১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে জনগণনা হয়। এই সময় থেকে বাঙালি জাতির উদ্ভব বিকাশ ইত্যাদি নিয়ে কথা শুরু হয়। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দেই জনগণনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় স্থানীয় মুসলমানরা বেশিরভাগই তথাকথিত নিচুজাতের হিন্দুসমাজ থেকে উদ্ভূত। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে সারা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলাম ধর্মের প্রচার শুরু হয়। তখনকার সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিরাট অংশের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে চলে আসে।
নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে গেলেন কেন? শুধুই কি জাতপাতের ঘৃণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, নাকি অন্য কোনো কারণ? ইসলাম ধর্মের তত্ত্বে কি জাতিভেদের কোনো স্থান নেই? জাতপাত ইসলাম ধর্মেও আছে। সমগ্র ইসলামি সমাজকে প্রধানত দু-ভাগে ভাগ করা যায় –(১) শিয়া এবং (২) সুন্নি। শিয়াকে আবার দুই ভাগে ভাগ হয়েছে– (১) ইসনে আসারিয়া এবং (২) ইসমাইলিয়া। অপরদিকে সুন্নিদেরও দুই ভাগে ভাগ করা হয়– (১) শরিয়তি এবং (২) মারফতি। শরিয়তিও দুই ভাগে বিভক্ত– (১) হানাফি এবং (২) মোহম্মদী/আহলে হাদিস। হানিফরা চারভাগে বিভক্ত –(১) হানাফি, (২) সাফি, (৩) হাম্বলি ও (৪) মালেকি। এইভাবে ৮০টি ভাগ জানা যায়।
দারিদ্র্য আর বর্ণবৈষম্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আশায় বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টধর্ম কিংবা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে পড়েন লক্ষ লক্ষ দলিত। ধর্মের পরিবর্তন হয়েছিল বটে, তবে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এমনই একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম মাহবুব তালুকদার। পেশায় ধোপ মাহবুব সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার আশায় ধর্মান্তরিত হন। পূর্বনাম দীপক থেকে মাহবুব হয়ে যায়। অল্পদিনের মধ্যেই সে বুঝে যায় ধর্মান্তর কোনো সমাধান নয়। তিনি জানান ‘ধর্মান্তরিত হওয়াটা কোনো সহজ ব্যাপার নয়, তাঁরা বলে এটা ঠিক নয়। আমি জিজ্ঞাসা করি, কেন? তাঁরা জানায় এর কারণ ভারতে মুসলিমদের খুব সুনাম নেই। চলে হত্যার চেষ্টা। আর-এক দলিত মইনুল ইসলামকে তো ধর্মান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে রীতিমতো জীবন বাজি পর্যন্ত রাখতে হয়েছিল। ধর্মান্তরের পূর্বনাম সমীর বাগদি। তিনি জানান, ধর্মান্তরের চেষ্টায় তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। মইনুল ইসলাম বলেন, ‘যখন একজন মানুষ ধর্মান্তরিত হয়, তখন নতুন ধর্মের লোকেরা তাঁকে স্বাগত জানায়। কিন্তু পুরোনো ধর্মের লোকেরা তাঁকে থামানোর চেষ্টা করে। যদি থামাতে না পারে, তবে তাঁরা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করে। সেটাই আমার সঙ্গে হয়েছে। হিন্দুধর্ম থেকে যাঁরা ইসলাম বা খ্রিস্টধর্মে চলে গেলেন তাঁরা আর পুরোনো ধর্মে ফিরে এলেন না কেন? কারণ হিন্দুধর্ম থেকে যাওয়া যায়, কিন্তু ফেরা যায় না। ফেরার কোনো পথ খোলা নেই। কারণ ধর্মান্তর হয়েছ মানেই তুমি ম্লেচ্ছ, অচ্ছুৎ। ফেরতযোগ্য নও।
হিন্দু সমাজে জাতবর্ণ প্রথা এক সচল প্রথা। চতুর্বর্ণের অজস্র উপবিভাগ এবং সংকর জাতগুলির উদ্ভব এক দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়ার ফসল। বৃত্তি ও তৎসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যগুলি ধর্মান্তরিত জনগণের মধ্যে বেঁচে থাকায় কসাইরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছিল। আর প্রাচীন ভারতে যাঁরা যত শ্রম করে তাঁরা তত ঘৃণিত নীচুজাত। বৃত্তি বাহিত হয়ে পুরুষানুক্রমে এই বৈশিষ্ট্য ইসলামি জনগণের মধ্যেও বাহিত হয়েছে। তাই বলে ইসলামে জাতপাত নেই, একথা বলা যায় না। তবে ছোটোজাতের মানুষগুলো কতটা ঘৃণিত হয়ে থাকে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
মুসলিম শাসনের প্রায় ৮০০ বছরে এই ভারত উপমহাদেশে জাতপাত নিয়ে বহু জলঘোলা হয়েছে। জাতপাতের ঘৃণা থেকে মুক্তি পেতে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষগুলো বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ধর্মান্তরিত হয়েছে। গোষ্ঠী বদল করেছে। জাতপাতের ইস্যু নিয়ে মুসলিম শাসন চলাকালীনই উত্থান হয়েছে ব্রাহ্মসমাজ, বৈষ্ণব আন্দোলন, খ্রিস্টান বা মিশনারিদের। ব্রাহ্মসমাজ বা ব্রাহ্মসভা উনিশ শতকে স্থাপিত এক সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন, যা বাংলার পুনর্জাগরণের পুরোধা হিসাবে পরিচিত। কলকাতায় ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ২০ আগস্ট হিন্দুধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ও তাঁর বন্ধুবর্গ মিলে এক সার্বজনীন উপাসনার মাধ্যমে ব্রাহ্মসমাজ শুরু করেন। কিন্তু কেন এ ব্রাহ্মসমাজ? বস্তুত ব্রাহ্মসভার মূল বক্তব্য ছিল, ঈশ্বর এক ও অভিন্ন, সকল ধর্মের মূল কথা এক। রাজা রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, অক্ষয়কুমার দত্তের মতো প্রসিদ্ধ মানুষেরা এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। একেশ্বরবাদ, ধর্মের গোঁড়ামি, শাস্ত্রীয় আচারপালন, কুসংস্কার এবং অবশ্যই জাতিভেদ প্রথা পুরোপুরি বিলোপ করার পক্ষে মত প্রকাশ করেন তাঁরা। ব্রাহ্মসমাজের উদ্দেশ্য হিন্দু সমাজে প্রচলিত বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রভৃতি কুপ্রথার অবসান ঘটানো। সেই সঙ্গে নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রচলন করে ভারতীয় নারীদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধন করা। তবে ব্রাহ্ম আন্দোলন। আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি, বরং দিনে দিনে শক্তি হারাতে থাকে। অর্থাৎ ব্রাহ্মসমাজের মানুষরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের তীব্র বিরোধিতা করলেও, ব্রাহ্মণ্যধর্মের দাপটে ব্রাহ্মসমাজ বৃহত্তর মনুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। তাই এই সমাজ সমাজে প্রান্তিক হয়েই রইল।
