অমির জন্যেও তো আমায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। কত দিন, কত মাস, কত বছর। তব ওর মনের তল পেয়েছি কি কোনোদিন? বড্ড চাপা স্বভাব। একমাত্র যখন আমার বসন্ত হল, তখন, সেই ভয়ংকর সময়টায় অমি আমার ঘরে শুয়েছিল। এক মশারিতে আমি, আরেক মশারিতে ও। কষ্টে ছটফট করছি, ঘুম আসছে না। অমি উঠে এসেছে, নীল আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে, মশারি সামান্য তুলে অমির সেই মৃদু গলার প্রশ্ন এখনও আমায় কানে বাজে—বড্ড কষ্ট হচ্ছে না রে গোপাল? শোন, একদম চুলকাবি না। আমি আস্তে আস্তে ফু দিয়ে দিচ্ছি। এইভাবে ফু দিয়ে দিয়ে, মৃদু গলায় গল্প করে, গান করে আমার অন্যমনস্ক রাখত, ঘুম পাড়াত অমি। সে বছর ঠিক তিন নম্বরের তফাতে আমি সেকেন্ড হয়ে গেলাম। মাস্টারমশাইরা প্রকাশ্যেই বললেন, প্রশংসনীয় প্রতিযোগিতা। তবে কিছুতেই অমিতকে এর চেয়ে কম মার্কস দেওয়া গেল না। গোপাল তুমি ইচ্ছে করলে খাতাগুলো দেখতে পারো। খাতা দেখেছিলাম। সেই বয়সেই মনে হয়েছিল অসাধারণ। সেদিনটা আমার রাস্তায় রাস্তায় কেটে গেল একা, ভাবছি অমিটা কী সাংঘাতিক মেধা লুকিয়ে রেখেছিল। ওর জন্য অনেক বড়ো কিছু অপেক্ষা করছে। আমাদের স্কুল কলকাতার গর্ব। আমিও অহংকার করছি না, যা-তা ছেলে নই। সেই আমার এতদিনের রেকর্ড ভেঙে যে বেরিয়ে যেতে পারে তাকে তো শাবাশ জানাতেই হয়।
সে রাত্রে আর মাসিমার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারিনি, পরদিন স্কুল যাবার আগে গিয়ে প্রণাম করতে মাসিমা কেঁদে ফেললেন, বললেন, কাল আসিসনি কেন রে গোপাল, দুঃখ হয়েছিল খুব, না রে?
আমি বললাম, সে কী? দুঃখ হতে যাবে কেন? আমার আসলে ভীষণ…
না, না, আমি ঠিক জানি এতো দিনের ফার্স্টবয় তুই, মন দিয়ে লেখাপড়া করিস, ফাঁকি তো দিস না, তোর দুঃখ হয়েছে কি না তুই না বুঝলেও আমি বুঝি রে? মাত্র তো তিনটে নম্বর, পার হতে পারবি না! এতো ভালোবাসতেন আমাকে মাসিমা।
মাসিমার প্রেরণাতেই আর কোনোদিন আমার সেকেন্ড হতে হয়নি। কিন্তু আমি তাতে খুশি হতে পারিনি। অমি ঠিক আমার পেছন-পেছন এসেছে। বরাবর। নয় কি দশ নম্বর পেছনে, যেন পা টিপে টিপে। এই ধরে ফেলল, এই ধরে ফেলল। কিন্তু ধরতে পারছে না। তাতে ওর কোনো বিকারও নেই। যতই বলি না কেন —অমি, বাক আপ ম্যান, কেন পারছিস না? এরকম কমপিটিশন আমার ভালো লাগে না। আমার মাস্টারমশাইদের কাছে পড়।
অমি নরম করে হাসে—না পারলে কী করব বল গোপাল! আর কী-ই বা এসে যায় এতে। সত্যিই ওর মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের কথা।
অনেকক্ষণ বসে আছি। উঠলাম। জল খেলাম। পায়ে ঝিঝি ধরে গেছে টুকটুক, টুকটুক! শিবুদা এসে ধরল। এইসা ঝিঝি ধরেছে যে নড়তে পারছি না। শিবুদা বলল, বাঁ পা দিয়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুল এমনি করে চেপে ধরো।
দু পা-ই ধরে গেছে যে!
শিবুদা তখন নীচু হয়ে আস্তে আস্তে পা মালিশ করে দিতে লাগল। একটু পরে ঝিনঝিনে হাসি শুনে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি টুকটুক। হেসে গড়িয়ে পড়ছে একেবারে।
বললাম, কী হল? শিবুদা তোমার পায়ে ধরে অত সাধছে কেন?
পায়ে ধরতে যাবে কেন? আচ্ছা তো! ওই জন্যেই তো তোমাকে ডাকছিলাম, তা তোমার পাত্তা পেলে তো!
কেন ডাকছিলে! পায়ে ধরে সাধতে? এরপর কি সকালবেলা বুড়ো আঙুল ধধায়া জল খেতেও ডাকবে?—টুকটুকের হাসি বেড়েই যাচ্ছে।
বিরক্ত হয়ে বললাম, ঝিঝি ধরেছে প্রচণ্ডকী যে বাজে কথা বল।
উঃ। কত ন্যাকামিই যে জানো! টুকটুকের প্রস্থান। ওকে সাবধান করে দিতে হবে এই কথাটা ও যেন আর ব্যবহার না করে। আমার অ্যালার্জি হয়ে যাচ্ছে কথাটায়। টুকটুক যেন মনে না করে ওকে যে আমি বিয়ে করেছি এটা একটা ফেরানো-যায়-না গোছের ব্যাপার। আজকালকার দিনে হতে পারে না। এটা ওর জানা উচিত। অমিকেও কয়েকদিন আগেই বলছিলাম, টুকটুকের বাইরের রূপ গুণ দেখে আকৃষ্ট হওয়াটা বোকামি কি বল! ভেতরের মানুষটা ঠিক। …
অমি চুপ করে রইল। আমি হেসে বললাম, তুই আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। অলটার ইগো বলতে গেলে। তুই এ বিষয়ে মতামত দিলে আমি কিছু মনে করব না।
অমিত বলল—না…মানে……ঠিক…..।
না…মানে…ঠিক…? তুই ইয়ার্কি পেয়েছিস! তুই নিজে ওর মধ্যে কী দেখেছিলি?
অমিত বলল, দূর, তুই ও যেমন! ছাড় তো!
ব্যাস। বিষয় পরিবর্তন। আর একটি কথাও ওকে দিয়ে বলাতে পারিনি।
অমি আমাদের বাড়ির একতলা ছাড়ল মাসিমার মৃত্যুর পর। সে এক মর্মান্তিক ব্যাপার। মনে করলে এখনও আমার গা শিউরে ওঠে। মানুষকে ক্ষমা করতে পারি না। মাসিমা কোনোদিন নিজেদের ঘরের সীমানার বাইরে পা বাড়াতেন না, কিন্তু আমার বাবা নানা প্রয়োজনে মাঝে-মধ্যেই যেতেন। এই নিয়ে আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী মহলে একটা চাপা গুজগুজ আরম্ভ হল। আমাদের তখন ফাইনাল ইয়ার। রটনা শুনে রাগে আগুন হয়ে গেলাম। আমারই মাথায় আগুন জ্বলছে,তা হলে ওদের না জানি কী হচ্ছে! ঘরে গিয়ে দেখি মাসিমা যেমন অবিশ্রান্ত সেলাই করে যান তেমনি করছেন, অমিত ছাত্র পড়াবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে। অমিকে ঝাঁকিয়ে বললাম, তোর কী দেহে মাছের রক্ত, এইসব রটনা শুনেও তুই নির্বিবাদে ছাত্র পড়াতে যাচ্ছিস?
মাসিমার মুখটা লাল হয়ে গেল। অমির মুখটা একেবারে নীলবর্ণ। আমি টেবিলে চাপড় মেরে বললাম। এইসব জঘন্য শয়তানির উচিত জবাব কী জানিস?–বাবার সঙ্গে মাসিমার বিয়ে দিয়ে দেওয়া।
