ঋতুর মতো দিনরাত বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা আমার দ্বারা হবে না বাবা— দেবলীনা ঘোষণা করল। বেশি না খেটেও দেবলীনা স্টার পেরেছে।
ফর্ম নিলাম। লিখতে যাচ্ছি, শৌনক একলাফে এগিয়ে এসে আমার হাতদুটো পিছমোড়া করে ফেলল। বিদিশা লিখল, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, ম্যাথমেটিক্স। আমার দিকে তাকাল। ফোর্থ সাবজেক্ট কী নিবি বল, এইটা তোর পছন্দমতো দেব।
আমি বললাম, সাইকো।
সই করতে হাত ব্যথা করছিল, এমন জোরে ধরেছিল শৌনক। সই করার আগে শৌনকের দিকে তাকালুম, বিদিশার দিকে তাকালুম, দায়িত্ব কিন্তু তোদের।
ঠিক হ্যায় ভাই। কাঁধ চওড়া আছে। শৌনক ত্যাগ করল।
মা-বাবা বলল, আমরা কিন্তু জোর করিনি ঋতু, নিজের ইচ্ছেয় সায়েন্স নিলি! ভাবিস না। টিউটর, বইপত্র, লাইব্রেরি যা লাগে সব বলবি হয়ে যাবে।
সেই দৃশ্যটার কথা মনে করে আমার চোখ জ্বালা করছিল। আজ এইচ এস শেষ হল। আর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আমাদের চণ্ডীগড়, কুলু-মানালি বেড়াতে যাবার কথা। কিন্তু আমি কি উপভোগ করতে পারব কিছু? ম্যাথস আমার যাচ্ছেতাই হয়েছে। কেমিস্ট্রিতেও বোধহয় অনেক ভুল করেছি। এইচ এস যে এত টাফ হবে, আমি কেন আমার বন্ধুরাও বুঝতে পারেনি। কেউ খুশি না।
শৌনক বলল, আগে থেকেই তাদের গুডবাই জানিয়ে রাখছি।
কেন, কোথায় যাচ্ছিস? স্টেটস? টোয়েফল-এ বসলি নাকি?
খেপেছিস? শৌনক বলল, ড্রপ-আউট। স্কুল ড্রপ-আউট বলে একটা কথা আছে জানতাম। শৌনক বিশ্বাস কথাটা এবার রিয়্যালইজ করতে চলেছে। বাবাকে বলেছি একটা ফোটোকপি মেশিন নিয়ে বসব। কোর্টের পাশে জায়গা দেখুক।
বৈশালী বলল, ভ্যাট, তুই তো স্পোর্টস কোটাতেই যে-কোনো জায়গায় পেয়ে যাবি। আমারই হবে মুশকিল।
শৌনক শুকনো মুখ করে বলল, পাস কোর্সে বি, এসসি পড়ে কী হবে, বল?
সুমিত বলল, আগে থেকে অত ভেঙে পড়ার কী আছে? আমিও তো ফিজিক্সে
গাড্ডু খাব মনে হচ্ছে। তো কী? জয়েন্ট তো আছে এখনও। এ বারে না হয় পরের বছর।
শৌনক বলল, জয়েন্টে তো স্পোর্টস কোটা নেই।
বৈশালী আঙুল চিবোচ্ছিল। বলল, ঋতু তুই কি জয়েন্টে বসছিস?
বসতে তো হবেই। না হলে বাবার মুখ থেকে আলো নিবে যাবে। মায়ের চোখদুটো…না না সে আমি সহ্য করতে পারব না।
আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে সরে এলুম। শুনতে পেলুম বিদিশা বলছে, ঋতুটার পরীক্ষা আসলে খুব ভালো হয়েছে। বুঝলি?
ঠিক সতেরো দিন বাদে জয়েন্ট। শেষ হলেই মনে হল মায়ের গর্ভ থেকেই যেন পরীক্ষা দিতে দিতে আসছি। কবে যে নিবে-আসা দিনের আলোয় পড়িনি, রাত জেগে লেখা প্র্যাক্টিস করিনি, কবে যে টেনশন ছাড়া, প্যানিক ছাড়া দিন কাটিয়েছি, মনে করতে পারছি না। এত দিনে কি শেষ হল? জয়েন্টে যদি এসে যাই, তো চার বছর এঞ্জিনিয়ারিং, সে মেক্যানিক্যাল থেকে আর্কিটেকচার পর্যন্ত যেটা পাই। তারপর ওঁ শান্তি। সার্টিফিকেটটা মা-বাবাকে ধরিয়ে দিয়ে বলব, কী? খুশি তত? খুশি? আর কিছু না। কিছু পারব না। থিসিস না, বিদেশ না, নিতু মাসি দীপু কাকারা নিজেদের মতো থাক, আমিও আমার মতো থাকব। একটা চাকরি তো পেয়ে যাবই। তারপর দুমদাম করে বড়ো হয়ে যাব। টিউটরদের মুখ আর দেখতে হবে না। নাচটাও ছেড়ে দেব। ধু-র ভাল্লাগে না। কী হবে আর?
আজ রেজাল্ট বেরোবে। জয়েন্টরটা আগেই বেরিয়ে গেছে। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে আর ছিড়ল কোথায়? বিদিশা, শৌনক দুজনেরই কিন্তু হয়ে গেছে। এত দিন ছিল শৌনক-বৈশালী জুটি। এবার বোধহয় শৌনক-বিদিশা! দুজনেই ওরা বেঙ্গল এঞ্জিনিয়ারিং-এ যাচ্ছে।
এল সিক্সটিন আসছে। এই বাসটা পয়া। চড়ে পড়েছি। স্কুল স্টপে নামতেই সৃঞ্জয় একদিক দিয়ে দেবলীনা আরেক দিক দিয়ে যেন ছিটকে বেরিয়ে গেল।
দেবলীনা! এই লীনা! কী রকম হল?
দেবলীনা কাঁচুমাচু মুখ করে একটা বাসে উঠে পড়ল। লীনার কী ভালো হল না? সেকেন্ড ডিভিশন হয়ে গেল নাকি? সৃঞ্জয়ের দিকে তাকাই। কোথায় সৃঞ্জয়।
ভিড় ঠেলেঠুলে ঢুকতে থাকি। বেশিরভাগ ক্যান্ডিটেটই বাবা কি মা কি আর কাউকে সঙ্গে করে এনেছে। আমার মাও আসতে চেয়েছিল। কদিন মায়ের জ্বর হয়েছে। আমি বারণ করলাম। আজকে জাস্ট রেজাল্ট বেরোচ্ছে, আসল বাঘের খেলা মার্কশিটের দিনে। সে দিন মাকে আনব।
আমাদের নোটিস বোর্ডটা বড্ড উঁচুতে। তার ওপর কাঁচে আলো ঝলকাচ্ছে, কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
বলো, বলো তোমার রোলটা বলো, আমি দেখে দিচ্ছি। বাবা-জাতীয় একজন বললেন।
এফ এইচ এ থ্রি টু সেভেন ওয়ান।
এফ এইচ এ থ্রি টু কী বললে?
সেভেন ওয়ান, ওয়ান, এই তো, সেভেন টু। নাঃ সেভেন ওয়ান তো নেই!
সে কী? এফ এইচ এ থ্রি টু সেভেন ওয়ান! দেখুন না!
আমি সরে যাচ্ছি, মাই গার্ল, তুমি নিজেই দেখো।
আমার পায়ের তলাটা হঠাৎ সমুদ্রের বেলাভূমি হয়ে যাচ্ছে। বালি সরছে, বালি সরছে, আমার রোল নাম্বার নেই, নেই। সত্যিই নেই। এ কী? এরকম হয় নাকি? এ রকম ঘটে? আমার…আমি…আমার ক্ষেত্রে ঘটছে এটা? ঋতুপর্ণা মজুমদার… আমার… রোল নম্বর নেই?
আমার দুপাশ থেকে সমুদ্রের তীরে বালির মতো ভিড় সরে যাচ্ছে। আমি ডান হাত বাড়িয়ে পথ করে নিচ্ছি। কিছু দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু সামনে চলেছি ঠিক। চোখে জল? না, না জল নয়। কেমন একটা ধোঁয়াশা, যা এই সাতসকালে থাকার কথা নয়, বুকের মধ্যেটা কেমন স্তব্ধ। আমার হৃৎপিণ্ডটাও সৃঞ্জয় আর দেবলীনার মতো ছিটকে সরে যাচ্ছে।
