—কী পেলাম কী জানি। কিন্তু তুমি এলে মা আমার গীতা আর যোগবাশিষ্ঠ জ্যান্ত হয়ে ওঠে। ওদের শ্লোকের মধ্যে থেকে নতুন ভাষ্য বেরিয়ে আসে। আনন্দ যদি শাস্ত্র-আলোচনার উদ্দেশ্য হয়, তবে সেটার ষোলো আনাই পাই তুমি আসলে মা।
আমি হেসে বললাম—তাহলে বলুন জ্যাঠামশাই, আমার মতো শ্রোতা আপনি অনেকদিন পাননি?
—সত্য মা, এতদিন জানতাম না যে লোককে শুনিয়ে এত আনন্দ হয়। নিজেই চর্চা করতাম, এই পর্যন্ত। আজ কিন্তু অন্যরকম বুঝচি। উপযুক্ত শ্রোতা পেলে—
আমারও ভালো লাগে বলেই যাই। কেমন যেন মন বদলে যাচ্ছে, যে মন আমার কোনো কালেই সংসারে ছিল না—তা আরও নিরাসক্ত হয়ে পড়েছে। বন্ধনের মধ্যে কেবল বৃদ্ধা শাশুড়ি। বৃদ্ধা কাঁদেন, আমি বসে যোগবাশিষ্ঠের উপদেশ শোনাই। কিন্তু তাতে তাঁর মন ভেজে না। ঘোর বিষয়ী মন। এ বয়সেও কাঁঠালের ভাগ নিয়ে, সজনে ডাঁটার ভাগ নিয়ে খুড়শাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া। আমি বলি—মা, কী হবে আপনার এঁচড় আর সজনেডাঁটার চুলচেরা ভাগে। ওর কী সার্থকতা? ভগবানের নাম করুন।
বাতাবি লেবু-ফুল ফুটল ফাগুন মাসে—পথে পথে অপূর্ব সুগন্ধ ছড়িয়ে। ঘেঁটুফুলে বাঁশবনের তলা ভর্তি হয়ে গেল। কোকিলের ডাকে মন উদাস হয়ে ওঠে, কত কথা ভাবি। বাল্যকালের কথা, মা-বাবার কথা, স্বামীর কথা—জীবনে কিছু না-পেয়েই যেন সব-কিছু পেয়েছি। যদি কোনো হিসাবি বিষয়ী লোক বলে, কী পেয়েচ, হিসেব দেখাও হয়তো কিছু দেখাতে পারব না—কারণ বাইরে আমার অমলিন সরুপাড় ধুতি আর দু-গাছি অতি সরু বিবর্ণ সোনার চুড়ির মধ্যে কেউ কোনো লাভের সন্ধানই খুঁজে পাবে না, আমার মন বলে কী-এক জিনিসের ঠিকানা মিলেচে, যার দরুন অফুরন্ত আনন্দের ভাণ্ডার আজ আমার কাছে খোলা। অন্য সব কিছু যেন তুচ্ছ হয়ে গিয়েছে।
একদিন আমার শাশুড়ি বললেন-ও বউমা, তোমাদের গাঁয়ের একটি ছেলে আমাদের গ্রামে হরি কলুর বাড়িতে এসে চাকরি করচে। বামুনের ছেলে, দিব্যি চেহারা। কিন্তু বাপু, কলুবাড়ি জল তোলে, গোরুর জাব কাটে, এ আবার কেমন কথা! বড্ড গরিব বোধ হয়। আমি দেখিনি, কে কাল বলছিল ঘাটে। বললে, বউমার দেশের লোক।
যেদিন শুনলাম, সেইদিনই পথে নসুমামার সঙ্গে দেখা। কিন্তু প্রথমটা চিনতে পারিনি। নসুমামার মাথায় বড়ো বড়ো চুল, পরনে শাড়ি, আধ-ঘঘামটা দেওয়া, হাতে কাঁচের চুড়ি, মেয়েলি বেশ, অথচ মুখে ঈষৎ গোঁফ-দাড়ি। আমার হাসি পেল ওর এই অপরূপ বেশ দেখে। আমায় দেখে মেয়েলি সুরে বললেও পাঁচী, ভালো আছিস তো ভাই?
আমি অবাক হয়ে বললাম—তোমার এ কী বেশ নসুমামা?
নসুমামা অদ্ভুত হাসি হেসে বললে—এই, থাকলেই হল একরকম।
–তুমি নাকি কলুবাড়ি বাসন মাজো, জল তোলো?
—দোষ কী?
—তুমি যা ভালো বোঝে। বৃদ্ধা শাশুড়ি সেই শ্রাবণ মাসে দেহ রাখলেন। দিন-দশেক জ্বরে ভুগে গভীর রাত্রে মৃত্যুর কিছু পূর্বে অশ্রুভরা চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন—তোমাকে কার কাছে রেখে যাচ্চি মা?
বৃদ্ধার আকুল সুরে মনে ব্যথা বাজল আমার। তাঁর জ্বরশীৰ্ণ হাত দুটি ধরে বললাম—কেন, আমার সোনার চুড়ি আছে, এক বিঘে আমন ধানের জমি আছে
-ভাবনা কী মা আমার? কিছু ভেব না আমার জন্যে।
বিষয়ী লোককে বিষয়ের ভাষায় সান্ত্বনা দিই। আমি জানি যাঁর কাছে আমি আছি, তিনি আমায় কোনোদিন ফেলবেন না, চরণে স্থান দেবেনই।
নসুমামার সঙ্গে দেখা আবার একদিন। সে একগাদা কাপড়-সেদ্ধ নিয়ে ঘাটে যাচ্চে কাচতে। আমি বল্লাম—ও-সব কাজ আমায় দাও নসুমামা। আমি তোমায় করতে দেব না।
জোর করে সেগুলো তার কাছ থেকে নিয়ে নিজে কেচে দিলাম। আমার চোখের সামনে ও-সব খাটুনি খাটতে দেব না ওকে। বললাম—হরি কলুর বাড়ি গোয়াল পরিষ্কার আমি করে দেব।
—না পাঁচী, লক্ষ্মীটি, লোকে কী বলবে?
—আমি গ্রাহ্য করিনে।
—আমি করি।
—মিথ্যে কথা, তুমি কিছু গ্রাহ্য করো না, কলুবাড়ির বাসন মাজচো অথচ—
—পাঁচী, এসব তুই বুঝবিনে। ওসব করিসনে কক্ষনো। ওর কথা সান্যাল জ্যাঠাকে বলতে তিনি বড়ো ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ওকে দেখবার জন্যে। হরি কলুর বাড়ির পেছনে একটা পুকুর, পুকুরের চারিধারে আম কাঁঠালের বাগান। তারই একটা গাছতলায় দেখা গেল ও চোখ বুজে বসে। সেই থেকে সান্যালমশায়ের সঙ্গে ওর ভাব হয়ে গেল। যোগবাশিষ্ঠের দলে ভিড়ে পড়ল।
সান্যাল জ্যাঠা বলেন—ছেলেটি শুদ্ধসত্ব।
শীতের প্রথমে কলুপাড়ায় কলেরা দেখা দিল। একদিনে আঠারোটার কলেরা হল, পাঁচটা মরে গেল। নসুমামা কী ভীষণ পরিশ্রম করে সেবা শুরু করলে। হরি কলুর ছোটো ভাই ওর সেবাতেই নাকি বেঁচে উঠল। রাত্রে ঘুমোয় না। নিজে হাতে রোগীদের গা ও বিছানা পরিষ্কার করে।
কলেরায় কলুপাড়া উজাড় হয়ে গেল—ধরলে কিছু দূরে মুচিপাড়াকে। ভয়ে তখন মুচিপাড়ার অনেক লোক পালিয়েছে। বুড়ো হিরু মুচি একদিনের অসুখে মারা গেল। কিন্তু তখন এমন ভয় হয়ে গিয়েচে সকলের, মড়া ঘরের মধ্যে পড়ে রইল সারাদিন, কেউ ফেলতে চায় না। সন্ধের পর নসুমামা একা গিয়ে ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে ফেলে দিয়ে এল খালের ধারে শ্মশানে।
যোগবাশিষ্ঠের আসরে এ কথা শুনে আমি উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। আমিও যাব, নসুমামাকে সাহায্য করব। লোকে যে যা বলে বলুক গে।
জ্যাঠামশায় হেসে বললেন—মা, এ কাজ তোমার নসুমামার। তোমার জন্যে নয়। সব কাজে অধিকারী-ভেদ আছে।
—কেন? আমার অধিকার জন্মায়নি?
—তোমার বুড়ো শাশুড়ি মরে গিয়েছে, জগতে আরও কী বুড়োহাবড়া নেই?
