়নি। অত্যন্ত তরুণ বয়সে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করায় সে বিহারের সকলের শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে উঠেছিল। সেখানে কিন্তু কারো সঙ্গে সে তেমন মিশত না, সর্বদাই নিজের কাজে। সময় কাটাত আর সর্বদাই কেমন অন্যমনস্ক থাকত।
জ্যোৎস্নারাত্রে বিহারের নির্জন পাষাণ অলিন্দে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে আপন মনে প্রায়ই কী ভাবত; মাঠের জ্যোৎস্নজাল কাটিয়ে অনেক রাতে কাউকে বিহারের দিকে আসতে দেখলে সে একদৃষ্টে সেদিকে চেয়ে থাকত, যেন কতদিন আগে তার সে প্রিয় আবার আসবে বলে চলে গিয়েছিল, তারই আসবার দিন গুণে গুণে এ শ্রান্ত শান্ত ধীর পথ-চাওয়া… প্রতি সকালে সে কার প্রতীক্ষায় উন্মুক্ত হয়ে রইত, সকাল কেটে গেলে ভাবত বিকালে আসবে, বিকাল কেটে গেলে ভাবত সন্ধ্যায় আসবে—দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এরকম কত সকাল সন্ধ্যা কেটে গেল —কেউ এল না… তবু মেয়েটি ভাবত, আসবে… আসবে, কাল আসবে,… পাতার শব্দে চমকে উঠে চেয়ে দেখত—এতদিনে বুঝি এল।
