সুশীল নন্দীই সকলকে আহ্বান জানালেন—আসুন আসুন, তা বিদ্যুৎবাবু আর সুহাসবাবুকে দেখছি না! তারা এলেন না?
জবাব দিল সতীন্দ্র সান্যাল, তাদেরও আসার কথা নাকি!
হ্যাঁ—আমি তো সকলকেই লোক মারফৎ চিঠি দিয়ে পাঠিয়েছি আলাদা আলাদা ভাবে আসবার জন্য।
কিন্তু চিঠিতে তো সে কথা লেখা ছিল না, শুধু আমাকেই আসবার কথা লেখা ছিল, সতীন্দ্র বললে।
সুশীল নন্দী বললেন, তা আপনারা সব একত্রে এলেন কি করে?
সুশীল নন্দীর কথায় ওরা সবাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। তখন অমিয়ই বললে, হাওড়া ব্রীজের কাছে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে বিশ্রী জ্যাম হয়েছে—তাই সকলেই আমরা যে যার যানবাহন ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্রীজের উপর দিয়ে একে অন্যের দেখা পাই—পরে ব্রীজ পার হয়ে হাওড়া ময়দান পর্যন্ত হেঁটে এসে সকলে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে আসছি–
ও তাই বলুন—তা আপনারা দাঁড়িয়ে কেন, বসুন—
সকলের দৃষ্টিই তখন মণিময়ের প্রতি নিবন্ধ—মনে হচ্ছে সকলের মনের মধ্যেই যেন একটা সংশয় দেখা দিয়েছে, কিন্তু কেউ কিছু বললো না, ঘরের মধ্যে সকলের জন্যই আসনের ব্যবস্থা ছিল, একে একে সব চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
০৯. সুব্রত এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি
সুব্রত এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি—নীরব দর্শকের মত কিরীটীর পাশে নিঃশব্দে বসে ওদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। এদেরও সকলের বয়েস অন্য দুইজনার মতই, অমিয়র চেহারার মধ্যে কোন বিশেষত্ব নেই—সাধারণ একজন যুবক, একজোড়া গোঁফ আছে—পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে সরু শৌখিন ফ্রেমের চশমা চোখের দৃষ্টিটা যেন কেমন একটু বোজ-বোজা।
সতীন্দ্র সান্যালের কালো আবলুস কাঠের মত গায়ের রঙ। বেশ মোটা-সোটা, মুখটা লাগাল—পুরুষ্টু। জামা কাপড় চেহারা দেখে মনে হয় বেশ সুখী ব্যক্তি। আর হবেই বা কেন, কিরীটীর মনে পড়লো সুশীল নন্দীর খাতায় লেখা আছে ওর সম্পর্কে, ফুড ডিপার্টমেন্টে ওর বড় চাকুরে বাপের দৌলতে ভাল চাকরি একটা করছে। সুশীল নন্দী সতীন্দ্র সম্পর্কে যেন ঠিক-ঠিকই লিখেছেন। কাজল বোস—একেবারে টিপিক্যাল একজন স্কুল মিসট্রেসের মতন চেহারা। কালো, রোগা ঠিক না বলে বলা উচিত যৌবন-রস যেন ওর দেহ থেকে অনেকখানি নিংড়ে নেওয়া হয়েছে। চোখেমুখে ও চেহারায় যেন একটা হতাশা–একটা ক্লান্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত।
আর পাপিয়া চক্রবর্তী। হ্যাঁ—উজ্জ্বল শ্যাম—স্লিম ফিগার—ঠিক যেন আজকের দিনের যে সব তরুণীদের পথেঘাটে চোখে পড়ে নিজেকে আকর্ষণের বস্তু করে তোলার উগ্র প্রচেষ্টা, পাপিয়া যেন তাদেরই সমগোত্রীয়। পাপিয়ার মত মেয়েরা অন্তরের সঙ্গে কখনো কোন পুরুষের কাছে ধরা দিতে পারে না—কতকটা যেন আত্মকেন্দ্রিক।
কথা বললো পাপিয়াই চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে, কিন্তু ব্যাপারটা কি বলুন তো সুশীলবাবু, হঠাৎ এভাবে আবার আমাদের তলব পাঠিয়েছেন কেন?
মণিময় ও ক্ষিতীশকে যা বলেছিলেন সুশীল নন্দী, কিরীটীকে দেখিয়ে ওদেরও তাই বললেন। সকলেই তাঁর কথায় একেবারে কিরীটীর দিকে তাকাল!
পাপিয়াই আবার বললে, আপনাকে যেন চিনি বলে মনে হচ্ছে—নন্দী সাহেব, উনি কি সত্যসন্ধানী কিরীটী রায়?
ঠিকই ধরেছেন মিস চক্রবর্তী।
হুঁ। এখন তাহলে বুঝতে পারছি, আজকে আমাদের ডাকার আসল উদ্দেশ্যটা। আর
উনি বোধ হয় সুব্রতবাবু, ওঁর পাশে বসে!
হ্যাঁ, সুব্রত রায়। সুশীল নন্দী আবার বললেন।
কিরীটী কথা বললে এবারে, দেখুন মিস চক্রবর্তী আপনারা সকলেই মিত্রানীর বন্ধু-সহপাঠীও, তাই মিত্রানী সম্পর্কে দুটো-একটা প্রশ্ন আমি করতে চাই—
সতীন্দ্র বলেন, কি প্রশ্ন?
মিত্রানীর প্রতি দলের কারো কোন দুর্বলতা ছিল কিনা—কিংবা মিত্রানীর আপনাদের কারোর প্রতি–
সবাই চুপ। একেবারে যেন বোবা! অকস্মাৎ যেন সকলেই কেমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে থমকে দাঁড়িয়েছে।
বুঝতে পারছি আমার প্রশ্নে আপনারা সকলেই একটু অস্বস্তিবোধ করছেন। সুশীলবাবু—
বলুন—
আপনার পাশের ঘরটা আমরা একটু ব্যবহার করতে পারি?
নিশ্চয়ই–
তাহলে আমি আর সুব্রত পাশের ঘরে যাচ্ছি, আপনি এক-একজন করে এঁদের ঐ ঘরে পাঠান–
বলা বাহুল্য, সেই মতই ব্যবস্থা হলো।
প্রথমেই এলো অমিয় রায়। সে এক কথাতেই জবাব দিল, কলেজ ছাড়ার পর মিত্রানীর সঙ্গে তার বিশেষ কোন সম্পর্কই ছিল না—কচিৎ কখনো দেখা হতো—তাও দু-একটা সাধারণ কুশল প্রশ্ন ছাড়া ওদের মধ্যে আর কোন কথা বড় একটা হতো না– কাজেই মিত্রানী সম্পর্কে সে বিশেষ কোন খবরই রাখে না।
অমিয়কে কিরীটী বিদায় দিল।
অমিয়র পর এলো সতীন্দ্র। তারও জবাব অমিয়র মতই।
কিরীটী মৃদু হেসে তাকেও বিদায় দিল।
অতঃপর এলো পাপিয়া চক্রবর্তী।
সে কিরীটীর প্রশ্নের জবাবে বললে, মিত্রানী ওয়াজ এ টিপিক্যাল অধ্যাপিকা। স্ট্যঞ্চ মরালিস্ট অ্যান্ড নেভার সোস্যাল। ঐ টাইপের মেয়েরা প্রেম করলেও কখনো তা কি প্রকাশ করে–করে না! কাজেই, তার সম্পর্কে ঐ ধরনের প্রশ্ন উঠতেই পারে না। আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না–মিত্রানী সম্পর্কে আমার ধারণা, প্রেম-ট্রেমের ব্যাপারে তার বোধ হয় একটা নশিয়াই ছিল। বলে পাপিয়া মৃদু হাসলো। কিরীটী মৃদু হেসে তাকেও বিদায় দিল।
সর্বশেষ এলো কাজল বোস।
দুই চোখে ঐ মুহূর্তে তার, কিরীটীর মনে হয়, কেমন যেন একটা ভয় ও সংশয়। দাঁড়িয়ে থাকে সে, বসে না।
বসুন মিস্ বোস–কিরীটী বললে।
