হীরু বলেছিল—আসছিস কেন পোড়ারমুখী, ভূত ধরে খাবে যে—
কুমী ভেংচি কেটে বলেছিল—ইস! ভূতে ধরে ওঁকে খাবে না—আমাকেই খাবে। আলেয়া বুঝি ভূত? ও তো একরকম বাষ্প, আমি পড়িনি বুঝি চারুপাঠে? শুনবে বলব…অনেকের বিশ্বাস আছে আলেয়া একপ্রকার ভূতযোনি, বাস্তবিক ইহা তা নয়—
হীরু ধমক দিয়ে বলেছিল—রাখ তোর চারুপাঠ—আরম্ভ করে দিলেন এখন অন্ধকারের মধ্যে চারুপাঠ…বলে ভয়ে মরচি—
পরক্ষণেই কুমী খিলখিল করে হেসে উঠে বলেছিল—কী বললে হীরুদা, ভয়ে মরচ? হি হি হি হি—এত ভয় তোমার যদি এলে কেন? চারুপাঠ পড়লে ভয় থাকত না…চারুপাঠ তো আর পড়োনি?
সেইসব পুরোনো গল্প। আলেয়া…আলেয়াই বটে।
কুমীর যে খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে তা বোঝা গেল, যখন ও গ্রামের এক বিধবা গরিব মেয়ের কথা তুললে। আগে এসব কথা কুমী বলত না। এখন সে পরের দুঃখ বুঝতে শিখেচে। মুখুয্যে বাড়ির বড়ো পুরীপাল্লার মধ্যে হর মুখুজ্যের এক বিধবা নাতনি—নিতান্ত বালিকা—কী রকম কষ্ট পাচ্চে, পুকুরঘাটে কুমীর কাছে বসে নির্জনে মৃত স্বামীর রূপগুণের কত গল্প করে—এ কথা কুমী দরদ দিয়ে বলে গেল। সত্যিই মাতৃত্ব ওর মধ্যে জেগেছে, ওকে বদলে দিয়েছে অনেকখানি।
হঠাৎ কুমী বললে—অই দেখো হীরুদা, বকেই যাচ্চি। তোমায় যে খেতে দেব, সে-কথা মনে নেই।
তার পরে সে উঠে তাড়াতাড়ি হীরুকে ঠাঁই করে দিয়ে ভাত বেড়ে নিয়ে এল। হাসিমুখে বললে—জামালপুরের বাবুর আজ কিন্তু পান্তা ভাত খেতে হবে। রুচবে তো মুখে? নেবু কেটে দেব এখন অনেক করে, নারকোল-কুমড়ি আছে, কচুর শাক আছে।
এসব সত্যিই হীরু অনেকদিন খায়নি। যা যা সে খেতে ভালোবাসে, কুমী তার কিছুই বাদ দেয়নি। হীরু আশ্চর্য হয়ে গেল—এতকাল পরেও কুমী মনে রেখেছে এসব কথা।
খেতে বসে হীরু বললে—কুমী, ছেলেবেলা ভালো লাগে, না এখন ভালো লাগে?
—এ কথার উত্তর নেই হীরুদা। ছেলেবেলায় তোমরা সব ছিলে, সে একদিন ছিল। এখনও তা বলে খারাপ লাগে না—জীবনে নানারকম দেখা ভালো নয় কি?
—কুমী, একটা কথার উত্তর দে। তোর সংসারের টানাটানি খুব?
-কে বললে এ কথা? মা বলেছিল সেই তো কাল রাত্তিরে? ও বাজে কথা, জানো তো, মা যত বাজে বকে। বুড়ো হয়ে মার আরও জিব আলগা হয়ে গেছে।
–কুমী, আমার কাছে সত্যি কথা বলবিনে?
—ওই, তুমিও পাগলামি শুরু করলে। নাও, খেয়ে নাও—যত বাজে বকতে পারো—মা গো!…দাঁড়াও পায়েসটা আনি, কচুর শাক পড়ে রইল কেন অতখানি?…না সে হবে না—
—দ্যাখ কুমী, আমার কাছে বেশি চালাকি করিসনে। তোকে আর আমি জানিনে? কোদলার ঘাটে পায়ে খেজুরকাঁটা ফুটে গিয়েছিল, মুখে একটু রা করিসনি, জানতে দিসনি কাউকে–
—আবার?
হীরু চুপ করে গেল। এতখানি বলে সে ভালো করেনি, ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেচে। কুমী যা ঢাকতে চায়, ও তা বার করে কুমীর আত্মসম্মানে ঘা দিতে চায় কেন? ছিঃ—
কুমী বললে—আবার কবে আসবে হীরুদা?
—সত্যি কথা যদি শুনতে চাস, আমার যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না কিন্তু।
—আবার বাজে বকতে শুরু করেচ হীরুদা। তোমার যা কিছু সব সামনে, চোখের আড়াল হলে আর মনে থাকে না। আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যত বাজে বকুনি
—তুমি তো জানো না একটুও বাজে বকতে? আমি ইচ্ছে করলে থাকতে পারিনে ভেবেছিস?
—হাঁ, থাকো না দেখি কাজকর্ম বন্ধ করে। বউদি এসে চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যাবে না?
—আচ্ছা সে যাক, একটা কথার উত্তর তোকে দিতেই হবে। আমি যদি এখানে থাকি তুই খুশি হোস?
—উঃ, মা গো, মুখ বুজে খেয়ে নাও দিকি? কী বাজে বকতেই পারো!
হীরু দুঃখিতভাবে বললে—আমার এ কথাটারও উত্তর দিবিনে কুমী? তুই এত বদলে গিয়েছিস আমি এ ভাবতেই পারিনে। আচ্ছা, বেশ।
কুমী হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়তে পড়তে বললে—তোমার কিন্তু একটুও বদলায়নি হীরুদা, সেইরকম ‘আচ্ছা, বেশ’ বলা, সেইরকম কথায় কথায় রাগ করা। আচ্ছা, কী বলব বলো দিকি? তুমি জানো না ও-কথার কী উত্তর আমি দিতে পারি? ভেবে দেখো তা হলে আমি বদলাইনি, বদলে গিয়েছ তুমি হীরুদা।
—আচ্ছা কুমী, এতটা না-বকে সামান্য দু-কথায় সাদা উত্তর একটা দে না কেন? বকুনিতে আমি কি তোর সঙ্গে পারব?
-না, তা তুমি পারবে কেন? বকতে তুমি একটুও জানো না। হ্যাঁ, হই।
–মন থেকে বলছিস?
—আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করচে হীরুদা, এতটা বদলে গিয়েছ তুমি? যাও—আমি তোমার কোনো কথার আর উত্তর দেব না, তুমি না-নিজের বুদ্ধির বড়ো অহংকার করতে?
—কুমা, রাগ করিসনে। অনেক কাজের মধ্যে থেকে আমার সূক্ষ্ম-বুদ্ধিটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যাক, বাঁচলুম কুমী।
—পায়েসটা খাও, তোমার পায়ে পড়ি। আর বকুনিটা কিছুক্ষণের জন্যে ক্ষান্ত রাখো। কিছু তোমার পেটে গেল না এই অনাছিষ্টি বকুনির জন্যে।
কুমী পরদিন এসে বিছানা-বাক্স গুছিয়ে দিলে। ঘাট পর্যন্ত এসে ওদের নৌকোতে উঠিয়ে দিলে। নৌকো ছেড়ে যখন অনেকটা গিয়েচে তখনও কুমী ডাঙায় দাঁড়িয়ে আছে।
দু-পাড়ের নদীচড়া নির্জন। দুপুরের রৌদ্র আজ বড়ো প্রখর, আকাশ অদ্ভুত ধরনের নীল, মেঘলেশহীন। বন্যার জলে পাড়ের ছোটো কালকাসুন্দি গাছের বন পর্যন্ত ডুবে গিয়েছে। কচুরিপানার বেগুনি ফুল চড়ার ধারে আটকে আছে। সেইসব বনজঙ্গলময় ডাঙার পাশ দিয়ে চলেচে ওদের নৌকো। ঝোপের তলার ছায়ায় ডাহুক চরচে। বন্যার জলে নিমগ্ন আখের খেতের আখগাছগুলো স্রোতের বেগে থরথর করে কাঁপছে।
ছইয়ের মধ্যে পিসিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। নিস্তব্ধ ভাদ্র অপরাহু। নৌকোয় তক্তার ওপর বসে বসে হীরু কত কী ভাবছিল। এ গ্রামে যদি সে থাকতে পারত! মধু ডাক্তারের মতো হাটতলায় ওষুধের ডিসপেনসারি খুলে? ডাক্তারিটা যদি শিখত সে!
