তামাক খাওয়ার এই নতুন কায়দাটা শিখে নরসিংহবাবুর আনন্দের আর সীমা রইল না। একদিন দুপুরে ভেলভেটে-মোড়া তাকিয়া ঠেসান দিয়ে অমনিভাবে তামাক খাচ্ছেন, আর-একটা নতুন কোনও একসপেরিমেন্টের প্ল্যান আঁটছেন, সেই সঙ্গে ঝিমোচ্ছন, অল্পসল্প, ঠিক তখন
তখন কোত্থেকে এক ডেয়ো পিঁপড়ে–বিশেষ কিছু করল না, কেবল যে-চাকরটা মুখের কাছে হুঁকো ধরে বসে ছিল, তার পায়ের আঙুলে বসিয়ে দিল এক মোম কামড়।
বাপ রে বলে চাকরটা মারল রামলাফ। হুঁকো থেকেও লাফিয়ে বেরুলো কল্কেটা, আর তার সবটা জ্বলন্ত তামাক, সব কটা গনগনে টিকে সোজা উল্টে পড়ল নরসিংহবাবুর টাকে।
গেছি–গেছি জ্বলে মরলুম–উরে ব্বাপস বলে নরসিংহবাবু খ্যাঁকশেয়ালের মতো দাপাদাপি করতে লাগলেন-চিৎকারে সাত-পাড়া এক হয়ে গেল। আর পিসেমশাইয়ের মামার সেইটেই হল শেষ একসপেরিমেন্ট। কারণ, সেদিনই তিনি হাড়ে হাড়ে বুঝে গেলেন–ঘুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে এই বচনটার মানে কী।
পুরুষ
ছোটকাকা বার বার করে বোঝাচ্ছিলেন খোকনকে।
–চুপ করে বসে থাকবে। উঠবে না, ছটফট করবে না। শ্যামবাজারের মোড়টা পার হলেই কন্ডাক্টরকে বলবে, আমি হাতিবাগানের মোড়ে নামব। বাস একেবারে থেমে গেলে সামনের দিকে মুখ করে তারপর নামবে। চারদিকে দেখে-শুনে রাস্তা পার হবে। তারপর ডানদিক ধরে গ্রে স্ট্রিট দিয়ে এগিয়ে গেলেই ছোটমাসিমার বাড়ি। ফুটপাথ থেকে কখনও নামবে না, আর
অধৈর্য হয়ে মাথা নেড়ে জবাব দিল খোকন :
–জানি–জানি। কতবার তো গেছি তোমাদের সঙ্গে।
–হ্যাঁ, আমাদের সঙ্গে গেছ। কিন্তু আজ যাচ্ছ একা। এই প্রথম একা পাঠাচ্ছি তোমাকে। লক্ষ্মী ছেলে হলে কোনও ভাবনা ছিল না। কিন্তু তুমি যেরকম চুলবুলে–
–না কাকা, তুমি কিচ্ছু ভেব না। আমি সব চিনি।
–ছাই চেনো। যা যা বললাম, সব ঠিকভাবে করবে। আর গিয়েই ছোটমাসিকে বলবে আমাদের ডাক্তারবাবুর বাড়িতে একটা টেলিফোন করে দিতে। তা হলেই আমরা খবর পেয়ে যাব।
–আচ্ছা–আচ্ছা। আবার জোরে জোরে মাথা নেড়ে দিল খোকন, আর ভাবছিল, কতক্ষণে কাকার কাছ থেকে নিস্তার পাবে। বেশিক্ষণ দেরি করতে হল না। বাস এসে পড়ল।
উঠে পড়ো চটপট। ফাঁকাই তো আছে দেখছি। হ্যান্ডেলটা ভাল করে চেপে ধরো। সোজা ভেতরে গিয়ে-বসেছ? আচ্ছা ঠিক আছে। কাকা জানলার কাছে চলে এসেছেন; যা বলেছি সব মনে থাকে যেন। হাতিবাগানের মোড়ে নেমে গ্রে স্ট্রিট। আর পৌঁছেই একটা : টেলিফোন
বাস ছাড়ল। পেছন থেকে শেষবার শোনা গেল : টেলিফোন কিন্তু
আঃ–এইবার নিষ্কৃতি পাওয়া গেল। এইবার খোকন একা। কাকা নেই, বাবা নেই–মা, দিদি কেউ নেই। খোকন এখন নিজেই নিজের অভিভাবক। পকেট থেকে পয়সা বার করবে, গুনে গুনে দেবে কন্ডাক্টরকে, গম্ভীর গলায় বললে : হাতিবাগানের মোড়। টিকিটটা নিয়ে মাথা নেড়ে বলবে : আচ্ছা ঠিক আছে
খোকন ছেলেমানুষ নয়। তেরো বছর তার বয়েস–এবার ক্লাস এইটে উঠেছে। স্কুলের নতুন বেয়ারাটা তাকে আপনি বলে। ক্লাসের টিমে সে ক্রিকেট খেলে। বল ছুঁড়তে-ছুঁড়তে বলে, এইবার একটি ফাস্ট বল দিচ্ছেন ট্রুম্যান, এইবার গুপ্তে চমৎকারভাবে স্পিন করলেন
কিন্তু বাড়িতে?
ছেলেমানুষ–ছেলেমানুষ–ছেলেমানুষ! শুনতে শুনতে বিরক্তি ধরে যায়। কিন্তু একথাও তো ঠিক যে, এখনও খোকন মার কাছে ছাড়া শুতে পারে না। বড় দেওয়াল-ঘড়িটায় চাবি দেওয়া দূরে থাক–হাত দিয়ে ছুঁতেও পারে না এখনও, সিঁড়ির নীচে কয়লার ঘরটায় সন্ধের পর কিসের যেন কালো কালো ছায়া দেখে, একটু বেশি রাতে একা ছাতে যেতে বললে তার পা ব্যথা করতে থাকে।
কিন্তু এসব তো রাতের কথা। তা ছাড়া আর বছরখানেকের মধ্যেই সে দেওয়াল-ঘড়িটার চাবি দেওয়ার মতো লম্বা হতে পারবে। তাই বলে এই সকালে দক্ষিণেশ্বর থেকে হাতিবাগানে তাকে পাঠাতে সকলের এত ভয় কেন? দিনে খোকন কোনও কিছুর পরোয়া করে না। সব চেনে, সব দেখতে পায়, কয়লার ঘরের ভেতরে পর্যন্ত গিয়ে বেড়ালের বাচ্চাগুলোকে নাড়াচাড়া করে আসে। যতক্ষণ রোদের আলো জেগে আছে, ততক্ষণ খোকন আর ছেলেমানুষ নয়।
তবু আরও একটু বড় হওয়ার দরকার। আর-একটুখানি বড় না হলে
ট্রাউজারের পকেট থেকে একটা টফি বের করলে খোকন। চমৎকার লাগছে। মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে বাস। দু-একটা নতুন বাড়ি উঠেছে এদিকে ওদিকে, তাছাড়া ছোট-ছোট ঝোপ, আর অনেক দূর পর্যন্ত ধানের খেত। কাল রাতে খুব খানিকটা বৃষ্টি হয়ে গেছে, শাদা জল চিকচিক করছে খেতের ভেতরে হাওয়ায় সবুজ ধানের ঢেউ খেলছে। রাস্তার ধারের গাছ থেকে দুটো পাখি উড়ে গেল একসঙ্গে বুলবুলি।
এই বাসটা যদি পথ ভুল করে? যদি কলকাতার দিকে না গিয়ে অন্য দিকে, অন্য যে-কোনও দিকে চলতে থাকে খেয়াল-খুশিতে? অনেকক্ষণ ধরে? মাঠের পর মাঠ পাড়ি দিয়ে বনের ভেতর দিয়ে, নদীর ধার দিয়ে চলতেই থাকে? তারপর বেলা গড়িয়ে গেলে হঠাৎ বাসটা থামিয়ে ড্রাইভার বলে, এই যাঃ, ভারি ভুল হয়ে গেছে হাতিবাগান না গিয়ে আমরা যে সোজা মধুপুরে চলে এসেছি!
হুঁ, রাস্তা ভুল করে মধুপুরে যাওয়াই ভাল। অন্য জায়গা খোকন চেনে না। মধুপুরে পিসিমার বাড়ি। কত মাঠ, কত ফুল, কত খেলবার জায়য়া। তারপর সেখানে আছে পিসতুতো ভাই টোকন। বয়সে তারই সমানতার সঙ্গে খুব ভাব। দুজনে মিলে মনের
