—এই তুমি আজ এসেছ। কেউ তো কখনো আসে না এ বাড়িতে। তুমি যাও, মাংস রান্না হয়ে গিয়েছে।
—হয়ে গিয়েছে! তুমি কী করে জানলে?
খুকি হেসে বললে—আমি জানি যে! যাও তুমি।
—দাঁড়াও, আমি মুখটা ধুয়ে আসি। একসঙ্গে যাব।
মুখ ধুয়ে এসে কিন্তু রাধামোহন খুকিকে আর দেখতে পেলে না। চঞ্চল মন ছেলেমানুষের, আগেই চলে গিয়েছে। বেশ খুকিটি, কেমন পাকা পাকা কথা বললে। হাসতে হাসতে প্রাণ যায়।
ভৈরব বাঁড়ুজ্যে ওকে দেখে বললে—এসো এসো বাবাজি। এই তোমার ডাকতে পাঠাচ্ছিলাম। আজ একটু বেশি রাত হয়ে গেল, একটু মাংস নেওয়া হল আজ। বলি রোজ রোজ ডাল ভাত ওরা খেতে পারে না। আমার বাড়ি আজ দু-দিন খাচ্ছে, সে আমার ভাগ্যি। নইলে ওদের অভাব কী! তাই আজ–
রাধামোহন সলজ্জভাবে বললে—না না, সে কী কথা! যা জুটবে তাই খাব। পর ভাবেন নাকি কাকা? আমি তো বাড়ির ছেলে।
পরদিনও আবার খুকি সন্ধ্যার সময় এসে হাজির।
রাধামোহন বললে—এসো খুকি। তোমার কথাই ভাবছিলাম।
খুকি হেসে বললে—আমার কথা?
—সত্যি তোমার কথা!
খুকি ছেলেমানুষিভাবে ঘাড় দুলিয়ে হেসে বললে—কেন আমি জানি।
—তুমি জানো?
—জানি। কিন্তু বলব না।
রাধামোহন আজ খানিকটা সন্দেশ আনিয়ে রেখেছে, খুকিকে দেবে বলে। অবিশ্যি আনিয়েছিল হরি নন্দীর চাকর অমূল্যকে দিয়ে, ইসলামকাটির বাজার থেকে। ইসলামকাটির সন্দেশ এ অঞ্চলে বিখ্যাত। অমূল্য দেখা যাচ্ছে গল্প করে বেড়িয়েছে। রাধামোহন মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠল অমূল্যর ওপর। খুকিকে হঠাৎ খুশি করে দেবে সন্দেশ হাতে দিয়ে ভেবেছিল। সেটা আর হল কই!
তবুও রাধামোহন বললেন, তুমি জানো না খুকি। কী বলো তো?
খুকি মৃদু মৃদু হেসে বললে—জানি আমি।
ওর হাসির মধ্যে এমন একটা বিজ্ঞতা আছে যে রাধামোহন আর কোনো প্রশ্ন করলে না এ নিয়ে। ও জানে। ওর মৃদু হাসির মধ্যে দিয়েই সে-কথা বোঝা গেল।
অমূল্যটা আচ্ছা তো! পাড়াগাঁয়ের লোকের পেটে কোনো কথা থাকে!
খুকি আবদারের সুরে বললে—কই, দাও আমাকে সন্দেশ?
রাধামোহন ব্যস্ত হয়ে ওকে সন্দেশ দিতে গেল, কিন্তু ওকে আর সেখানে দেখা গেল না। চঞ্চলা বালিকা, কখন হঠাৎ চলে গিয়েছে। ওর ধরন বড়ো আশ্চর্য রকমের!
আহারের সময় ভৈরব বাঁড়ুজ্যের বাড়িতে ও সন্দেশটা নিয়েই গেল। বললে— খুকি বড়ো লাজুক, তখন চলে এল, ওকে একটু এই—
ভৈরব বাঁড়ুজ্যে হেসে বললে—খুকি বুঝি তোমার কাছে গিয়েছিল?
—রোজই যায়। গল্প-সল্প করে।
–তাই নাকি?
—হ্যাঁ, ও একটু লাজুক বটে। খুব ছেলেমানুষ তো।
পরদিন সন্ধ্যায় খুকি আবার নির্দিষ্ট স্থানটিতে এসে দাঁড়াল বারান্দাতে।
রাধামোহন বললে—কাল অমন করে চলে গেলে কেন তুমি? আমি ভারি রাগ করেছিলাম কিন্তু।
খুকি হেসে চুপ করে রইল।
—খেয়েছিলে সন্দেশ?
—বা রে, যখন তুমি বললে, ওই তো আমার খাওয়া হয়ে গেল।
পরক্ষণেই সে যেন স্নেহের সুরে বললে—তুমি এই এসেছ, আমার কত ভালো লাগছে! বাড়িতে পিদিম জ্বলছে। একা একা ভালো লাগে?
—শহরে যাবে? চলো আমার সঙ্গে। চলো—
—আমার এখানেই ভালো। ওসব আমার ভালো লাগে বুঝি?
–বাঃ, কত টকি-ছবি, কত খাবার-দাবার
—হোক গে। আমার তাতে কী? তুমি আবার আসবে বলো!
-–আসব নিশ্চয়ই। কেন আসব না?
—এতদিন তো আসনি। ভিটেতে সন্ধের সময় পিদিম জ্বলেনি তো? আচ্ছা আসি আজ। তুমি তো মঙ্গলবারে যাবে?
রাধামোহন একটু আশ্চর্য হল। মঙ্গলবারে সে যাবে, বলেছিল ভৈরব বাঁড়ুজ্যেকে। ভৈরব কাল আবার বাড়িতে গল্প করেছেন!
তারপর দু-দিন রাধামোহন বৈষয়িক কাজে অন্য গ্রামে গিয়ে রইল। সোমবার অনেক রাত্রে নৌকোযোগে স্বগ্রামে ফিরল বটে, কিন্তু ভৈরব বাঁড়ুজ্যের বাড়ির কারও সঙ্গে অত রাত্রে আর দেখা করলে না। ঘরে চিড়ে ছিল, তাই খেয়ে রাত কাটালে।
পরদিন সে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছে, ভৈরব এসে বললেন—বাবাজি, কাল কত রাত্রে এলে? খেলে কোথায়? আমাদের ডাকা তোমার উচিত ছিল। তুমি তো ঘরের ছেলে। এত লজ্জা করো কেন? ছিঃ—
রাধামোহন বললে—আপনার খুকিটিকে একবার ডেকে দিন না?
—বেশ বেশ। এখুনি ডাকছি—দাঁড়াও—
একটু পরে একটি আট বছরের কালোমতো মেয়ের হাত ধরে ভৈরব বাঁড়ুজ্যে সেখানে নিয়ে এলেন। রাধামোহন বললে—এ খুকি তো নয়, এর দিদি!
ভৈরব বাঁড়ুজ্যে বললেন–এর দিদির তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সে তো শ্বশুরবাড়ি আছে। তুমি তাকে দেখোনি।
—তবে আপনার বাড়ির অন্য কোনো মেয়ে
—আমার বাড়িতে বাবাজি আর কোনো মেয়ে নেই। তবে অন্য কোনো মেয়ে —কিন্তু না, আর কোনো মেয়ে এপাড়ায় নেই ওবয়সের। দু-ঘর তো মোটে ব্রাহ্মণের বাস। বয়স কত?
রাধামোহনের হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বললে—ওর নাম বলেছিল লক্ষ্মী।
—লক্ষ্মী? সে আবার কে? কই, ওনামের মেয়ে এগ্রামেই নেই। তোমার শুনতে-টুনতে ভুল হয়ে থাকবে বাবাজি।
শুনতে ভুল হতে পারে নামটা, কিন্তু সে খুকিটি কে? সে তো আর ভুল হবে না।
—কই বাবাজি, বুঝতে তো পারলাম না। ওবয়সের ওনামের মেয়ে আমাদের পাড়ায় কেউ নেই ঠিকই।
রাধামোহন চিন্তিত মনে বিদায় নিলে। আশ্চর্য ব্যাপার, খুকিই বা আর দেখা করতে এল না কেন?
স্বগ্রাম থেকে ফেরবার দু-বছর পরে রাধামোহন তার পিসির বাড়ি গিয়েছে জব্বলপুরে। সেখানে পুরোনো এক ফোটো-অ্যালবাম খুলে দেখতে দেখতে একটি মেয়ের ফোটো চোখে পড়ল। এই মেয়েটিকে সে যেন কোথায় দেখেছে। ঠিক মনে পড়ল না।
পিসিমাকে ডেকে ফোটোটা দেখাতে তিনি বললেন—একে তুই দেখবি কোথায়! ও তো আমার ছোটো বোন। তোর ছোটো পিসি। বারো বছর বয়সে মারা যায়, তখন তুই কোথায়? তোর মার বিয়েই হয়নি। আমরা তখন সব আমাদের গাঁয়ের বাড়িতেই থাকি।
