একজন প্রখ্যাত ব্রাহ্মণ কী বলছেন জেনে নেওয়া যাক। প্রখ্যাত সেই ব্রাহ্মণটির নাম গদাধর চট্টোপাধ্যায়। সবাই যাকে ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস’ বলে জানে। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলামৃত গ্রন্থের ২২৫ পৃষ্ঠায় শূদ্রের শয্যাত্যাগ বিষয়ে বলছেন– “পায়স গ্রহণোদ্যত, এমতকালে দেখেন লাটু ও গোপাল দাদা (বৰ্ণ বিচারে শূদ্র) শয্যাধারণ করিয়া আছেন। কহেন, ওদের বিছানা ছেড়ে দিতে বল। কেন করিবে! নরেন্দ্রের প্রশ্নে বলেন– ওরে! ভাত ভাত যে রে। আপনি তো বিধিনিষেধ পার, তথাপি এ আদেশ কেন? নরেন্দ্রনাথ নিবেদন করিলে ঠাকুর বলেন –ওরে ব্রাহ্মণ শরীর যে রে! তাই ব্রাহ্মণ-সংস্কার যাবার নয়। অগত্যা লাটু ও গোপাল দাদাকে শয্যা ছাড়িতে বলা হইল।”
এখানেই শেষ নয়, অন্ন-বিচারেও ‘ঠাকুর’ খড়হস্ত ছিলেন। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত থেকে –“যদিও বিশেষ কৃপাপ্রাপ্ত অনেক ভক্ত ছিলেন, তথাপি ঠাকুর সকলের আলয়ে অনুগ্রহণ করেন নাই। বলিতেন– লুচি-তরকারী খেতে পারা যায়, কিন্তু অন্ন নহে। কলিতে অনুগত পাপই মহাপাপ। কিন্তু দেখিয়াছি, পরমভক্ত বলরাম বসুর ভবনে জগন্নাথদেবের অন্নভোগ গ্রহণ করিতেন, বলিতেন– বৈষ্ণব বলে কুলপ্রথায় উহারা জগন্নাথ স্বামীকে অন্নভোগ দেয়, তাই উহা শুদ্ধান্ন। বলরাম মন্দিরে অনুগ্রহণ জানিয়া কোনো ভক্ত তাঁদের শালগ্রাম শিলার অন্নভোগ দিয়া তাঁহাকে সেবা করাইবার প্রস্তাব করিলে ঠাকুর কহেন– তোমার ত কুলপ্রথা নয়, কেবল আমাকে ভাত খাওয়াবার অভিলাষ, আবার তোমার দেখাদেখি অন্য ভক্তরাও এইরূপ করবে। তাহলে আমি সকল শূদ্র ভক্তবাড়িতে খেয়ে বেড়াই!” ঠাকুর রামকৃষ্ণ জাতবিচারে টনটনে ছিলেন। ব্রাহ্মণ বলে কথা! তিনি কোনোদিনই জাতঘৃণার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। যিনি সকলের হতে পারেন না, তিনি কী করে যে ‘যেই রাম সেই কৃষ্ণ হন, তা একমাত্র ভক্তরাই বলতে পারবেন।
বর্ণ ব্যবস্থায় বর্ণ দ্বারা নির্ধারিত হয় ব্যক্তির পেশা। এই বর্ণ ব্যবস্থায় ব্যক্তির মেধা অনুযায়ী পেশা নির্বাচনের কোনো অধিকার সেই ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর থাকে না। পেশা এখানে জন্মগত এবং বংশগতভাবে নির্ধারিত হয়। সমাজ থেকে ব্যক্তির উপর এক ধরনের প্রত্যাশার বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়, সে তাঁর গোত্র বা বর্ণের পেশাই গ্রহণ করবে। এই সেদিন পর্যন্ত ব্যক্তির পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হত না। এই বর্ণপ্রথায় ব্যক্তির মেধা, যোগ্যতা, শ্রমকুশলতা, আগ্রহ, সৃজনশীলতা কোনো গুরুত্ব পেত না। তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যাঁর যা জন্মগত এবং বংশগত পেশা তাঁরা তাই করে যাচ্ছে, যে মানুষেরা মল বা বিষ্ঠা ফেলার কাজ করত সে তাইই করত (মেথর)। যে কাঠের কাজ করে সে তাই-ই করে যাচ্ছে (ছুতোর)। যে ক্ষৌরকর্মের কাজ করে তাঁর সন্তান-পরম্পরা তাই-ই করে যাচ্ছে (নাপিত)। যে মাছ ধরে বংশপরম্পরায় তাঁরা ওই পেশাই (জেলে) করে চলেছেন। যে মৃতদেহ দাহ করেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম তাই-ই করেন (ডোম)— পরিবর্তনের কোনো চিন্তাই করে না। তবে পরিবর্তন যে একেবারেই হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। এখন ব্রাহ্মণের ছেলেমেয়েকে সেলুনে চুল কাটতে যায়, তেমনি শূদ্ররাও তথাকথিত জাতির পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় আসছেন।
বর্ণপ্রথা সমাজের অভ্যন্তরে নিদারুণ রকমের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে এবং করছে। একটা জাতি হাজার বিভাজনে বিভাজিত হয়ে আছে। যে মন্দিরে ব্রাহ্মণরা পুজো করবেন, সেই মন্দিরে শূদ্র তথা দলিতরা পুজো দিতে পারবে না। যে উৎস থেকে একজন ব্রাহ্মণ জল উত্তোলন করেন, সেখান থেকে একজন দলিত জল উত্তোলন করতে পারেন না। বাবা আম্বেদকরের এ অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছে। কেরালাতে একজন ‘নায়ার’ একজন নাম্বুদারি ব্রাহ্মণের কাছে আসতে পারে, কিন্তু তাকে স্পর্শ করতে পারে না। একজন ‘তিয়া’ একজন ব্রাহ্মণ থেকে ৩৬ পদক্ষেপ দূরে থেকে কথা বলবে এবং একজন ‘পুলাইয়া’ একজন ব্রাহ্মণ থেকে ৯৬ পদক্ষেপ দূরে থেকে কথা বলবে। এর চেয়ে কম দূরত্বে আসতে পারবে না। পেশোয়া শাসন আমলে মহারাষ্ট্রে মাহার এবং মঙ সম্প্রদায়ভুক্ত নিম্নবর্গের মানুষদের শুধু সকাল ৯টার পর এবং বিকাল ৩টার আগে পুনা গেটে আসার অনুমতি ছিল, কারণ এর আগে মানুষের ছায়া অনেক দীর্ঘ থাকে এবং কোনো ব্রাহ্মণ যদি সে ছায়া অতিক্রম করে তাহলে তাঁর জাত নষ্ট হয়। অর্থাৎ পবিত্রতা নষ্ট হয়।
এখন প্রশ্ন— এই বর্ণপ্রথার ধারণা এলো কীভাবে? ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় আর্যরা ছিল মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি। তাঁরা ক্রমেই পূর্বদিকে অগ্রসর হতে হতে সিন্ধু নদ পার হয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে। যেহেতু ভারতের তৎকালীন দ্রাবিড়, কোল, ভিল, মুণ্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি জাতি ছিল কৃষিজীবী এবং খাদ্য আহরক, যারা খাদ্য আহরণ অর্থনীতির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। তাঁদের প্রযুক্তি ছিল অতীব প্রাথমিক পর্যায়ের। অপরদিকে পশুপালন এবং শিকারজীবী আর্যরা ছিল যোদ্ধা জাতি। দীর্ঘকায় অশ্বচারী আর্যরা দ্রুতগতিতে ভারতে প্রবেশ করে অপেক্ষাকৃত খর্বকায় নিম্ন প্রযুক্তির ভারতের আদিবাসীদের সহজে পরাভূত করে দাসে পরিণত করে। এই দাসত্বকে স্থায়িত্ব দান করার জন্য এর একটা সামাজিক ব্যাখ্যা দান করা হল। যার বহিঃপ্রকাশ বর্ণপ্রথা। এটা ইউরোপীয়দের বর্ণবাদের মতোই নিবর্তনমূলক প্রথা। কারণ সাধারণত কোনো ব্রাহ্মণ ক্ষুদ্র-কৃষ্ণকায় হয় না, আবার কোনো শূদ্র দীর্ঘ নাসিকা সংবলিত দীর্ঘদেহী শ্বেতকায় হয় না। যেহেতু আর্যরা এমন অঞ্চল থেকে এসেছিল যেখানে জীবন ছিল সংগ্রামমুখর, গতিময় আর আহার্যের স্বল্পতা।
