আমাদের দেশের শিল্পমূর্তিকে যে কারণেই হোক এই স্বাভাবিক গতি থেকে বঞ্চিত করে দেওয়া হ’ল এক সময়ে, দেবমূর্তির বাহুল্যের চাপন পেয়ে কিছুদিন গাছ আমাদের মনোমত পথ ধরে’ প্রায় কল্পতরু হবার জোগাড় করলে কিন্তু কালের নিয়মে হঠাৎ পশ্চিমের হাওয়া বইলো চাপন পাথর একটুখানি নড়ে’ গেল, অমনি গাছ আবার স্বাভাবিক রাস্তা ধরে’ মন্দিরের ছাদ তুলসীমঞ্চের গাঁথনি ফাটিয়ে নানাদিকে আলো বাতাস চেয়ে গতিবিধি সুরু করলে, পশ্চিমে ঝুঁকলো কতক ডাল, পূবে বাড়লো কতক ডাল, এইভাবে আলো বাতাসের গতি ধরে’ বেড়ে চল্লো গাছ। শুধু ভারতবর্ষ নয়, সব দেশ এই ভাবে শিল্পের দিকে বেড়ে চলেছে। মঞ্চে বাঁধা গাছ দেখতে মন্দ নয় কিন্তু দিকে বিদিকে নানা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে’ আছে যে বনস্পতি তার মতো সে শক্তিমানও নয় ছায়াশীলও নয় সুন্দরও নয়। আমাদের প্রাচীন শিল্প ও শাস্ত্র সমস্তই বোধিবৃক্ষের কলমের চারার সঙ্গে সোনার গামলায় নীত হয়েছিল দেশ থেকে বিদেশে, কিন্তু সেই সব যবন-দেশের হাওয়া আলো নিয়ে তাদের বেড়ে উঠতে অনেকখানি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল, ভিক্ষু শিল্পীদের দ্বারা তাদের সহজগতি ব্যাহত হয়নি; তবেই তো এককালের ভারতীয় উপনিবেশের অভারতীয় অন্তরের মধ্যে চলে গিয়েছিল ভারতীয় ভাব ও রস। ভারত শিল্প যদি কেবলি টবের গাছ হ’ত তো কোন কালে সেটা মরে যেত ঠিক নেই, খালি টব থাকতো আর তাতে সিঁদূর দিয়ে পুজো লাগাতো দেখতেম আজও পুত্র-কামনায় নিষ্ক্রিয়দেশের শিল্পহীন অপুত্ৰক হতভাগারা।
সেকালের শাস্ত্রমতে ক্রিয়া করে’ চল্লে এখনো আমরা সেকালের মতোই সবদিকে বিস্তার লাভ করতে পারি, কিন্তু একালকে বাদ দিয়ে ক্রিয়া করা চলবে না কেননা বর্তমানকাল এবং বর্তমানের উপযোগী অনুপযোগী ক্রিয়া বলে’ কতকগুলো পদার্থ রয়েছে যে গুলোকে মেনে চলতেই হবে আমাদের, না হ’লে সেকালটা ভূতের উপদ্রব ছাড়া আর কিছুই দেবে না আমাদের এবং তাবৎ শিল্পজগতের অধিবাসীকে। দাশরথি রায়ের পাঁচালী আমরা অনেকেই পড়ি কতক কতক ভালও লাগে কিন্তু পাঁচালীর ছাঁদে যদি কবিতা ঢালাই করার কড়া আইন করে’ দেওয়া যায় হঠাৎ তবে বর্তমানের কোন কবি তাতে ঘাড় পাতবে না, কিম্বা আমি যদি আজ বলি আমার ছাঁদেই বাংলার চিত্রকর যারা এসেছে ও আসছে তাদের ছবি লিখতে হবে এবং গভর্ণমেণ্টের সাহায্যে এটা হঠাৎ একটা আইনে পরিণত করে নিই তবে কেউ সেটা মানবে না, উল্টে বরং শিল্পীর স্বাধীনতায় বিষম ব্যাঘাত দেওয়া হ’ল বলে’ আমাকে শুদ্ধ তোপে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করবে। আমাদের শিল্পশাস্ত্রকারদের কড়া মাষ্টার এবং পাহারাওলা হিসেবে দেখলে সত্যই আমাদের সেকালের প্রতি অবিচার করা হবে। পূর্বেকার তাঁরা তখনকার কালের যা উপযোগী বা নিয়ম তারই কথা ভেবে গেছেন, একালে আমাদের কি করা না করা, শাস্ত্রের কোন্ আইন মানা না মানা সমস্তই একালের উপরে ছেড়ে দিয়ে গেছেন তাঁরা, শাস্ত্রকে অস্ত্রের মতো এ কালের উপরে নিক্ষেপ করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত করে যার নি!
তখনকার তাঁরা নানা শিল্পের রীতিনীতি ক্রিয়াকলাপ সংগ্রহ করে’ গেছেন নানা শাস্ত্রের আকারে—
“স্বয়ম্ভূৰ্ভগবান্ লোকহিতার্থ সংগ্ৰহেণ বৈ,
তৎসারন্তু বশিষ্টাদৈরস্মাভিবৃদ্ধিহেতবে॥”
(শুক্রনীতিসার)।
শুক্রাচার্য্য কেন যে নানা শিল্প নানা সামাজিক রীতিনীতি সংগ্রহ করে’ শুক্রনীতিসার বলে’ পুঁথিখানা লিখলেন তা নিজেই বলে গেলেন—
“অল্পায়ুর্ভূভৃদাদর্থং সঙ্ক্ষিপ্তং তৰ্কবিস্তৃতম্
ক্রিয়ৈকদেশবোধিনি শাস্ত্রাণ্যন্যানি সন্তি হি।
সৰ্ব্বোপজীবকম্ লোকস্থিতিকৃন্নীতিশাস্ত্রকম্
ধৰ্ম্মার্থকামমূলং হি স্মৃতং মোক্ষপ্রদং যতঃ॥”
মুক্তি দেবার জন্য শাস্ত্র, অল্পের মধ্যে অল্পায়ুধকে অনেকখানি বোঝাবার জন্য শাস্ত্র, রক্ষার জন্য শাস্ত্র,—হননের জন্য নয়!
পৃথিবীর সেকালের ভিত্তির উপরে একালের প্রতিষ্ঠা হল স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা, সেকাল একালের ঘাড় চেপে পড়লো—বাড়ীর ভিত উঠে এল ছাতের উপরে, এ বড় বিষম প্রতিষ্ঠা! সেকালের বস্তুশিল্প হিসেবেও এটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। প্রত্নতত্ত্ব-বিদ্যা তার মাল মসলার জন্য সম্পূর্ণভাবে সেকালের উপর নির্ভর করে’ চলতে বাধ্য,— নতুন প্রথায় কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব চর্চা চল্লো। শিল্পও তেমনি সেকাল, একাল ও ভবিষ্যকালের যোগাযোগে বর্ধিত হয়ে চল্লো, কোনো এককালের ক্রিয়া কলাপের মধ্যে তাকে ধরে’ রাখবার উপায় রইলো না। প্রাচীন ভারতের শিল্প শুধু নয়—তখনকার আচার ব্যবহার সমুদয় কি ছিল কেমন ছিল তা প্রাচীন পুঁথির মধ্যে ধরা রইলো বলেই শাস্ত্র পুরাণ ইত্যাদি পড়া। কিন্তু পড়ে’ জানা হ’ল একরকম শিল্পকে না জানাই। অজন্তা চিত্র কেমন এবং তার বর্ণ দেবার, লাইন টানার মাপজোখের হিসেবের ফর্দ পড়ে’ গেলে ছবিটা দেখার কাজ হয় না। প্রাচীন ভারতের শিল্পের যে দিকটা প্রত্যক্ষ হচ্ছে বর্তমানে—মন্দির মঠ মূৰ্তি ছবি কাপড়-চোপড় তৈজসপত্র ইত্যাদিতে তা থেকেই বেশী শিক্ষা পায় শিল্পী। এ হিসেবে একটা প্রাচীন মূর্তির ফটোগ্রাফও বেশী কাযের হ’ল শিল্পকে বোঝাতে, আসল মূর্তিটা চোখে দেখলে তো কথাই নেই। ব্রজমণ্ডলে কি কি আছে ও ছিল, সেটা ব্ৰজপরিক্রমা পড়ে’ গেলেও ব্রজমণ্ডল দেখা হ’ল না, জানা হ’ল না—যতক্ষণ না তার ফটো দেখছি বা সেখানে তীর্থ দর্শনে যাচ্ছি। না দেখা ব্রজভূমি যেটা সম্পূর্ণ কল্পনার জিনিস তার মূল্য বড় কম নয় art এর দিক দিয়ে। কিন্তু শাস্ত্রমতো ব্ৰজভূমির একটা বর্ণনা বা symbol দু’খানা হরিচরণ যদি হয়, তবে সেটা দেখে কি বুঝবো ব্রজের শোভা? নিছক প্রতীক নিয়ে তন্ত্রসাধন চলে,—শিল্প সাধনা তার চেয়ে বেশী কিছু চায়। সাধকের হিতার্থে শাস্ত্রমতো রূপ কল্পনা হ’ল অরূপের, যখন তখন একখণ্ড শিলা একটা যন্ত্ৰ হ’লেই কায চলে গেল। কিন্তু শিল্প এমন নিছক প্রতীকমাত্র হয়ে বসে থাকতে পারে না। অনেকখানি চোখের দেখার মধ্যে না ধরলে দেবতাকে দেখানই সম্ভব হয় না। অথচ দেবতাকে মনুষ্যত্বের কিছু বাহুল্য না দিলেও চলে না। এই কারণে নানা মূর্তির নানা মুদ্রা হাত মাথা ইত্যাদির প্রাচুর্য দরকার হ’য়ে পড়লো। শিল্পশাস্ত্র নিখুঁত করে’ তার হিসেব দিলেন। কিন্তু এতেও পাথর দেবতা হয়ে না উঠে মনুষ্যেতর কিছু হবার ভয় গেল না,——তখন শিল্পীর শিল্পজ্ঞান যেটা তার নিজস্ব, তার উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় রইলো না।
