কিন্তু আমার যা বলবার ছিল তা তো সেইদিনই থানার অফিসারকে বলেছি কিরীটীবাবু।
জানি বলেছেন। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন!
একটু দ্বিধা, একটু সঙ্কোচ নিয়েই যেন কাজল চেয়ারটার উপরে বসলো। সোজাসুজি কিরীটীর চোখের দিকে যেন সে তাকাতে পারছে না।
বলুন তো মিস্ বোস, আপনার বান্ধবী মিত্রানী আপনাদের বন্ধু-ছেলেদের মধ্যে কাউকে কি ভালবাসতো।
ঠিক জানি না। তার সঙ্গে আমার বড় একটা দেখা হতো না কলেজ ছাড়ার পর। তাছাড়া সে ছিল নামকরা একটি কলেজের প্রাফেসার, আর আমি সাধারণ একজন স্কুলমিসট্রেস–
কিরীটী বুঝলো কাজলের মধ্যে একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স আছে মিত্রানী সম্পর্কে।
কিরীটী একটু যেন সজাগ হয়ে নড়েচড়ে বসলো।
আপনি মনে হচ্ছে মিত্রানীকে তেমন বোধ হয় একটা খুব পছন্দ করতেন না!
না, না—তা নয়—
তবে?
ওর বরাবরই ভাল ছাত্রী ও অধ্যাপিকা বলে মনের মধ্যে একটা ভ্যানিটি ছিল। অন্যান্যেরা টের না পেলেও আমি টের পেতাম।
আচ্ছা আপনাদের দলের পুরুষদের কারো উপরই কি মিত্রানীর কোন দুর্বলতা ছিল না? আবার আগের প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি করলো কিরীটী, আপনার দৃষ্টিতে না পড়লে দলের অন্য কারো মুখেও কি কিছু শোনেন নি?
না। তবে সুহাস যেন একদিন আমাকে কথায় কথায় বলেছিল—
কি বলেছিলেন সুহাসবাবু?
মিত্রানীর সুহাসের প্রতি ব্যবহারটা যেন একটু কেমন কেমন ছিল। আর মনে হয়, আবার সুহাসেরও বোধ হয় মিত্রানীর প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল। আচ্ছা কিরীটীবাবু
বলুন।
সত্যিই কি পুলিশের ধারণা হয়েছে যে, আমাদের মধ্যেই কেউ সেদিন মিত্রানীকে—
সেটাই তো স্বাভাবিক মিস বোস।
কেন—কেন?
মনে করুন, আপনারা ছাড়া সে সময় সেখানে কেউ বাইরের লোক ছিল না—সেও একটা কথা এবং আপনাদের কারো পক্ষে সেদিন ঐখানে মিত্রানীকে হত্যা করার যে রকম সুবিধা ছিল, ততটা আর কারোর পক্ষেই ছিল না।
কিন্তু–
কিরীটী বলতে লাগল, তাছাড়া ধরুন যদি কোনা তৃতীয় ব্যক্তিরই কাজ হবে—-সে নিশ্চয়ই আশেপাশে কোথাও ছিল যেটা আপনাদের অতগুলো মানুষের কারো না কারো চোখে পড়তই, সেরকম কাউকে কি সেদিন আপনাদের আশেপাশে সুযোগের অপেক্ষায় ঘুরঘুর করতে দেখেছিলেন তপনাদের কেউ
না, সে রকম কাউকেই দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।
আচ্ছা মিস্ বোস!
বলুন।
আপনাদের মধ্যে কেউ সেদিন বেতের টুপি মাথায় দিয়ে গিয়েছিলেন?
না তো!
আচ্ছা আপনাদের দলের মধ্যে কে কে সিগ্রেট খায়?
সুহাস, অমিয় আর বিদ্যুৎ–আরো একজন চেইন স্মােকার সজল চক্রবর্তী। সে তো সেদিন আসেইনি
কে কি ব্রান্ড খায় জানেন?
বিদ্যুৎ আর সজলের কথা জানি না-তবে সুহাস আর অমিয় দুজনে চার্মিনার হয়।
হুঁ। কে বেশী খায় সিগ্রেট ওদের দুজনের মধ্যে?
সুহাসই মনে হয় বেশী খায়।
আপনারা কেউ সেদিন একটা বায়নাকুলার নিয়ে গিয়েছিলেন?
বায়নাকুলার! না তো!
কারো কাছেই বায়নাকুলার ছিল না?
না।
আচ্ছা মিত্রানীর হাতে কি সবুজ রঙের কাঁচের চুড়ি ছিল? আপনার হাতেও তো দেখছি কাঁচের চুড়ি রয়েছে—
হ্যাঁ—এটা আমার শখ। মিত্রানীকে কখনো কাঁচের চুড়ি ব্যবহার করতে দেখিনি। আর কাঁচের চুড়ি ব্যবহার সে করতেই বা যাবে কোন্ দুঃখে–এত টাকা মাইনে পেত।
টাকার জন্যই কি কেউ কাঁচের চুড়ি ব্যবহার করে! আপনার মত শখ থাকলে অনেক বড়লোকের মেয়েও হাতে কাঁচের চুড়ি পরেন। আচ্ছা আপনি সেদিন পড়ে-টড়ে গিয়েছিলেন নাকি?
কই না তো!
দেখছি আপনার ডান হাতে তিনটি, অন্য হাতে একটি চুড়ি—
আমার এক ছোট ভাইঝি আছে, সে ভেঙে ফেলেছে।
আচ্ছা মিস বোস, এবারে আপনি যেতে পারেন।
কাজল উঠে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সুব্রত!
কি?
কাজল বোসের বাঁ হাতটায় কব্জির কাছে লক্ষ্য করেছিলি—একটা অ্যাবরেশন মার্ক আছে।
দেখেছি—মনে হয় সব কথা উনি স্পষ্ট করে বললেন না।
কিরীটী মৃদু হেসে বললে, আর কিছু মনে হলো তোর ঐ মহিলা সম্পর্কে?
মনে হলো নিজের অসুন্দর চেহারার জন্য যেন একটা মানসিক দৈন্যে ভুগছেন।
ঠিক। আর কিছু?
আর তো কিছু মনে হলো না।
সুহাসবাবুর প্রতি বোধ হয় ঐ ভদ্রমহিলার কিছুটা দুর্বলতা আছে।
ঐ সময় সুশীল নন্দী এসে ঘরে ঢুকলেন—-মিঃ রায়!
বলুন।
আরো দুজন এসেছেন।
কে কে? কিরীটী শুধাল।
সুহাস মিত্র আর সজল চক্রবর্তী। মানে সেই ভদ্রলোক যার অনুরোধেই সেদিন ওদের বটানিক্স-এ পিকনিকের প্রোগ্রাম হয়েছিল। কিন্তু সজলবাবু তো সেদিন পিকনিকে উপস্থিত ছিলেন না। তার সঙ্গেও কথা বলতে চান নাকি?
ঘটনাচক্রে এসেই পড়েছেন যখন তখন আলাপ করতে দোষ কি! দিন না—তাকেই আগে পাঠিয়ে দিন।
সুশীল নন্দী চলে গেলেন এবং একটু পরে সজল চক্রবর্তী এসে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। চেহারায় ও পোশাকে বেশ স্মার্ট। বেশ লম্বা সুগঠিত চেহারা। গাত্রবর্ণ শ্যামই বলা চলে। ছোট কপাল, নাকটা একটু চাপা—চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত। পরনে দামী স্যুট–
আপনার নাম—
সজল চক্রবর্তী।
বসুন।
সজল বসতে বসতে বললে, আজই এগারোটা নাগাদ মর্নিং ফ্লাইটে কলকাতায় এসেছি —মিত্রানীর বাসায় ফোন করেছিলাম—প্রণবেশবাবুর মুখেই সব শুনলাম। সত্যি কথা বলতে কি মিঃ রায়, আমি তো একেবারে হতবাক। ব্যাপারটা তো বিশ্বাসই করতে পারিনি—সঙ্গে সঙ্গে সুহাসের ওখানে আমি ছুটে যাই-অ্যান্ড হি অলসো রিপিটেড দি সেম স্টোরি! সে-ই বললে থানা অফিসার নাকি আজ তাকে বিকেলের দিকে এখানে আসতে বলেছেন কি সব আলোচনার জন্য—আমিও তাই ওর সঙ্গে চলে এলাম।
