আমাদের এই ভারত উপমহাদেশে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বারবার বিদেশি আক্রমণকারীরা আক্রমণ করেছে, দখল করেছে, শাসন করেছে। কীভাবে পারল? পারল কারণ ভারতীয়রা হাজার খণ্ডে খণ্ডিত। এক খণ্ডিত জাতিকে কুপোকাত করা তো অখণ্ড জাতিদের কাছে বাঁয়ে হাথ কা খেল। তাই খণ্ডিত জাতিদের কাছ থেকে কোনো প্রতিরোধ আসেনি। তাই অবলীলায় নিজেদের পরহস্তগত হয়ে গেছে বারবার। হাজার হাজার ধরে ভারতীয়রা পরাধীন থেকে গেছে। গোটা উপমহাদেশে ব্রাহ্মণরাই রাজ করবে, অথচ রাজত্ব রক্ষা করতে পারেনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শূদ্রদের বিচ্ছিন্ন করে রেখে। শূদ্রদের প্রতি ঘৃণা সনাতন ধর্ম দুর্বল থেকে দুবর্লতর হয়ে গেছে। যে মন্দিরে শূদ্রদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হত না, সেই মন্দির কেন শূদ্ররা রক্ষা করবে? যে মন্দির শূদ্রদের নয়, যে মন্দিরে ব্রাহ্মণদেরই একাধিপত্য, যে মন্দিরে ঢোকার অপরাধে শূদ্রদের হত্যা করা হয়েছে, সেই মন্দির কেন তাঁরা রক্ষা করবে? ওই মন্দিরের দেবতা তো কোনোদিনই শূদ্রদের ছিল না। সেই কারণে সুলতান মামুদের পক্ষে ১৭ বার সোমনাথমন্দির লুঠপাট করতে, ধ্বংস করতে। শুধু তো সোমনাথ মন্দিরই নয়, খাজুরাহো মন্দির ধ্বংস হয়েছে প্রতিরোধে। এই দেশ তো বৌদ্ধদেরও ছিল। তাঁদের উপরেও অত্যাচার করে দেশ থেকেই বিতারণ করে দিয়েছে ব্রাহ্মণবাদীরা। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যচার আর বঞ্চনায় নিম্নবর্গীয়রা সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম বা অন্যান্য ধর্ম গ্রহণ করেছে। সনাতন ধর্মের জাতিরা ক্রমশই শক্তিহীন হয়ে পড়ল। আজও হারানো শক্তি অর্জন করতে পারছে না বিভাজনের কারণে। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলিতেছে। সমগ্র হিন্দু জাতিকে জাগানো যাচ্ছে না। শতধায় বিভক্ত একটা জাতি সদাসর্বদা আত্মহননে ব্যস্ত। আজও দলিত তথা শূদ্র জাতিদের ঘৃণার চোখে দেখা হয়, অমানবিক অত্যাচার করা হয়।
তাই কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে— “যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তাঁরে;/যে জাতি জীবনহারা অচল অসার, পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাঁচার”
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ। সেদিন ছিল বড়োদিন। বাবাসাহেব ডাক দিলেন মহারদের সহ অন্যান্য দলিতদের –“এসো, আমরা ওই নিষিদ্ধ জলে স্নান করি, ওই নিষিদ্ধ জল পান করি।” ‘নিষিদ্ধ জল’ কেন! যুগ যুগ ধরে চাদর সরোবরের জল স্পর্শও করতে পারত না দলিতরা। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের এটাই নিষেধাজ্ঞা। সেই সরোবরের জল বৰ্ণহিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-কুকুর-গোরু-মোষ-গাধা কারোরই জন্য নিষেধ ছিল না, বাদ ছিল দলিতরাই। যাই হোক, বাবাসাহেবের ডাকে সেই সরোবরে জমায়েত হলেন হাজার হাজার দলিত মানুষ। বিশাল এক সমাবেশ হল। উচ্চবর্ণদের সাহসে কুলালো না একজন দলিতের মাথা ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করার। পুলিশ পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অকুস্থলে। হাজার হাজার দলিত মানুষ সেই সরোবরের জলে নেমে পড়লেন। শিশুদের মতো জলে নেমে স্নান করতে থাকলেন এবং নাচতে থাকলেন। সরোবরের পাড়েই আয়োজিত হল বিরাট জনসভা। পুড়িয়ে দেওয়া হল সেই গ্রন্থ, যে গ্রন্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ শূদ্রদের ঘৃণ্য করেছে। হ্যাঁ, মনুসংহিতা। সেইদিন থেকে এমন গ্রন্থ সমাজ থেকে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। উচ্চবর্ণের উচ্চাসন টলে যাবে যে!
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন– “সকল জাতিকেই আমাদের জলচল করিয়া লইতে হবে।” কীভাবে জলচল করে নেওয়া যাবে যতদিন মনুসংহিতার প্রভাব থাকবে? ভারতের সেকুলার শাসনকর্তারা ভারতের অস্পৃশ্য-অচ্ছুৎদের জলচল করে তোলার শিক্ষা দিতে ভয় পায়, নিতেও। কারণ হিন্দুত্বকে ধ্বংস না করে নিম্নবর্গদের জলচল করা সম্ভব নয়। তাই বোধহয় দলিতদের শ্লোগান এমনই হয়ে যায় –“তিলক, তরাজু অওর তলোয়ার ইনকো মারো জুতে চার”। ব্রাহ্মণের তিলক, ক্ষত্রিয়ের তলোয়ার এবং বেনিয়ার তরাজু (দাঁড়িপাল্লা)। উত্তরপ্রদেশের ‘চামার কি বেটি’ মায়াবতী মুখে দলিতদের কথা বললেও ব্রাহ্মণরা স্বাগত ছিলেন। তাঁর কাছে বেনিয়া-ক্ষত্রিয়রা অচ্ছুৎ হলেও, ব্রাহ্মণরা নন। ক্ষমতার রাজনীতি বড়ো বালাই, সত্যি! অথচ মনুবাদের যথার্থ এবং প্রবলতম প্রবর্তক এই ব্রাহ্মণরাই। কারণ কী? বর্ণযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা? হ্যাঁ, ভারতের প্রথম বর্ণযযাদ্ধাই পরশুরাম, যিনি ব্রাহ্মণ। একবার নয়, একুশবার ধরিত্রীকে নিঃক্ষত্রিয় করার যুদ্ধ করেছেন। ব্রাহ্মণ বনাম ক্ষত্রিয়ের যে দ্বন্দ্ব একদা আর্য ও দ্রাবিড়ভূমিকে দীর্ণ করেছিল, ব্রাহ্মণদের তরফে পরশুরামই ক্ষত্রিয় হৈহয় অধিপতি কার্তবীর্যাজুনকে সপরিবার নিধন করে তার শীর্ষবিন্দু রচনা করেন। এমন বর্ণযোদ্ধাকে ‘দেবী’ মায়াবতী আর কোথায় পাবেন? সেই কারণেই কাঁসিরামের মানসপ্রতিমা মায়াবতীকে উত্তরপ্রদেশের জেলার জেলায় ব্রাহ্মণ সম্মেলন করে বেড়াতে দেখা যায়। সেই ব্রাহ্মণ সম্মেলনের মঞ্চে দেখা যায় একদিকে একটি বাবাসাহেব আম্বেদকর, অন্য একটি পরশুরামের মাল্যবান কাট-আউট।
একটা বড়ো প্রশ্ন –তা হল উচ্চবর্ণের সর্বোচ্চ আসনে উপবিষ্ট ব্রাহ্মণরা কেন ঘৃণ্য ‘চামার কি বেটি’ মায়াবতীর বহুজন সমাজের হাতি চিহ্ন-সংবলিত পতাকার নীচে আশ্রয় নিল? আসলে উত্তরপ্রদেশে সৃষ্ট হওয়া গড্ডলিকা প্রবাহ। এখানে দলিতদের সংগঠন আছে, জনজাতিদের সংগঠন আছে, অনগ্রসরদেরও সংগঠন আছে –ব্রাহ্মণদের কোনো সংগঠন নেই। তার মানে কী ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্যাবর্তের দলিতায়ন থেকে দলিতের ক্ষমতায়নের রূপান্তর!
