আনন্দে ব্যাডমিন্টন খেলা যায়।
আর এদিকে?
পকেট থেকে আর-একটা টফি বের করে খোকন তার মোড়কটা ছাড়াতে লাগল। এদিকে বাড়িতে তো দারুণ গণ্ডগোল! ছোটমাসিমার বাড়ি থেকে কোনও খবর না পেয়ে কাকা নিজেই ডাক্তারবাবুর দোকান দিয়ে হ্যালো হ্যালো বলে ফোন করবেন। মাসিমা বলবেন, না তো–খোকন তো আসেনি! মা তো তক্ষুনি কান্না জুড়বেন, বাবা কাকা একবার যাবেন থানায়, একবার হাসপাতালে-তারপর খবরের কাগজে যেমন সবাই দেয়, তেমনি বিজ্ঞাপন দেবেন : নিরুদ্দেশ। ডাকনাম খোকন, ভাল নাম শুভাশিস রায়চৌধুরী। বয়স তেরো বছর, ফরসা, উচ্চতা
আচ্ছা, সে কতটা উঁচু? খোকন মনে করবার চেটা করতে লাগল।
সে যাক। সেকথা কাকাই বুঝবে। তারপর নীচে লিখে দেবে : খোকন রাগ কোরো না। এবার নিশ্চয় তোমাকে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেওয়া হবে। শিগগির ফিরে এসো-তোমার মা শয্যাগত। মেজদি ছোড়দি রাতদিন কাঁদছে। ঠিকানা জানালে
আর খবরের কাগজে সেই বিজ্ঞাপন দেখে পিসিমা বলবে : করেছিস কী—ও খোকন? না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস মধুপুরে?
খোকন তখন টোকনের সঙ্গে ক্যারাম খেলছে। হেসে বলবে : বা-রে, আমি কি ইচ্ছে করে চলে এসেছি নাকি? বাসটাই তো ভুল করে কলকাতায় না গিয়ে এখানে চলে এল। আমি কী করব।
পিসিমা বলবেন, সর্বনাশ! তা হলে তো এক্ষুনি একটা টেলিগ্রাম
খোকনের স্বপ্নটা হোঁচট খেল। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে দাঁড়াল বাসটা।
না–পথ ভুল করেনি। সেই চেনা রাস্তা ধরে–সেই একভাবে ঠিক চলে এসেছে। ধানের খেত-বন-নদী–কোথাও কিছুই নেই। গাড়ি বরানগরে এসে দাঁড়িয়েছে।
কলকাতাতেই যেতে হবে খোকনকে। সেই হাতিবাগানের মোড়ে–সেই ছোট-মাসিমার বাড়িতে। খোকনের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। এতক্ষণ বাসে ভিড় ছিল না–এইবারে অনেক লোক উঠল। গাড়ির ভেতর চেঁচামেচি শুরু হয়েছে। কে যেন বলছে : গঙ্গাজল। গঙ্গাজলের ঘটিটা কোথায় গেল? আর একজন চেঁচাচ্ছে : দেখিস এবার মোহনবাগানই লিগ নেবে। আমি বলছি, তুই লিখে রাখ–
বাস আবার চলছে। মধুপুর নেই, সেই মাঠটা কোথাও নেই–সেই খেলবার জায়গাও নেই। দুধারে বাড়ির সার ঘন হয়ে উঠেছে। এক জায়গায় একরাশ কাদা জমেছে, কতগুলো মোষ গড়াগড়ি করছে সেখানে। একটু পরেই বাস কলকাতায় পৌঁছুবে–তারপর গ্রে স্ট্রিট, তারপর ছোটমাসিমার বাড়ি।
খোকন যদি আর-একটু বড় হত, তা হলে হাতিবাগান নয়–আরও দূরে একা নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারত। যেতে পারত বালিগঞ্জে–পটলমামাদের বাড়িতে। পটলমামা অবাক হয়ে বলবেন :কী রে–একাই চলে এলি এত দূরে?
খোকন মাথা নেড়ে বলত : কেন–পারি না নাকি? এখনও আমি বড় হইনি বুঝি?
পটলমামা বলতেন : তাই তো দেখছি! এখন একেবারে জেন্টলম্যান! আর খোকন বলা চলবে না বলতে হবে শুভাশিসবাবু।
–একটা পয়সা দেবেন বাবু? বাস থেমেছে।
হাত বাড়িয়েছে ভিখারির ছেলে।
গরিবকে একটা নয়া পয়সা দিয়ে যান রাজাবাবু
বাবু রাজাবাবু। নিজেকে ভারি সম্মানিত মনে হয় খোকনের। এতদিন ওকথাটা বাবা শুনেছে, কাকা শুনেছে। আজ ও খোকনকেই সম্বোধন করছে ওই বলে। খোকনকেই–আর কাউকেই নয়।
ট্রাউজারের পকেটে হাত দিয়ে একটা পাঁচ নয়া পয়সা ঠেকল। পাঁচ নয়া পয়সা? তা হোক।
বাস চলে–আবার ঝিম আসে খোকনের। এখনও অনেক বড় হতে হবে, অনেক বড় হওয়া বাকি আছে তার। কয়লার ঘরে সন্ধের পর কাঁদের ছায়া দোলে–অনেক রাতে একলা ছাতের ওপর কারা যেন ফোঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে যায়, বাইরের বাদাম গাছটায় প্যাঁচা ডাকলে খোকন এখনও মায়ের বুকের কাছে সরে আসে। ক্রিকেট খেলার সময় ফ্র্যাঙ্ক ওরেল হলে কী হয়–এখনও খোকনের বড় হতে অনেক দেরি আছে।
আচ্ছা বাসটা কেন পথ ভুল ধরে মধুপুরে চলে যায় না?
–লেডিজ সিট–লেডিজ সিট
চিড়িয়া মোড়। খোকনের ঝিমুনি ভাঙে। কন্ডাক্টর আলতোভাবে ছোঁয়া দিলে খোকনের পিঠে। পাশে পিসিমার মতো বয়সের একটি মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন ভুরু কুঁচকে। কাঁধে লম্বা একটা ঝোলানো ব্যাগ, চোখে ভ্রূকুটি।
পাশের জায়গাটা দেখিয়ে খোকন বললে, বসুন না—
ভদ্রমহিলা মোটা গলায় বললেন, লেডিজ সিট ছেড়ে দেওয়া উচিত।
এক মুহূর্তে কী যে বুঝল খোকন নিজেই জানে না। চট করে উঠে পড়ল–তারপর একেবারে সামনে গিয়ে অনেক কষ্টে আঁকড়ে ধরল রডটা। হঠাৎ তার মনে হল, সে অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক বড়।
একজন ভদ্রলোক বললেন, এসো খোকা–এখানে জায়গা আছে।
খোকা! না। খোকন জবাব দিলে না।
হাতিবাগানের মোড়ে সে নামবে না–যাবে না ছোটমাসিমার বাড়িতে। এই বাসে চড়ে সে আরও অনেক দূরে চলে যাবে। বালিগঞ্জে, ডায়মন্ডহারবারে–মধুপুরে। আর তার ভয় নেউ–আর কাউকে সে ভয় করবে না। খোকন অনুভব করতে লাগল, আজ–এক্ষুনি সে অনেকখানি লম্বা হয়ে গেছে, ওই ঢ্যাঙা কন্ডাক্টারটার মাথা ছাড়িয়েও আরও এক হাত ওপরে।
পুলিশের কারবারই আলাদা
সেই কানে জড়ুলওলা লাল-টাই-পরা ভদ্রলোক বর্ধমান স্টেশনে চা খেতে নেমে যেতেই, ওপরের বাঙ্ক থেকে টুপ করে লাফিয়ে পড়লেন আর-এক ভদ্রলোক–যাঁর চুলগুলো খাড়া খাড়া, নাকের নীচে মাছিমার্কা গোঁফ আর হাওড়া থেকে যিনি সটান চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছিলেন।
মাছিমার্কা গোঁফ চট করে আমার পাশে এসে বসে পড়লেন। তার পরেই ফিসফিস করে বললেন, আপনি অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন?
