অম্বুজ তোমার বন্ধু?
আবার লাল হয়ে রুণা বলল, হ্যাঁ, মানে ওই, কাউকে বলবেন না।
না, এ আবার কাউকে বলে না কি? তা ছাড়া এ তো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তুমি অত লজ্জা পাচ্ছ কেন? আচ্ছা রুণা অম্বুজ ছেলেটি তো সেদিন আরও অনেক আগে চলে এসেছিল…
ম মানে ও ওইরকম করছিল। ওর সইছিল না। সারাক্ষণ পায়চারি করবে।
তার পরে তোমার আর ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে?
না দিদি। আমি তো বেরোই-ই না। মা ফোন পর্যন্ত গার্ড দিয়ে রেখেছে।
আচ্ছা। অম্বুজের ঠিকানাটা আমায় দাও।
রুবি হসপিটালের কাছে নন্দনা পৌঁছে গেল। তখন তার ঘড়িতে আটটা বাজছে।
তার মোবাইলটা ঝনঝন করে বাজছে। এখন ধরার উপায় নেই।
বাইক চালাতে চালাতে মোবাইল সে ধরে না। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার বাসনা তার নেই। থেমে গেছে। কিন্তু আবার বাজছে। বিজন সেতু থেকে নেমে একডালিয়ার মোড়ে বাইকটা এক পাশ করে সে মোবাইলটা তুলল, মিসড কল। এ তো বাড়ির নম্বর! আবার একটা মিসড কল—সেটাও বাড়ির নম্বর। তার মানে মা এসে গেছে। সে তো পৌঁছেই গেল। আর এখন কলের জবাব দেবার দরকার নেই। একডালিয়া ঢোকার মুখে সে দেখল একটা পুলিশের কালো গাড়ি। একটা অ্যাম্বুল্যান্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে গেল। ভিড় কাটাতে কাটাতে সে শুধু আশপাশ থেকে কটা টুকরো কথা শুনতে পেল, একেবারে খোদ ডাক্তারের বাড়ি, ভাবতে পারেন দোতলায় উঠল কী বেয়ে? ভয়াবহ।… তা-ও ভরসন্ধেবেলা, মাঝরাত্তির তো নয়। কেউ দেখতে পেল না।
কী ব্যাপার? চোর ডাকাত না কি? ডাক্তার? এখানে আরও ডাক্তার থাকেন। ডক্টর শ্রীমানী, ডক্টর প্রীতি চ্যাটার্জি। তবে একটু এগিয়ে সে বুঝতে পারল ঘটনা যা-ই ঘটে থাকুক, সেটা তাদের বাড়িতেই। লোকে লোকারণ্য। তাকে পথ ছেড়ে দিল সবাই। দু-চার লাফে সিঁড়ি টপকে টপকে সে ওপরে উঠে গেল। কেউ নেই, লোকজনের মধ্যে বাহাদুর নীচে ভ্যাবলার মতো ধপাস করে বসে আছে। আর ওপরে জ্যাঠতুতো দাদা অবনীশ যার সেদিন বিয়ে হল আর কেউ নেই। রাত সাড়ে আটটায় যেন বাড়িতে মাঝরাত নেমে এসেছে।
এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও অবুদাকে দেখে নন্দনার মন বিস্বাদ হয়ে উঠেছিল। সে অবনীশকে পছন্দ করে না। ছোটো থেকেই তারা আদায়-কাঁচকলায়। ঝগড়াঝাঁটি নেই। কিন্তু সে অন্তত এই কাজিনটিকে এড়িয়ে যায়। কারণ অনেক।
সে যাই হোক আজ অবনীশকে বিধবস্ত লাগছিল। বলল, তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি? বাড়িতে এত বড় একটা বিপদ হয়ে গেল!
কী হয়েছে? নন্দনার যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে ভয়ে। মা কোথায়? আর সব? বাবা? জলি?
অবনীশ একটু ইতস্তত করল। সময় নিল, তারপর বলল, মনটা শক্ত কর বাচ্চু। শজারু…আমাদের বাড়িতে হানা দিয়েছে। কাকাবাবু… জলি খাবার দিতে গিয়ে দেখে… সে-ও অজ্ঞান। কাকিমা ছিলেন না। পরে এসে দেখেন এই কাণ্ড। এই সময়টা কোনো হেল্প ছিল না। জানি না কী হবে!
নন্দনার ভেতর থেকে একটা ফোঁপানি উঠে আসছে। সে সেটাকে প্রাণপণে চাপা দেবার চেষ্টা করছে। ভেতরে ভেতরে ওইভাবে কাঁদতে কাঁদতে সে বাবার ঘরের দিকে ছুটল। হা-হা করছে দরজা। ভেতরে টাটকা রক্তের স্বাদ। তাড়াতাড়ি করে মুছে নেওয়া হয়েছে মেঝে। ন্যাড়া গদি কামানো মাথার মতো তার দিকে চেয়ে রয়েছে।
কোন হসপিটাল? সে কোনোমতে জিজ্ঞেস করল। তার এক চমকে মনে পড়ে যাচ্ছে মায়ের সাবধানবাণী। মা মাথার দিব্যি দিয়েছিলেন। তারা হেসেছিল। আড়ালে বসে আরও কেউ বোধহয় হেসেছিল।
অবনীশ এবার এগিয়ে এসে তার হাত ধরল, বাচ্চু প্লিজ, তুই এরকম ভেঙে পড়িসনি। তোর এই অবস্থা হলে কাকিমার কী হবে বল তো!
ব্যস, নন্দনার আর আবেগের বাঁধ থাকল না। ঝড়ের সমুদ্রের মতো সে ভেঙে পড়ল বাবার বিছানার গদির ওপর। সে জানে কোনো আশা নেই। একজনও বাঁচেনি। প্রথম দুটো কেসই তো বাবার নিজের। যথেষ্ট মেডিক্যাল হেল্প পেয়েছিল। বাঁচেনি। আর বাবার ক্ষেত্রে কুড়ি মিনিট কি আধঘন্টা কত দেরি হয়েছিল ভগবানই জানেন।
অবনীশ এবার গভীর মমতায় তার কাঁধে হাত রাখল, বাচ্চু তুই একটা শক্ত, বুদ্ধিমতী মেয়ে। তুই এরকম করবি! তোর সেলফ কনট্রোল কোথার গেল? একটু সামলে নে প্লিজ। তোকে নিয়ে যাব বলেই তো আমি অপেক্ষা করছি। কাকিমা বারবার করে বলে গেছেন তোকে যেন একলা না ছাড়ি।
নন্দনা কোনো কথাই বলতে পারছে না। গদিটা আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করছে প্রাণপণে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে, বাবা! বাবা!
অবনীশের চোখ ছলছল করছে। সে হঠাৎ নীচু হয়ে ভেঙে পড়া নন্দনাকে জোর করে তুলে ধরল। গাঢ় গলায় বলল, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে বাছু? এই টপটা তুই খুলে ফ্যাল।
নন্দনার টপের জিপার চড়াত করে খুলে গেল।
তুই এই জিনসটাও খোল—তার গলা ধরে এসেছে। চোখ ধকধক করছে অস্থির হাত এখন চলে যাচ্ছে প্যান্টের জিপারে। নিবিড়ভাবে তাকে জড়িয়ে ধরেছে অবনীশ। তুই অসহ্য সুন্দর বাচ্চু, শোকে তোকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। তুই আমায় পাগল করে দিস, ওহ—চকিতের মধ্যে তার বুকের ভাঁজে ঢুকে গেল অবনীশের ঠোঁট।
আর তার পরেই সে দেখল তার ঠোঁট জোড়া যেন পেরেকে গেঁথে গেছে। ক্রমশ শোকসন্ধ্যার অন্ধকার আরও দম বন্ধ করা, ক্রমশ এক বুনো জান্তব গন্ধে ভরে যায় ঘর। প্রবল বমি পেতে থাকে নন্দনার। তার বাহ্যসংজ্ঞা লোপ পাচ্ছে। সামনে দুলছে কুয়াশার পর্দা। ভেদ করে কিছু দেখা যায় না। প্রত্যেকটি লোমকূপ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে চকচকে মসৃণ তীক্ষ্ণদৃঢ় শলাকা। শিউরে শিউরে উঠছে গা। হাড়গোড় মানছে না, গুটিয়ে বর্তুলাকার হয়ে যাচ্ছে শরীর। অসহ্য মোচড়াচ্ছে।
