এই যে শিল্পজ্ঞান, এ কোথা থেকে আসে শিল্পীর মধ্যে তা কে জানে? তবে শুধু শাস্ত্রকে মেনে চলে’ কিম্বা শাস্ত্র পড়ে’ সেটা আসে না এটা ঠিক। এইখানে শিল্পীর প্রতিভাকে স্বীকার করা ছাড়া উপায় রইলো না—কেননা দেখা গেল শাস্ত্রমতো মান পরিমাণ নিখুঁত করেও—“সৰ্ব্বাঙ্গৈঃ সৰ্ব্বরম্যোহি কশ্চিলক্ষে প্রজায়তে”–লাখে একটা মেলে সৰ্ব্বাঙ্গসুন্দর। অতএব ধরে’ নেওয়া গেল “শাস্ত্রমানেন যো রম্যঃ স রম্যো নান্য এব হি”। এতে করে’ শাস্ত্রের মান বাড়লো বটে, কিন্তু শিল্পক্রিয়া খর্ব হ’ল। তাই এক সময়ে একদল বল্লে—“ত রম্যং লগ্নং যত্ৰ চ যস্য হৃৎ।” অমনি শাস্ত্রের দিক দিয়ে এর উত্তর এল—“শাস্ত্রমানবিহীনং যৎ সরম্যং তৎ বিপশ্চিতাম্।।” পণ্ডিতের মান বজায় করে শাস্ত্রকার ক্ষান্ত হলেন। কিন্তু এতে করে’ আমাদের দেশের শিল্পীরা শিল্পক্রিয়াতে প্রায় বারো অানা যে অপণ্ডিত থেকে যাবে, সেকথা শাস্ত্রকার না ভাবলেও তখনকার শিল্পীরা যে ভাবেনি তা নয়। প্রতিমা-শিল্প সেই এক ছাঁচ ধরে’ চল্লো। কিন্তু অন্যান্য শিল্প সমস্ত নতুন নতুন উদ্ভাবনার পথ ধরে’ নানা কালের ক্রিয়া প্রক্রিয়ার বৈচিত্র্য ধরে’ অফুরন্ত সৌন্দৰ্য-ধারা বইয়ে চল্লো দেশে।
চিত্রকলার ইতিহাস এদেশে যেমন বিচিত্র তেমন মূর্তি গড়ার ইতিহাস নয়। বাস্তুবিদ্যা তাও নানা নতুন ক্রিয়া প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে’ অব্যাহত ধারায় বইলো নতুন থেকে নতুনতর সমস্তকে ধরে’। কিন্তু ঠাকুরঘরের মধ্যে সেই পুরোনো দেবতা বারবার পুনরাবৃত্ত হ’তে হ’তে দেবতার একটা মুখোসমাত্রে পর্যবসিত হ’তে চল্লো। শাস্ত্রমতো ক্রিয়া করে’ দেবমূর্তি গড়া প্রায় উঠেই গেছে এখন। ধ্যানগুলো বাহনগুলো কার কি এই নিয়েই কায চলেছে ভাস্করপাড়ায় কতদিন থেকে যে তার ঠিকানা নেই। দেবশিল্প বলে’ যদি কোন সামগ্রী হয়ে থাকে এককালে দেশে তো সে বহুযুগ আগে। তারপর থেকে সে শিল্পের অধঃপতনই হয়েছে বেশী বাঁধাবাঁধির ফলে। ঘরে যে শিল্প এই বাঁধনে পড়ে’ মরতে বসলো, বাইরে গিয়ে সেই শিল্প বাঁধন শিথিল পেয়ে দিব্বি বেঁচে গেল দেখতে পাই। নতুন নতুন প্রক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষার স্বাধীনতা শিল্পীর থাকলো তবেই শিল্পক্রিয়া চল্লো, না হ’লে শিল্পের দুর্দশার সূত্রপাত হ’ল—শাস্ত্রের দ্বারায় সে বিপদ ঠেকানো গেল না।
শিল্পশাস্ত্রে আমাদের দেশে এখানে ওখানে যা ছড়ানো রয়েছে তা থেকে সব শিল্পের তালিকা এবং বাস্তু মন্দির মঠ নির্মাণ, নগর-স্থাপন, বিচার-পদ্ধতি, নাগরিকের চাল-চোলের সম্বন্ধে নানা কথা এবং এই রকম নানা ব্যাপারের মধ্যে পূজার অঙ্গ হিসেবে প্রতিমা-নিৰ্মাণ, তার বাহন ব্যবস্থা ইত্যাদিরই খুঁটিনাটি মাপজোখের কথা পাই। চিত্র বিষয়ে দু’একখানা পুঁথিও পাওয়া যায়। কিন্তু এই সব পুঁথিতে কোন কোন শিল্পকে অঙ্গবিদ্যা হিসেবে দেখে আংশিকভাবে সেই সম্বন্ধে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। Artএর পাঠ্য পুস্তক হিসেবে এগুলো বেশী কাজের হবে না, এই আমার বিশ্বাস। চিত্র যদি শিখতে চাই তবে চিত্রশালাতে যেতেই হবে আমাদের। প্রাচীন চিত্রে কেমন করে’ রেখাপাত, কেমন করে’ বর্ণপ্রলেপ, কেমন করে’ নানা অলঙ্কার বর্ধনা ইত্যাদি দেওয়া হ’ত—তার প্রক্রিয়া ছবি দেখেই আমাদের শিখে নিতে হবে। কোনো শিল্পশাস্ত্রে এ সমস্ত প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে ধরা নেই। কেমন কাগজে ছবি খেলা হ’ত, কি কি বর্ণ সংযোগ হ’ত, কোথায় কোথায় কেমন ধারা পালিস দেওয়া হ’ত ছবিতে, কত রকম তুলির টান, কত রকম রংএর খেলা, কত বিচিত্র ভাবভঙ্গি রেখার ও লেখার—এ সমস্ত এক একখানি ছবি দেখে’ শেখা ছাড়া উপায় নেই। শাস্ত্রে কুলোয় না এত বিচিত্র প্রক্রিয়ার রহস্য সমস্ত হয়েছে ছবির মধ্যে ধরা মোগল বাদসাদের আমল পর্যন্ত, তারপর এসেছে ইয়োরোপ জাপান চীন থেকে নতুন নতুন প্রক্রিয়ায় রচনা করা ছবি। এর চেয়ে প্রকাণ্ড পরিষ্কার সুন্দর শিল্প ব্যাখ্যানের পুঁথি যার পাতায় পাতায় ছবি পাতায় পাতায় উপদেশ এমন আর কি হতে পারে! এই পুথির একখানি পাতা সংগ্রহ করে’ নিয়ে চলেছে বিদেশের তারা কত অর্থব্যয়ে নিজেদের শিল্পজ্ঞান জাগিয়ে তুলতে। আর আমরা টাকার অভাবে একটা ছোটখাটো চিত্রশালাও রাখতে পারছিনে দেশে। পাথরগুলো মন্দিরগুলো ভেঙে নেবার উপায় নেই— না হ’লে ভাস্কর্যশিল্পের নিদর্শন দেখে আর আমাদের কিছু শেখার উপায় বিদেশীরা রাখতো না।
ভাবতে পারো original ছবির মূর্তি নাই হ’ল, reproduction দেখেই আমরা শিল্প কাযে পাকা হ’য়ে উঠবো, পুঁথি পড়ে’ পাকা হয়ে যাবো,—এ মতের বিরুদ্ধে আমার কিছু বলবার নেই। কেননা আফ্রিকার অধিবাসী যারা, কোথায় তাদের art gallery কোথায় বা তাদের শিল্পশাস্ত্র। ছবির দিক দিয়ে মূর্তির দিক দিয়ে দেশটা উজাড় হ’লে ক্ষতি এমন কিছু নয়। শুধু মরুভূমিকে চষে আমাদেরই আবার সবুজ করে’ তুলতে হবে, পূর্বপুরুষদের সঞ্চয় ও ঐশ্বর্য অন্যে ভোগ করে’ বড় হ’তে থাকবে? দেশের স্থাপত্য রক্ষার আইন তাড়াতাড়ি না হ’লেও ও-জিনিষ সহজে দেশ থেকে নড়তো না, সময় লাগতো। কিন্তু এই সব ছোটখাটো শিল্প সামগ্ৰী,—চমৎকার কাঁথা, চমৎকার সাড়ী, মন-ভোলানো খেলনা, চোখ-ঠিকরানো গহনাগাটি ঘটিবাটি অস্ত্রশস্ত্র এবং রামধনুকের প্রতিদ্বন্দ্বী চিত্রশালা উড়ে’ চলেছে বিদেশে। যদি এখন থেকে দেশে এদের রাখার চেষ্টা আইনের দ্বারা হ’ক পয়সার দ্বারা হ’ক না করা হয় তবে শীঘ্রই শিল্পক্রিয়া আমাদের মধ্যে বন্ধ হ’য়ে যাবে। থাকবে শুধু বিদেশ যেটুকু ভিক্ষা দেবে,—বিনা রোজগারে বিনা খাটুনির পাওনাটা।
