আর কিছু ভাবার সময় পেল না ভরোসালাল। কেউ যেন আচমকা টান মেরে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। এক দৌড় বাজারের কাছ থেকে একটা বয়েল গাড়ি নিয়ে এল সে। তারপর পাঁজাকোলা করে মেয়েটাকে ছইয়ের তলায় নিয়ে শুইয়ে দিল। গাড়িওলাকে বলল, ‘জলদি টেউন চল ভেইয়া, বহোত জলদি—’।
গাড়িওলা ‘উর-র-র—’ বলে একটা শব্দ করে দুটো গোরুরই ল্যাজ মুচড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে গোরু দুটো কাঁচা রাস্তা দিয়ে উধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল।
এদিকে আকাশটা দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। মেঘের গায়ে অল্প অল্প ফাটল ধরিয়ে মরা মরা নির্জীব রোদ বেরিয়ে আসতে চাইছিল। রোদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, বেলা ফুরিয়ে এসেছে, একটু পরেই সন্ধে নেমে যাবে।
গাড়িতে উঠবার পর থেকে ভরোসালাল কোন দিকে আর তাকায়নি, মেয়েটাকেই শুধু লক্ষ্য করে যাচ্ছে। মেয়েটা কাত হয়ে বুকের কাছে হাত-পা গুটিয়ে অনবরত গুঙিয়ে যাচ্ছিল আর চোয়াল শক্ত করে শ্বাস আটকে যন্ত্রণা চাপবার চেষ্টা করছিল। ভরোসালাল ঝুঁকে খুব নরম গলায় শুধলো, এ জেনানা, খুব কষ্ট হচ্ছে?
মেয়েটা শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে মাথা নাড়ল শুধু, কিছু বলল না।
ভরোসালাল যে কী করবে, কী করলে মেয়েটার কষ্ট একটু কমতে পারে ভেবে পেল না সে শুধু শ্বাসরুদ্ধের মতো বিড়বিড় করতে লাগল, ‘হো রামজী তেরে কিরপা, হো পবনসূত তেরে কিরপা—।
মেয়েটা এবার বলল, ‘আমার বহোত ডর লাগছে।’
পরম মমতায় তার একটা হাত ধরে ভরোসালাল বলল, ‘ডর কী?’
মেয়েটার যন্ত্রণা যেন পাঁচগুণ বেড়ে গেল হঠাৎ। শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে যেতে লাগল তার, কপাল-গলা কণ্ঠ সব ঘামে ভিজে যাচ্ছে। গায়ের লোমগুলো হঠাৎ শীত লাগার মতো খাড়া হয়ে উঠেছে। চোখের তারা আস্তে আস্তে স্থির হয়ে যাচ্ছে।
ভরোসালাল অস্থির হয়ে উঠল। এই মেয়েটা পনেরো মাইল রাস্তা পেরিয়ে, মাঝখানে বিশাল পাহাড় ডিঙিয়ে মানুষের জন্ম দিতে চলেছে। মানুষ সম্বন্ধে প্রায় অনভিজ্ঞ ভরোসালাল জানে না কিভাবে তার শুশ্রষা করবো ভীতভাবে সে বলল, ‘এ জেনানা, তোমাদের এ সময় কী করতে হয়?’
কোমরের কাছটা ধরে মেয়েটা অত্যন্ত দুর্বল স্বরে বলল, ‘এখানে একটু সেঁক দিয়ে দাও—’।
এই বয়েল গাড়ির ভেতর কোথায় আগুন, কোথায় বা কী? কিন্তু যেভাবেই হোক সেঁকটা দিতেই হবে। উদভ্রান্তের মতো এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে ভরোসালালের চোখে পড়ল গাড়ির ছইয়ের নিচে এক ধারে একটা হেরিকেন ঝুলছে। সঙ্গে সঙ্গে সে ঘাড় ফিরিয়ে গাড়িওয়ালাকে বলল, ‘ভেইয়া, তোমার হেরিকেনে তেল আছে?
গাড়িওলা বলল, ‘আছে, কেন?’
‘ওটা একটু জ্বালব। এই জেনানাকে সেঁক দিতে হবে।’
‘জ্বালতে পারো, তবে তেলের জন্য চার আনা দিতে হবে।’
‘দেব।’
‘তব ঠিক আছে।’
‘তোমার কাছে আগ আছে?’
‘আছে।‘ ‘গাড়িওলা কোমরের খাঁজ থেকে একটা দেশলাই বার করে ছুঁড়ে দিল।
ভরোসালাল হেরিকেন ধরিয়ে নিলা তারপর নিজের একটা কাপড়ের খানিকটা অংশ চার ভাঁজ করে হেরিকেনটার মাথায় বসিয়ে গরম করতে লাগল। সেটা বেশ তেতে উঠলে, আস্তে আস্তে মেয়েটার কোমরে সেঁক দিতে লাগল। অনেকক্ষণ সেঁক দেবার পর গোঙাতে গোঙাতে এক সময় মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ল।
সন্ধের অনেক পর বয়েল গাড়িটা টাউন ভকিলগঞ্জের সরকারী হাসপাতালে পৌঁছে গেল।
কিন্তু এত রাতে ডাক্তার সাহেবকে পাওয়া গেল না। তিন তাঁর কোয়ার্টারে চলে গেছেন।
যারা ছিল তারা বলল, ‘আজ তো হবে না, কাল নিয়ে এসো।’
ভরোসালালের মাথায় তখন পাহাড় ভেঙে পড়ার অবস্থা। মেয়েটাকে নিয়ে এই রাত্তিরে কোথায় রাখবে সে? সবার কাছে সে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল, ‘কিরপা করে জেনানাকে ভর্তি করে নিন।’
হাসপাতালের লোকেরা জানাল, ডাক্তারসাব অর্ডার না দিলে কাউকে ভর্তি করা যাবে না। তখন মরীয়া হয়ে ডাক্তারসাবের কোয়ার্টারের ঠিকানা নিয়ে খুঁজে বার করল ভরোসালাল। তারপর তাঁর হাতে পায়ে ধরে, কিভাবে কত কষ্ট করে গর্ভিণী মেয়েটাকে পাহাড় পার করিয়ে এত দূরে নিয়ে এসেছে তার যাবতীয় বিবরণ দিয়ে বলল, ‘এখন আপনার কিরপা ডাগদরসাব।’
সব শুনে ডাক্তারসাব হাসপাতালে এসে মেয়েটিকে ভর্তি করে নিলেন।
এবারে ভরোসালালের দায়িত্ব শেষ। গাড়িওলাকে ভাড়া বাবদ পাঁচ টাকা আর তেলের দরুন চার আনা দিয়ে, আজ রাতের মতো একটা আস্তানার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল ভরোসালালা
পৃথিবীতে কেউ নেই তার। কাজেই পিছুটানও নেই। সে একেবারে ঝাড়া হাত-পা লোক। যখন যেখানে যায় সেখানে নিজের হাতে খানকতক রুটি সেঁকে নেয়। তারপর কারো বাড়ির দাওয়ায় কিংবা মাঠে-ঘাটে গাছতলায় শুয়ে পড়ে।
আজ আর কিছুই ভাল লাগছিল না ভরোসালালের আটা কিনে এনে ছানো, উনুন বানাও, কাঠকুটো জোগাড় করো—এত সব ঝঞ্চাট একটা দিনের জন্যে সে বাদ দিতে চায় ভরোসালাল করল কি, একটা দোকানে গিয়ে তেঁতুলের আচার আর নুন-লঙ্কা দিয়ে একদলা ছোলার ছাতু খেয়ে এসে এক বাড়ির খোলা বারান্দায় শুয়ে রইলা। কাল সকালে সে সগরিগলি ঘাটে যাবে। সেখান থেকে টাউন পূর্ণিয়া।
পরের দিন সকালে উঠে সগরিগলি ঘাটে যাবার সময় হঠাৎ ভরোসালালের মনে হল, মেয়েটার একটা খবর নিয়ে গেলে হয়। অন্যমনস্কর মতো হাঁটতে হাঁটতে এক সময় সে হাসপাতালেই এসে পড়ল এবং খবর নিয়ে জানল, এখনও মেয়েটার ছেলেপুলে কিছু হয়নি তবে যে-কোন মুহূর্তে হয়ে যেতে পারে। আর জানল মেয়েটা ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছে।
