কর্ণপুর এসব কথা শুনিয়াও শোনেন না। শিশু আজকাল ভাঙা ভাঙা কথা বলিতে শিখিয়াছে—তাহার মুখে আধ আধ বুলি শুনিয়া তিনি দ্বাদশ বৎসর পুর্বের অন্তর্হিত আনন্দ আবার ফিরিয়া পান। তারও আগের কথা মনে হয়, যখন তাঁহার নববিবাহিতা পত্নী প্রথম ঘর করিতে আসিয়াছিল। পিতামাতা বর্তমানে প্রথম যৌবনের সেই সুখের দিনগুলো কত প্রভাতের বিহঙ্গ-কাকলির সঙ্গে, কত পরিশ্রম-ক্লান্ত মধ্যাহ্নে প্রিয়ার হাতের অন্ন-ব্যঞ্জনের সুঘ্রাণের সঙ্গে, অবসন্ন গ্রীষ্মদিনের শেষে উঠানের পুষ্প-ভারনত বাতাবিলেবু গাছটির সঙ্গে পুরাতন দিনের কত হাসি-আনন্দের স্মৃতি জড়ানো আছে। তার পরে তাঁহার প্রথম পুত্রের জন্মোৎসব, স্বামী-স্ত্রীতে মিলিয়া কোলের শিশুকে কেন্দ্র করিয়া কত সুখ-স্বর্গ গড়িয়া তোলা! আবার মনে হয়, জীবনটাকে বিশ বছর পিছু হটাইয়া দিয়া কে যেন পূর্ব অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করাইতেছে।
শিশুকে সামলাইয়া রাখা দায়। অনবরত হামাগুড়ি দিয়া দাওয়ার ধারে আসিতেছে—হঠাৎ একবার অত্যন্ত ধারে আসিয়া হাত পিছলাইয়া মুখ থুবড়াইয়া নীচে পড়িয়া যাইতে বসিয়াছিল—তাড়াতাড়ি আসিয়া কর্ণপুর ধরিয়া ফেলিলেন। কী একটা বিপদ ঘটিবার অজানা ভয়ে পতনোন্মুখ শিশুর অবোধ চক্ষুদুটি ডাগর হইয়া উঠিয়াছে।… এ নিজের ভালোও বুঝে না, এই ভাবনায় তাঁহার মন এই ক্ষুদ্র বালকের দিকে অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়।
বন্ধন এইরূপ করিয়াই জড়ায়। ক্রমে ক্রমে কয়েক বৎসর হইয়া গেল, শিশু এক্ষণে সাত–আট বৎসরের বালক। তাহার দুষ্টামির জ্বালায় কর্ণপুর দিনেরাত্রে একদণ্ড শান্তি পান না। এখানকার দ্রব্য ওখানে লইয়া গিয়া ফেলে, কখন কী করিয়া বসে। নিষিদ্ধ কার্য করিতেই তাহার আগ্রহ সর্বপেক্ষা বেশি।
বর্ষার দিনে কর্ণপুর তাহাকে ঘরের মধ্যে বসাইয়া পড়ান। পড়িতে পড়িতে সে ছুটি লইয়া অল্পক্ষণের জন্য বাহিরে যায়। অনেকক্ষণ আসে না দেখিয়া কর্ণপুর দাওয়ায় আসিয়া দেখেন—বালক অবিশ্রান্ত বর্ষণের মধ্যে উঠোনের এপ্রান্ত হইতে ওপ্রান্তে মহাখুশির সহিত নাচিয়া বেড়াইতেছে। কর্ণপুর তিরস্কারের সুরে বলেন— ছি বাবা নীলু, দুষ্টুমি কোরো না। উঠে এসো।…আদর করিয়া বালকের নাম রাখিয়াছেন নীলমণি।
বালক বর্ষণ-ধৌত সুন্দর মুখখানি উঁচু করিয়া হাসিমুখে দাওয়ায় উঠিয়া আসে। শাসন করিতে কর্ণপুরের মন সরে না, মনে ভাবেন—কোথায় ছিল এর পাত্তা? সে সন্ধ্যাবেলা যদি উঠিয়ে না আনতাম, মুখে জলের গণ্ডুষ না-দিতাম— তবে?…মমতায় তাঁহার মন আর্দ্র হইয়া পড়ে। মুখে তিরস্কার করিতে করিতে বালকের সিক্তকেশ মুছাইয়া শুষ্কবস্ত্র পরাইয়া পুনরায় পড়াইতে বসেন।
আবার অন্যমনস্ক হইলে কোন ফাঁকে সে বাহির হয়। কর্ণপুর পুথি হইতে মুখ তুলিয়া বাহিরে গিয়া দেখেন সে দুই হাত জোড় করিয়া মুখ উঁচু করিয়া খড়ের চাল হইতে পতনোন্মুখ একবিন্দু জল ধরিবার জন্য ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। হাত ধরিয়া আবার তাহাকে ঘরের মধ্যে টানিয়া আনেন।
বালক উত্তমরূপে বুঝে, বাবা তাহাকে কখনো মারিবেন না।
নিজ পুত্রের শোক কর্ণপুর ইহাকে পাইয়া ভুলিয়াছেন। কেবল এক-এক দিন নির্জন দ্বিপ্রহরে তাহার মুখের হাসি দূরাগত করুণ সংগীতের মতো মনে আসে। মনের ইতিহাসে এই বালকের সে অগ্রজ, রৌদ্রভরা দ্বিপ্রহরে সে-ই আসিয়া তাহার দাবি জানায়। কর্ণপুর উঠিয়া গিয়া নিদ্রিত বালকের চুলগুলির মধ্যে আঙুল চালাইয়া দেন। মুখের দিকে চাহিয়া থাকেন।
শীঘ্রই কিন্তু বালককে লইয়া তাঁহার বড়ো বিপদ হইল। এত বেশি এবং এত বিনাকারণে সে মিথ্যা কথা বলে যে কর্ণপুর রীতিমতো বিপন্নবোধ করিতে লাগিলেন। নানারকমে মিথ্যা কথনের দোষ ও সত্যভাষণের পুরস্কার সম্বন্ধে বহু গল্প উপদেশ বলিয়াও তাহাকে সংশোধন করিতে পারিলেন না। তাঁহার কাছে সে অনেক কথা আজকাল লুকায়—আগে তাহা করিত না। কর্ণপুর ইহাতে মনে মনে কষ্ট পান। তাহা ছাড়া তাহার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রতিবেশীদের নিকট হইতে আসে। এগাছের লেবু, ওগাছের আম ছিঁড়িয়া আনিয়াছে, অমুকের ছেলেকে মারিয়াছে। কর্ণপুর বসিয়া বসিয়া ভাবেন, কোন বংশের ছেলে, কী কুলগত স্বভাবচরিত্র লইয়া জন্মিয়াছে কে জানে। তাঁহার আপন ছেলের বেলায় এগারো বৎসরেও কোনো অভিযোগ তাঁহাকে শুনিতে হয় নাই—কিন্তু এবালক তাঁহাকে এ কী মুশিকিলে ফেলিল? ধর্মভীরু সরলস্বভাব কর্ণপুর বালকের এসব ব্যাপারে মনে মনে বড়ো ব্যথিত হন। তাহার ভবিষ্যৎ কী হইবে ভাবিয়া সময় সময় ভীত হইয়া পড়েন। বালস্বভাব সুলভ চপলতা বলিয়া উড়াইয়া দিতে গিয়াও মনে মনে অস্বস্তিবোধ করেন; ভাবেন—উঠন্ত মূল পত্তনেই চেনা যায়—কোন বংশের ছেলে ঘরে আসিল! কী জানি গতিক কী দাঁড়াইবে?
অন্য সময় বসিয়া বসিয়া ভাবেন, তাঁহার অবর্তমানে বালকের ভরণপোষণের কী হইবে? যদি মানুষ করিয়া দিয়াও মারা যান, তাহা হইলেও একটা এমন ব্যবস্থা করিয়া যাইতে চাহেন যাহাতে তাহার ভবিষ্যতে সাংসারিক কষ্ট না-ঘটে। কোন জমির কী ব্যবস্থা করিবেন, কুসীদ ব্যবসায় করিলে কীরূপ উপার্জন হইতে পারে ইত্যাদি চিন্তায় কর্ণপুর ব্যস্ত থাকেন।
এক-এক সময় হঠাৎ যেন আত্মবিস্মৃতি ঘটিয়া যায়। বিষয় চিন্তা!
মনে মনে ভাবেন এসব কী আসিয়া জুটিল? সারাদিনে একদণ্ড ইষ্টচিন্তা করিতে পাই না, প্রৌঢ় বয়সে এ দুর্দৈব মন্দ নয়!
প্রতিবেশী রঘুনাথ ভট্টাচার্য অভিযোগ করিলেন, কর্ণপুরের পালিতপুত্র তাঁহার বাড়ির ময়না পাখির খাঁচা খুলিয়া পাখি উড়াইয়া দিয়াছে। বালক বাড়ি আসিলে কর্ণপুর জিজ্ঞাসা করিলেন—নীলু, শুনছি তুমি নাকি ওদের পাখি উড়িয়ে দিয়ে এসেছ?
