চিকমিকে সব জরির ঝালর। টুংটাং ঘন্টার মধ্যে দিয়ে বড়ো বড়ো চোখ কপালে তুলে টুকটুক বলছিল, এত বড়ো, এত সুন্দর বাড়ি, এই বিশাল গাড়ি, এত সম্পদ সব আপনার একার?—কোনো দ্বিতীয় ভাগীদার নেই?
আমি হেসে বলছিলাম, আর এইসব রোশনি, এই খুশবু, এই সমস্ত আপ্যায়ন আয়োজন আপনার। আপনার একার। কোনো ভাগীদার নেই।
স্বপ্নালু চোখে টুকটুক বলছিল, কথা বলাও কি আপনি মাস্টারমশাই রেখে শিখেছিলেন?
আমি বলছিলাম, চলতে ফিরতে হাসতে যদি আপনি মাস্টারমশাই রেখে শিখে না থাকেন, তা হলে কথা বলতে শিখতেও আমার মাস্টারের দরকার হয়নি।
আমার বাড়ি ওদের জন্যে খোলা রইল। চাবি দিয়ে দিলাম একটা-অমির হাতে। আমি সেটা টুকটুকের হাতে চালান করে দিল।
দু-তিন দিন পর টুকটুক এল একা একা। অমি নাকি কাজে ব্যস্ত। আরও কয়েক দিন পর টুকটুক আবার এল একা, অমি ট্যুরে গেছে। আরও কয়েকদিন পর টুকটুক আমার দেওয়া চাবিটা ব্যবহার করল। অর্থাৎ আমি বাড়ি এসে দেখলাম টুকটুক–দালান আলো করে সোফায় এলিয়ে আছে। তারপর একদিন টুকটুক এসে কান্নায় ভেঙে পড়ল। অমি নাকি বিয়ে করতে চাইছে না। প্রায় দু বছর এত মেলামেশার পর…আমি মুখ দেখাতে পারব না বাড়িতে, টুকটুক দু হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। অমির অফিসে গেলাম। খুব উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। ওর ঘরে আরও দুজন কর্মী বসে। গ্রাহ্য করলাম না। যা বলার বললাম। অমি বলল, আমি ওর সঙ্গে বন্ধুর মতো মেলামেশা করেছি, বিয়ে করব কথা দিইনি তো!
বাঃ চমৎকার। তুই যে এত বড়ো স্কাউন্ট্রেল তা আমার জানা ছিল না। কথা দিসনি তো ও ভাবল কী করে? এই সময়ে সহকর্মী দুটি উঠে বাইরে চলে গেল।
অমিত মৃদু হেসে বলল, তাই তো? ভাবল কেন? আমার বাঁধা পড়বার ইচ্ছে নেই, কাজ অনেক কাজ, আচ্ছা গোপাল, দ্যাখ না ও যদি তোকে বিয়ে করতে রাজি হয়!
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ওকে যখন এভাবে পরিত্যাগ করেছ, তখন ও এরপর কাকে বিয়ে করতে রাজি হবে সে কথা ভেবে আর নাই মাথা ঘামালে!
যাক গে, সে সব দিনও গত হয়ে গেছে। গত মাস কয়েক ধরেই আমার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। আমার এই লোহা-লক্কড় আর ভালো লাগছে না, ওটা আছে থাক। ওষুধের ফ্যাক্টরি করব। আমি অনেক প্ল্যান ট্যান ছকে দিল, এসবে ওর মাথা তো পরিষ্কার! আমি বললাম, তোকে কিন্তু আসতে হবে আমার সঙ্গে।
কী ভাবে?
কেন? তুই ওয়ার্কিং পার্টনার, ল্যাবরেটরির ভার তোর ওপর।
অমিত যেন কী ভাবছে। অনেকক্ষণ পরে বলল, দেখা যাক।
তারপর কালকে ওই ঘোষণা। আগে থেকে কোনো খবর না, কিছু না। দুম করে—কাল আমি মেলবোর্ন যাচ্ছি। হ্যাঁ ওখানেই চাকরি নিয়েছি। কবে ফিরব ঠিক নেই। খুব সম্ভব কোনোদিন না।
ভোর হয়ে গেছে। সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারিনি।
বলেছিলাম, আমার ওষুধের কারখানার কী হবে?
তুই একটা ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ডি এস সি বায়োকেমিস্ট গোপাল, তোর ভাবনা হওয়া উচিত নয়। অমিত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
বোধহয় আধ ঘন্টার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টুকটুক জাগিয়ে দিল।–রেডি হবে না? প্লেন তো নটায়।
ঠিক। তা তুমিও যাচ্ছো নাকি?
বাঃ, তুমিই তো বললে উপহার নাকি আমার নিজে গিয়ে দিতে হবে।
এই ফ্যান্সি ড্রেসটা পরেই?
টুকটুক গোঁয়ারের মতো বলল, হ্যাঁ।
কালকের সেই রাজস্থানি পোশাকটা পরেছে ও, এটা পরলে ওকে রানা প্রতাপ সিংহের যুগের রাজপুতানি সুন্দরীদের মতো দেখায়। দারুণ সেজেছে টুকটুক। আপাদমস্তক রঙিন। ম্যাচিং গয়না ঝকমক করছে। পারফিউমের গন্ধে ঘর ভরে যাচ্ছে।
আমি উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। ইচ্ছে ছিল, অমির সঙ্গে দিল্লি পর্যন্ত গিয়ে সি-অফ করবার। কিন্তু এত দেরিতে খবরটা জানায় সেটা সম্ভব হল না। টুকটুকের হাতে মস্ত ব্যাগের মধ্যে প্যাকেট। আমি মনে করিয়ে দিয়েছিলাম একবার। কিন্তু টুকটুকের ভুল হয়নি। খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল ও কোনটা দিচ্ছে অমিকে। সাদাটা না কালোটা। ব্যাগ ফাঁক করে দেখাল টুকটুক। গোঁয়ারের মতো মুখ। সাদাটাই। ওই সাদাটার সুতোয় সুতোয় ও বোধকরি অমি সংক্রান্ত ভাবনাগুলো বুনে রেখেছে।
অমিটা স্টেটস থেকে ঘুরে আসতে পারত। জার্মানি। ফ্রান্স কিংবা ইউ কে হলেও কিছু বলার ছিল না। ওর কোম্পানি না পাঠাক, আমি পাঠাতাম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া! ওকি চিজ-রুটি, আর ভেড়ার মাংস, কিংবা ক্রিকেট-ট্রিকেটের লোভে অস্ট্রেলিয়া চলল নাকি? কথাটা মনে করে হাসি পেল আমার। কিন্তু এয়ারপোর্ট যতই এগিয়ে আসছে, হাসি মুছে যাচ্ছে, আমার মন থেকে। মুখ থেকে। অমি চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে, আমি কেমন করে বাঁচব? আর দুজনে পাশাপাশি কাজ করতে পাব না। আর হবে না সেইসব আচ্ছা, তর্ক, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যেগুলো আমার জীবনে অপরিহার্য ছিল, আমার ধারণা অমিতের জীবনেও ছিল। এখন সে ধারণা আমি পরম অভিমানে পালটে নিতে বাধ্য হচ্ছি। একা একা অমি মেলবোর্ন চলল। এখনও ভীষণ মুখচোরা। প্রয়োজনের কথা কাউকে বলতে পারে না। বিদেশি শহরে ওর একাকিত্ব যেন আমার।
ওই তো অমি। লাউঞ্জে ঢুকেই দেখতে পেলাম অমি একটা দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাচ্ছে। সব ওর সহকর্মী সহকর্মিণী। আমাদের দেখতে পেয়ে হাসল। টুকটুক বলল, পালিয়ে যাচ্ছেন বেশ! বাঃ!
