স্তম্ভিত, হতচকিত হয়ে করুণা তার চলমান পা দুটো সহসা যেন থামিয়ে, কুঞ্চিত করে তাকায় সঞ্জীবের মুখের দিকে, I want to give a parting kiss to my kiddies।
না। ও ঘরের দরজা তোমার কাছে চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তোমার ও অপবিত্র দেহের স্পর্শও আমার সন্তানদের গায়ে তোমায় আজ আর আমি লাগাতে দেবো না
ওঃ এতদূর! কিন্তু ভুলে যাচ্ছো ওরা আমারও সন্তান। I have got legal rights!
Legal rights! তোমার সন্তান সেটাই আজ ওদের জীবনের সবচাইতে বড় অভিশাপ, সবচাইতে বড় ক্লঙ্ক; সন্তানই বটে—যে মা সন্তানের জন্ম মাত্র দিয়ে পশারিণীর বৃত্তি নিয়ে–-
সঞ্জীব! বাঘিনীর মত গর্জন করে ওঠে করুণা, এবং মুহূর্তে করুণার সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে ওঠে, ও পরক্ষণেই হাতের কাছে স্ট্যাণ্ডের ওপরে রক্ষিত ফুলসমেত পিতলের ফুলদানীটা চোখের। নিমেষে তুলে নিয়ে সজোরে নিক্ষেপ করে সঞ্জীবকে লক্ষ্য করে। ঠং করে সঞ্জীবের কপালের উপরে গিয়ে ফুলদানীটা আঘাত করে, ঝরঝর করে রক্ত পড়ে কপালটা কেটে গিয়ে; একটা আর্তনাদ করে সঞ্জীব বসে পড়েন। কয়েকটি মুহূর্ত, তারপর উঠে কোনমতে এগিয়ে গিয়ে ড্রয়ার থেকে লোডেড রিভলভারটা হাতে নিয়ে করুণার দিকে এগিয়ে এল সঞ্জীব। রাগের মাথায় অকস্মাৎ ফুলদানী স্বামীর কপালে ছুঁড়ে মেরেই কতকটা যেন বোকা বনে গিয়ে স্থাণুর মত দাঁড়িয়েছিল, এখন রিভলভার হাতে স্বামীকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয়ে, আতঙ্কে আর্ত চিৎকার করে ওঠে, না, না—খুন করো না, আমায় খুন করো না। আমি, আমি
মরতে এত ভয়! বলেই সঞ্জীব পাগলের মত অট্টহাসি হেসে ওঠে, তারপর বলে, ভেবেছিলাম তোমায় খুনই করবো, কিন্তু না, খুন তোমায় আমি করবো না করুণা। তোমার মত একটা নরকের কীটকে খুন করে হাত আমার কলঙ্কিত করবো না। এখুনি এক বস্ত্রে, রিক্ত দেহে, এ গৃহ এই মুহূর্তে তোমায় ত্যাগ করে যেতে হবে। বলতে বলতে গিয়ে আলনা হতে সাধারণ একটা শাড়ি টেনে করুণার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কঠোর কণ্ঠে সঞ্জীব বললে, আমারই অর্থে ক্রয় করা তোমার ঐ মূল্যবান জড়োয়ার চোখ-ঝলসান গহনাগুলো তোমায় ত্যাগ করতে হবে, এমন কি পরিধানের ঐ শাড়িটি পর্যন্ত। ঐ সাধারণ শাড়িখানা পরে একবস্ত্রে একেবারে রিক্ত হয়ে এই মুহূর্তে এ গৃহ তোমাকে ত্যাগ করতে হবে। যাও—তাড়াতাড়ি করো, যত তাড়াতাড়ি এ গৃহ ছেড়ে তুমি যাও ততই মঙ্গল। তোমার পাপে এ গৃহের বাতাস পর্যন্ত বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। যাও—
বেশ।
একে একে গহনাগুলো গা হতে করুণা খুলে দিল, তারপর স্বামীর দেওয়া শাড়িখানা পরে নিল।
দাঁড়াও—এখনও একটা জিনিস বাকী আছে, তোমার সিঁথির ঐ সিঁদুর, আমার সামনে ওটা মুছে ফেলতে হবে। নিশ্চিহ্ন করে ঘষে মুছে ফেলতে হবে।
করুণা বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
মোছ! মোছ সিঁথির সিঁদুর! বলতে বলতে সঞ্জীব নিজেই এগিয়ে এসে পাগলের মত মুছে দেয় ঘষে করুণার মাথার সিঁদুর।
হ্যাঁ, এবারে যাও। পৃথিবী অনেক বড়, কিন্তু একটা কথা, আমার শেষ কথা, তোমার সিঁথির সিঁদুর মুছে দিলেও সমাজের চোখের দৃষ্টি তো মুছে দিতে পারবো না, তারা আঙুল তুলে টিটকারী দেবে। কিন্তু সেদিন আর আমাকে তারা খুঁজে পাবে না—সে টিটকারী তোমার গায়েই ফিরে আসবে। যাও–
হঠাৎ এমন সময় চমকে উঠলেন সঞ্জীব, ইতিমধ্যে একসময় কৃষ্ণা ঘুম ভেঙে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কৃষ্ণা ডেকে ওঠে, মা!
হঠাৎ যেন সঞ্জীব পাগলের মত ছুটে গিয়ে করুণাকে প্রাণপণে ধাক্কা দিতে দিতে ঘর হতে ঠেলে বের করে দেন, যাও–যাও!
কৃষ্ণা কেঁদে ওঠে চিৎকার করে, মা–মা!
ঠেলতে ঠেলতে করুণাকে ঘর হতে বের করে দিতে গিয়ে চৌকাঠে পা বেধে সঞ্জীব হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন।
করুণা ছুটতে ছুটতে নিচে চলে গিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
তারপর আর কেউ করুণার সংবাদ কোন দিনও পায় নি।
***
সেই রাত্রেই কৃষ্ণা কাবেরীকে নিয়ে সঞ্জীব বাড়িতে তালা দিয়ে বের হয়ে পড়লেন। চাকুরিস্থলে আর ফিরে গেলেন না, দেশ হতে দেশান্তরে কৃষ্ণা কাবেরীকে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন।
এদিকে সেরাত্রে চৌকাঠে পা বেধে পড়ে গিয়ে পায়ের হাড়ে প্রচণ্ড আঘাত লাগে সঞ্জীবের। ক্রমে সেই পা নিয়ে সঞ্জীবকে অনেক ভুগতে হলো এবং শেষটায় পা-টা অকর্মণ্য হয়ে গেল।
ঘুরতে ঘুরতে আবার সুদীর্ঘ দশ বছর পরে সঞ্জীব কলকাতায় ফিরে এলেন এবং ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করলেন অতীতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।
ইতিমধ্যে কৃষ্ণা কাবেরী প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেছিল। প্রাইভেটে তারা আই. এও পাস করল। কিন্তু এদিকে সঞ্জীবের সমস্ত সঞ্চিত অর্থ গেল ফুরিয়ে।
নিজে অথর্ব হয়ে পড়েছেন, অগত্যা মেয়েদের টেলিফোনে চাকরি নিতে দেওয়া ছাড়া আর উপায়ান্তর রইলো না।
মেয়েদের চাকরি করতে দিলেও সঞ্জীব মেয়েদের প্রতি সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। এবং ছোটবেলা হতেই এমন কঠোর শাসনের মধ্যে মেয়েদের গড়ে তুলেছিলেন যে, মেয়েরা বাপকে বাঘের মতই ভয় করতো। বাপের অমতে এক পাও এগুবার সাহস ছিল না।
আসলে সঞ্জীব করুণার ব্যাপারে সমস্ত নারীজাতির উপরেই বিতৃষ্ণ ও সন্দিহান হয়ে উঠেছিলেন। এবং তাদের তিলমাত্র স্বাধীনতা দেবারও ইচ্ছা তার হত না। সর্বদা ভয় ছিল, কখন মেয়েরা তার অধিকারের বাইরে চলে যায়-দশ চক্ষু মেলে তাই যেন তিনি সর্বদা মেয়েদের পাহারা দিতেন। এমন কি যতদিন বেঁচে থাকবেন, মেয়েদের বিবাহ পর্যন্ত দেবেন না, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে রেখেছিলেন।
