তবে বেড়াতে বেড়াতে কতকগুলি কৌতূহলজনক কথা তার কানে গিয়েছে।
মগধের প্রসিদ্ধ ভাস্কর মিহিরগুপ্ত রাজার আদেশমতো ভগবান তথাগতের মূর্তি তৈরি করতে আদিষ্ট হয়েছিলেন। এক বৎসর পরিশ্রম করে তিনি যে মূর্তি গড়ে তুলেছেন, তার মুখশ্রী এমন রূঢ় ও ভাববিহীন হয়েছে যে তা বুদ্ধের মূর্তি কি মগধের দস্যু দমনকের মূর্তি, তা সে-দেশের লোক ঠিক বুঝতে পারছে না।
তক্ষশীলার বিখ্যাত দার্শনিক পণ্ডিত যমুনাচার্য মীমাংসাদর্শনের ভাষ্য প্রণয়ন করতে নিযুক্ত ছিলেন, হঠাৎ তাঁর নাকি এমন দুর্দশা ঘটেছে যে তিনি আর সূত্রের অর্থ করে উঠতে না-পেরে আবার বৈদিক ব্যাকরণের সুবন্ত প্রকরণ থেকে পড়তে আরম্ভ করেছেন।
মহাকোটঠি বিহারের চিত্রাবিদ্যা-শিক্ষক ভিক্ষু বসুব্রত বুদ্ধ ও সুজাতা’ নামক তাঁর চিত্ৰখানা বৎসরাবধি চেষ্টা করেও মনের মতো করে এঁকে উঠতে না-পেরে বিরক্ত হয়ে ওদিক একবারে ছেড়ে দিয়ে সম্প্রতি নাকি শাকুনশাস্ত্রের চর্চায় অত্যন্ত উৎসাহ দেখাচ্ছেন।
একদিন প্রদ্যুম্ন সন্ধান পেলে ঊরুবি গ্রামের কাছে একটা নির্জন স্থানে একজন গো-চিকিৎসক এসে বাস করছেন। তাঁর চেহারার বর্ণনার সঙ্গে সুরদাসের আকৃতির অনেকটা মিল হল। তখনি সে গ্রামে গিয়ে অনেককে জিজ্ঞাসা করলে, কিন্তু গো চিকিৎসকের সন্ধান কেউ দিতে পারলে না।
সেদিন ঘুরতে ঘুরতে অবসন্ন অবস্থায় ঊরুবিন্দ গ্রামের প্রান্তের একটা বড় বটগাছের ছায়ায় সে বসেছে। সন্ধ্যা তখনও নামেনি, ঝিরঝিরে বাতাসে গাছে পাতাগুলো নাচছে, পাশে মাঠে পাকা শস্যের শীষগুলো সোনার মতো চিকমিক করছে, একটু দূরে একটা ডোবার মতো জলাশয়ে বিস্তর কুমুদ ফুল ফুটে আছে, অনেক বন্যহংস তার জলে খেলা করছে।
সামনে একটু দূরে একটা ছোটো পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে একটা ঝরনা। পাহাড়ের নীচে এক জায়গায় ঝরনার জল খানিকটা আটকে গিয়ে ওই ডোবার মতো জলাশয়টা তৈরি করেছে। প্রদ্যুম্নের হঠাৎ চোখ পড়ল, পাহাড়ের গা বেয়ে ধাপে ধাপে ঘটকক্ষে এক স্ত্রীলোক নেমে আসছেন।
দেখে তার মনে কেমন সন্দেহ হওয়াতে সে এগিয়ে গেল। ডোবার একদিকের উঁচু পাড়ে গিয়ে দেখেই তার মাথাটা যেন ঘুরে উঠল—এই তো! এই তো তিনি! ভদ্রাবতীর তীরে শালবনে ইনিই তো পথ হারিয়ে ঘুরছিলেন, মাঠের মধ্যে জ্যোৎস্নারাতে এঁকেই তো সে দেখেছিল—তবে তাঁর অঙ্গের সে জ্যোতির এক কণাও আর নেই, পরনে অতিমলিন এক বস্ত্র। কিন্তু সেই চোখ, সেই সুন্দর গঠন।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে তার আর কোনো সন্দেহ রইল না যে, এই তিনি। তার মনের মধ্যে গোলমাল বেধে গেল। সে উত্তেজনার মাথায় বিহার ছেড়ে সুরদাসের খোঁজ করে বেড়াচ্ছিল বটে, কিন্তু দেখা পেলে কি করবে তা সে ভাবেনি। কাজেই সে একরকম লুকিয়েই সেখান থেকে চলে এল।
রোজ রোজ সন্ধ্যায় প্রদ্যুম্ন এসে বটগাছটার তলায় বসে। রোজ সন্ধ্যার আগে দেবী পাহাড়ের গায়ের পথ বেয়ে নেমে আসেন, আবার সন্ধ্যার সময় ঘটকক্ষে ধাপে ধাপে উঠে চলে যান—সে রোজ বসে দেখে।
এই রকম কিছুদিন কেটে গেল। একদিন প্রদ্যুম্ন মাঠের গাছতলায় চুপ করে বসে আছে, সেই সময় দেবী জলাশয়ে নামলেন। সেও কি ভেবে ডোবার এদিকের পাহাড়ের দিকে দাঁড়াল—দেখলে দেবী ঘট নামিয়ে রেখে কুমুদ ফুল সংগ্রহে বড়ো ব্যস্ত। একটা বড়ো ফুল জলাশয়ের এপারের দিকে এগিয়ে বেশি জলে ফুটেছিল, তিনি সেটা সংগ্রহের জন্য খানিকটা বৃথা চেষ্টা করবার পর চোখ তুলে অপর পারে প্রদ্যুম্নকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ একটু অপ্রতিভের হাসি হাসলেন—তারপর হাসিমুখে তার দিকে চেয়ে বললেন—ফুলটা আমায় তুলে দেবে?
—দিই, যদি আপনি এক কাজ করেন।
—কি বলো?
—আমায় কিছু খেতে দেবেন? আমি সমস্ত দিন কিছু খাইনি। দেবীর মুখে ব্যথার চিহ্ন দেখা দিল। বললেন—আহা! তা এতক্ষণ বলোনি কেন?—এপারে এসো, থাকগে ফুল।
প্রদ্যুম্ন জলে নেমে ফুলটা সংগ্রহ করে ওপারে গেল।
দেবী বললেন—তুমি মাঠের মাঝের ওই বড়ো গাছটির তলায় রোজ বসে থাকো, না?
প্রদ্যুম্ন তাঁর হাতে ফুলটা দিয়ে বললে—হাঁ, আমিও দেখি আপনি সন্ধ্যার সময় রোজই জল নিতে আসেন।
দেবী হাসিমুখে বললেন, ওই পাহাড়ের ওপরই আমার ঘর—এসো তুমি আমার সঙ্গে—তোমায় খেতে দিইগে।
হঠাৎ দেবী কেমন একপ্রকার বিহবল চোখে চারিদিকে চাইলেন। তারপর পাহাড়ের গায়ে কাটা ধাপ বেয়ে উঠতে লাগলেন, প্রদ্যুম্ন পিছনে পিছনে চলল। পাহাড়ের উপরে উঠে গিয়ে—একটু দূরে বুনো বাঁশঝাড়ের আড়ালে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা ছোটো কুটীর। দেবী বন্ধ দুয়ার খুলে ঘরের মধ্যে গিয়ে প্রদ্যুম্নকে বললেন–এসো।
প্রদ্যুম্ন দেখলে কুটীরে কেউ নেই, জিজ্ঞাসা করলে—আপনি কি এখানে একা থাকেন?
দেবী বললেন—না। এক সন্ন্যাসী আমায় এখানে সঙ্গে করে এনেছেন, তিনি কী করেন জানিনে, কিন্তু মাঝে মাঝে এখান থেকে চলে যান,—পাঁচ-ছদিন পরে আসেন। তুমি এখানে বসো।
দেবী মাটির ঘট পূর্ণ করে তাকে যবাগ্ পান করতে দিলেন, স্বাদ অমৃতের মতো, এমন সুস্বাদু যবাথু সে পূর্বে কখনো পান করেনি।
প্রদ্যুম্নের মনে হল, যদি আচার্য পূর্ণবর্ধনের কথা সত্য হয়, আর যদি সে স্বচক্ষে যা দেখেছে তা ইন্দ্রজাল না-হয়, তবে এই তো দেবী সরস্বতী তার সামনে। তার জানবার কৌতূহল হল, ইনি নিজের সম্বন্ধে কী বলেন!
সে জিজ্ঞাসা করলে—আপনারা এর আগে কোথায় ছিলেন? আপনার দেশ কোথা?
