যেমন হঠাৎ একদিন আবিভূর্ত হয়েছে তেমনই হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যাবে শজারু-আতঙ্ক। নিশ্চয় কেউ বা কারা কোনো উপায়ে এই আতঙ্ক তৈরি করেছে। তাদের উদ্দেশ্য কী? শুধু আতঙ্ক ছড়ানো? এক ধরনের টেররিজম? যেন এ জিনিসের কিছু কম আছে এখন পৃথিবীতে! নন্দনা ঠিক করল সে নয়নপুর গ্রামের কানাই মাঝির বউ রাধা মাঝিকে ইন্টারভিউ করবে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। নয়নপুর হুগলি জেলার একটি মোটের ওপর সমৃদ্ধ গ্রাম। ট্রেন থেকে নেমে বাসে যেতে হয় মাইল দশেক। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে যখন কানাই মাঝির ঘরে পৌঁছোল নন্দনা তখন বেলা পড়ে এসেছে। বউটি দাওয়ায় বসে কুলোয় করে চাল ঝাড়ছিল। নন্দনাকে দেখে অবাক হয়ে তাকাল। অজ গাঁয়ে একজন শার্ট-প্যান্ট পরা বব চুল সোমন্থ যুবতি, কাঁধে ক্যামেরা, হাতে ঝোলা ব্যাগ…
কে আপনি?
আমি খবরের কাগজের লোক। আপনাকে ইন্টারভিউ করতে, মানে আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।
আজ্ঞে খবরের কাগজ তো ইন্টারভু নিয়ে গেছে।
আমি অন্য কাগজের লোক। আপনাকে একটুও বিরক্ত করব না।
সন্ত্রস্ত গলায় বউটি বলল, আমার সোয়ামি আসার আগে যা করার করুন। সে এসব পছন্দ করে না।
আচ্ছা। গগন পাড়ই আপনার স্বামীর কেমন বন্ধু ছিল?
খুব বন্ধু। মাঝি কখনও স্যাঙাতকে মারবে না, তা বলে দিলুম।
না, না, তা বলছি না আপনার সঙ্গে কীরকম সম্পর্ক ছিল!
মেয়েটি এবার ঝেঝে উঠল, মেয়েছেলে হয়ে কথার ছিরি দ্যাখো। সোয়ামির স্যাঙাত তো আমার কে? আমার কী? এলে বাটি করে চা দেব, দুটো মুড়ি দেব বাস, ফুরিয়ে গেল।
সেদিন গগনকে মুড়ি-চা দিয়েছিলেন?
বিস্কুট দিয়েছিলুম সাধের স্যাঙাতকে।
আহা রাগ করছেন কেন? কুয়োতলার দিকে উনি গেলেন কেন?
সে কি আমাকে বলে গিয়েছিল? ব্যাটাছেলে কোথায় যাচ্ছে না-যাচ্ছে, জিগ্যেস করতে গেলুম আর কি! তারপরে তখন আমার কী গা বিড়োচ্ছে, বাপরে!
গা বিড়োচ্ছে?
হ্যাঁ গো দিদি, হঠাৎ কেমন যেন সব ঘুলিয়ে উঠল। ভীষণ বমি পাচ্ছে, চক্ষে আঁধার দেখছি, শরীরটা কেমন করছে…তখন সে কুয়োয় গেছে, কী মাঠে নেমে গেছে খেয়াল করবার অবোস্তা আমার?
তা কী করে ঠিক হল?
কিছুক্ষণ পর আপনাআপনি ঠিক হয়ে গেল। আমি তো ভেবেছি পেটে এবার কিছু একটা এল বোধ হয়।
তা এসেছে?
বউটি বিমর্ষ মুখ বলল, নাহ। সে ভাগ্যি করে কি এসেছি!
কখন চিৎকার শুনতে পেলেন স্যাঙাতের?
শুনতে পাচ্ছিলুম, মোটে নড়তে পারিনি। তারপর শরীরটা একটু ঠিক হতে যাই, লোকজন ডাকি।
গগন লোকটা কেমন ছিল?
বউটি মুখ বিকৃত করে নিজের কাজে মন দিল।
কেমন আবার?
ক্যামেরা টেপ-রেকর্ডার সব গুটিয়ে নন্দনা স্টেশনের দিকে রওনা হল। সে একটু ভাবিত হয়ে পড়েছে। একটি মাত্র ইন্টারভিউ নেওয়া গেল, তা-ও সন্তোষজনক নয়। অন্য কোনো কেসের প্রত্যক্ষদর্শী বলে কেউ নেই। সাক্ষী-সাবুদ হলে সে কী রিপোর্ট করবে, তদন্তই বা কী, আর স্টোরিই বা কী?
ইতিমধ্যে শজারুর নতুন শিকার, আবার শজারু, ভূতুড়ে শজারু নাম দিয়ে নানা কাগজে নানান সংবাদ বেরিয়েই চলেছে, বেরিয়েই চলেছে।
সেদিন সন্ধেবেলা। শীতের সন্ধে যেন কুটকুটে ভোটকম্বলের মতো নেমে পড়েছে শহরতলিতে, হাওয়া নেই, তাই যত কিছু দূষণ আটকে রয়েছে ভূগোলকের ওপর। মা বললেন, রুণা আজ আর পড়তে যাসনি।
রুণা চুল আঁচড়াচ্ছিল। তার মাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে এসে গেছে। অঙ্ক-সায়েন্স বাঘ। সপ্তাহে তিন দিন পড়তে যায়। একদিন বাদ গেলে স্যার আর একটা দিন বার করতে পারবেন না। কিন্তু মা-র বোধহয় শরীরটা আজও ভালো নেই, সে বলল, মা তুমি চুপচাপ শুয়ে থাক, আমি বেশিক্ষণ পড়ব না। জাস্ট একটা চ্যাপ্টার বুঝে নিয়ে চলে আসব।
ঠিক আসিস কিন্তু। বলে মা চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
রুণার মনটা হালকা। স্যার ভালো পড়ান। ফিজিক্স, বায়োলজিতে আগের ভয়টা তার আর নেই। কেমিস্ট্রিতে বড্ড মুখস্ত করতে হয়, এটাই মুশকিল। আগে জিয়োমেট্রিক রাইডারগুলো সে বেশিরভাগই পারত না। শশাঙ্ক স্যারের কাছে কোচিং নেবার ছ মাসের মধ্যে এ ব্যাপারেও তার অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে তার পড়াশোনাটা একটা দুর্ভেদ্যে দুর্গ বলে মনে হত। শশাঙ্ক স্যারের দৌলতে এখন তার বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। সায়েন্স গ্রুপে লেটার মার্কস পাওয়াটাই এখন রুণার লক্ষ্য। বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাসে তার কোনো সমস্যা নেই। ইতিহাসে মেমারির সমস্যা ছিল। সেটাও স্যার কীভাবে কী পদ্ধতি অনুসরণ করে মনে রাখতে হয় শিখিয়ে দিয়েছেন। এগারোশো, বারোশো, তেরশো, চোদ্দশো সব সনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো সে লম্বা সারি করে পর পর লিখে রাখে। বাস। জয়েন্ট দেবার ইচ্ছে রুণার নেই। সে পিয়োর সায়েন্স পড়বে, গবেষক হবে। সেদিনই বাবা কাগজে পড়ে বলছিলেন, বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের চর্চা সাংঘাতিক কমে গেছে আমাদের দেশে। বিজ্ঞানের মহা ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। সে বিজ্ঞানী হবে। নানান বিষয়ে কৌতূহল জাগছে তার। বেণি দুলিয়ে, ঝোলা ব্যাগ কাঁধে স্কার্ট পরা রুণা বেশ আত্মমগ্ন হয়ে চলেছে। এই মূহুর্তে তার মায়ের জ্বরের কথা মনে নেই। এ সেই মধ্য-কৈশোর যখন মা-বাবা স্মৃতির পেছন কোঠায় স্থান নিতে থাকে। সামনের কোঠাগুলো দখল করতে থাকে বন্ধুবান্ধব। প্রতিদিনকার উত্তেজক বর্তমান, ভবিষ্যতের হাতছানি, নানারকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং নিজে নিজে, যাকে বলে স্বয়ং। রুণার চারদিকের পৃথিবী রঙিন, বাস্তবে তা যতই দূষিত, কৃষ্ণবর্ণ ধূলিধূসর হোক না কেন।
