বারোমাস গঙ্গাস্নান করিয়া তিনি অনেক পথের দিদি জুটাইয়াছেন। সেই পথের দিদিই সবিস্ময়ে কহিলেন, ওমা, আমি কোথায় যাব!
শাশুড়ি বলিলেন, শুধু কী তাই? কুকুরকে কোলে নিয়ে অষ্টপ্রহর কী আদর করেন—তাকে চুমু খাবার কী ঘটা!
—একেবারে সাহেবিয়ানা!
স্বামী ভুলিয়াও কোনোদিন প্রতিবাদ করে নাই বা প্রশ্রয়ও দেয় নাই। মাঝে মাঝে দৈবাৎ কখনো হয়তো বলিল, বেবি এসে অবধি আমার অবস্থা বড়ো কাহিল হয়ে গেছে।
বেবীর কান দুইটি দুই হাত দিয়া ঈষৎ চাপিতে চাপিতে দু-টি ডাগর চোখে স্বামীর পানে তাকাইয়া স্ত্রী প্রশ্ন করিল, তার মানে?
স্বামী বলিল, মানে, আমাকে তুমি কম ভালোবাসছ। কারণ চব্বিশ ঘণ্টা বেবি হারামজাদাকে নিয়ে থাকলে আমি বেচারার কথাটা স্মরণ হওয়া তোমার দায় হয়ে উঠেছে।
অমনি স্ত্রী অভিমানের সুরে কহিল, ওঃ! বেবির ওপর তোমাদের বাড়িসুদ্ধ সকলের হিংসে। ওকে গলা টিপে মেরে ফেললে তোমাদের ষোলোকলা পূর্ণ হয়, না?
বধূটির গণ্ড বাহিয়া অশ্রুকণা ঝরিতে লাগিল। স্ত্রীকে কাঁদিতে দেখিয়া স্বামীর চিত্তও বিচলিত হইল, ক্ষুব্ধকণ্ঠে কহিল, অমনি রাগ হল রমা? ঠাট্টাও বোঝো না? যা-হোক মানুষ!
রমা ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কহিল, আমি বেশ জানি, এ তোমাদের ঠাট্টা নয়। তোমাদের মনের কথা। বেশ, দূর করে বিদেয় করে দেব একে। দূর হ! দূর হ হারামজাদা।
কথা শেষে সে বেবিকে মেঝের উপর ছুড়িয়া ফেলিল। বেবি কেঁউ কেঁউ করিয়া তাহার ব্যথা প্রকাশ করিল। উঠিয়া বধূটির পায়ের কাছে আসিয়া তাহার পানে ফ্যাল ফ্যাল করিয়া তাকাইয়া লেজ বাড়িতে লাগিল। বধূটি পিছু ফিরিয়া বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কহিল, আর মায়া বাড়াসনে রাক্ষস।
একটির পর একটি করিয়া দিন কাটিতে লাগিল। বেবির সেবাযত্নের ত্রুটি হইল। দুই বেলা মাংস রাঁধিয়া তাহাকে দেওয়া হইত। প্রতিদিন সকালে চা ও বিস্কুট সংযোগে সে জলযোগ করিত। তাহার নানারকমের জামা তৈয়ারি হইল। কিন্তু রমার এই অক্লান্ত সেবাযত্ন সত্বেও বেবির শরীর পুষ্ট হইল না, পরন্তু সে দিন দিন ক্ষীণ হইতে লাগিল, তাহার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত তীক্ষ ও কর্কশ হইল। রমার আপ্রাণ চেষ্টা আদৌ ফলপ্রসূ হইল না। সে একদিন স্বামীকে কহিল, কুকুরটা দিন দিন কেন জানি না শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু ডাক্তার-বদ্যি দেখাও না! শুনেছি কুকুরের নাকি ডাক্তার আছে!
স্বামী কহিল, কুকুর পোর যদি অত শখ তা হলে এক কাজ করো না।
—কী?
—ওটাকে দূর করে দাও। আমি একটা ভালো বিলিতি কুকুর এনে দিচ্ছি। সেটা মানুষ করো।
রমা অভিমান করিয়া কহিল, তার মানে তোমরা সবাই ওর শত্রু। স্বাস্থ্য কী সকলের সমান হয়?
—কিন্তু ওর স্বাস্থ্য বদলাবে না কোনোদিন রমা। ওর জাতটা মনে রেখো।
—ছেলে যদি কুৎসিত কুরূপ হয়, কোনো মা-বাপ তাকে প্রাণ ধরে দূর করে দিতে পারে গো?
তাহার এই চরম আঘাত পাইয়াও স্বামী হো-হো করিয়া হাসিল, বলিল, তার চেয়ে একটা ছেলে মানুষ করো না কেন? কত গরিব ছেলে পাওয়া যাবে।
তারা বড়ো নেমকহারাম হয়।
—কিন্তু রমা, ও কুকুর তোমায় ত্যাগ করতেই হবে।
—কারণ?
—কারণ, ওর রোগটি সোজা নয়, ওর গায়ের ঘা বড়ো বিচ্ছিরি আর ছোঁয়াচে। কখনো সারে না।
স্বামী ভাবিয়াছিল স্ত্রী নিশ্চয়ই ভয় পাইয়া যাইবে, কিন্তু স্ত্রী ভয় পায় নাই। বরং সে নির্ভীকভাবে বেবিকে তাহার বুকে জড়াইয়া ধরিয়াছে। তাহাকে চুম্বন করিতে করিতে বলিয়াছে, বেবি বেবি, সব্বাই তোর শত্রুর!
ক জানি কেন বেবির চোখ দুটি চিক চিক করিয়া উঠিয়াছিল। রমা আঁচল দিয়া তাহার চোখ মুছিয়া দিতে দিতে কহিল, বেবি দুষ্টু, কাঁদছিস? দূর পাগল, আমি তোকে কিছুতেই ছেড়ে দেব না।
কিন্তু এই ঘটনার দিনসাতেক পর বেবিই রমাকে ছাড়িয়া গেল। স্বামী যাহা বলিয়াছিল তাহাই সত্য হইল। বেবি পুরুষানুক্রমে যে দুরারোগ্য ও মারাত্মক রোগ পাইয়াছিল তাহা হইতে বাঁচিয়া থাকিতে নিষ্কৃতি পাইল না। রমা ডাক্তার-বৈদ্য দেখাইতে ত্রুটি করে নাই। সকলে বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছে, এই একটা হীনজাত কুকুরকে এই আপ্রাণ সেবা করিতে দেখিয়া।
শাশুড়ি কহিলেন, পয়সা খোলামকুচির মতো উড়ে গেল দিদি। কুকুরটাকে নিয়ে হারামজাদি পাগল হয়েছে একেবারে। এই বিচ্ছিরি রোগ, অত মাখামাখি কী ভালো? এতে কী এমন বাহাদুরি আছে?
দিদি কহিলেন, ছেলেপিলে নেই কিনা, তাই একটা টান পড়ে গেছে।
শাশুড়ি বলিলেন, ছেলেপিলে হবার বয়স যেন কেটে গেছে। এই তো সবে ছাব্বিশ বছর বয়স। আমার ভোঁদা হয়েছিল একুশ বছরে।
—একটা কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে?
—তাই বলে এতটা বড়াবাড়ি ভালো কি দিদি?
দিদি শাশুড়িকে সাবধান করিয়া দিলেন, ছেলেকে তোমার ভাই অত মিশতে দিও না।
শাশুড়ি কহিলেন, ছেলে তো আর পাগল নয়।
বেবির জীবনের শেষ কয়দিন শাশুড়ি তাহাকে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিতে নিযেধ করিলেন, বধূটির স্বামীও এ আদেশের প্রতিধ্বনি করিল। অগত্যা বেবি বাহিরের উঠানে স্থান পাইল। রাত্রে একটা প্যাকিং বাক্সে তাহার শয্যা রচনা করা হইত। রমা নিজের হাতে রাত্রে তাহাকে খাওয়াইত। খাওয়া শেষ হইলে তাহাকে বাক্সের মধ্যে পুরিয়া দরজা বন্ধ করিয়া শুইতে যাইত। ইদানীং তাহার মুখে বিষাদের ছায়াপাত হইয়াছিল। তাহার যেন অতি আপনারজনটির জীবনান্তের সম্ভাবনা। সন্তানের রোগশয্যাপার্শ্বে সেবারতা মাতার মুখখানিও বুঝি এইরূপই উদাস হইয়া থাকে। তাহার বত্রিশ নাড়ি এমন করিয়াই বার বার মোচড়াইয়া উঠে। রমার স্বামী কহিল, কুকুর কুকুর করে তুমি খেপলে নাকি!
