ছোট একটা রাইফেল তুলে নিলেন রাজাবাহাদুর, বললেন—এটা লাইট জিনিস। তবে ভালো রিপিটার অনায়াসে বড় বড় জানোয়ার ঘায়েল করতে পারে।
আমার কাছে অবশ্য সবই সমান। লাইট রিপিটার যা, হাউইটজার কামানও তাই তবু সৌজন্য রক্ষার জন্যে বলতে হলো—বাঃ, তবে তো চমৎকার জিনিস!
রাজাবাহাদুর রাইফেলটা বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে তা হলে চেষ্টা করুন। লোড করাই আছে, ছুঁড়ুন ওই জানালা দিয়ে।
আমি সভয়ে তিন পা পিছিয়ে গেলাম। জীবনে বেকুবি অনেক করেছি, কিন্তু তার পরিমাণটা আর বাড়াতে প্রস্তুত নই। যুদ্ধ-ফেরত এক বন্ধুর মুখে তাঁর রাইফেল ছোঁড়ার প্রথম অভিজ্ঞতা শুনেছিলাম—পড়ে গিয়ে পা ভেঙে নাকি তাঁকে একমাস বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল। নিজেকে যতদূর জানি—আমার ফাঁড়া শুধু পা ভাঙার ওপর দিয়েই কাটবে বলে মনে হয় না।
বললাম—ওটা এখন থাক, পরে হবে না হয়।
রাজাবাহাদুর মৃদু কৌতুকের হাসি হাসলেন। বললেন—এখন ভয় পাচ্ছেন, কিন্তু একবার ধরতে শিখলে আর ছাড়তে চাইবেন না। হাতে থাকলে বুঝবেন কত বড় শক্তিমান আপনি ইউ ক্যান ইজিলি ফেস অল দ্য রাস্কেলস অব—অব—
হঠাৎ তাঁর চোখ ঝকঝক করে উঠল। মৃদু হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে শক্ত হয়ে উঠল মুখের পেশীগুলো অ্যান্ড এ রাইভ্যাল–
মুহূর্তে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল আমার। রাজাবাহাদুরের দু’চোখে বন্য হিংসা, রাইফেলটা এমন শক্ত মুঠিতে বাগিয়ে ধরেছেন যেন সামনে কাউকে গুলি করবার জন্যে তৈরী হচ্ছেন তিনি। উত্তেজনার ঝোঁকে আমাকেই যদি লক্ষ্যভেদ করে বসেন তা হলে—
আতঙ্কে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। কিন্তু ততক্ষণে মেঘ কেটে গেছে–রাজা রাজড়ার মেজাজ! রাজাবাহাদুর হাসলেনা।
—ওয়েল, পরে আপনাকে তালিম দেওয়া যাবে। সবই তো রয়েছে, যেটা খুশি আপনি ট্রাই করতে পারেন। চলুন, এখন বারান্দায় গিয়ে বসা যাক, লেটস হ্যাভ সাম এনার্জি।
প্রাতরাশেই প্রায় বিন্ধ্যপর্বত উদরসাৎ করা হয়েছে, আর কি হলে এনার্জি সঞ্চিত হবে বোঝা শক্ত। কিন্তু কথাটা বলেই রাজাবাহাদুর বাইরের বারান্দার দিকে পা বাড়িয়েছেন। সুতরাং আমাকেও পিছু নিতে হল।
বাইরের বারান্দায় বেতের চেয়ার, বেতের টেবিল। এখানে ঢোকবার পরে এমন সব বিচিত্র রকমের আসনে বসছি যে আমি প্রায় নার্ভাস হয়ে উঠেছি। তবু যেন বেতের চেয়ারে বসতে পেয়ে খানিকটা সহজ অন্তরঙ্গতা অনুভব করা গেল। এটা অন্তত চেনা জিনিস।
আর বসবার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গেল এনার্জি কথাটার আসল তাৎপর্য কি। বেয়ারা তৈরীই ছিল, ট্রেতে করে একটি ফেনিল গ্লাস সামনে এনে রাখল। অ্যালকোহলের উগ্র গন্ধ ছড়িয়ে গেল বাতাসে।
রাজাবাহাদুর স্মিত হাস্যে বললেন—চলবে?
সবিনয়ে জানালাম, না।
—তবে বিয়ার আনবে? একেবারে মেয়েদের ড্রিঙ্ক! নেশা হবে না।
–না থাক। অভ্যেস নেই কোনোদিন।
–হুঁ, গুড কন্ডাক্টের প্রাইজ পাওয়া ছেলে! রাজাবাহাদুরের সুরে অনুকম্পার আভাস আমি কিন্তু চোদ্দ বছরের বয়সেই প্রথম ড্রিঙ্ক ধরি।
রাজা-রাজড়ার ব্যাপার—সবই অলৌকিক জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই কেউটের বাচ্চা। সুতরাং মন্তব্য অনাবশ্যক। ট্রে বার বার যাতায়াত করতে লাগল। রাজাবাহাদুরের প্রখর উজ্জ্বল চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে এল ক্রমশ, ফর্সা মুখ গোলাপী রং ধরল। হঠাৎ অসুস্থ দৃষ্টিতে তিনি আমার দিকে তাকালেন।
—আচ্ছা বলতে পারেন, আপনি রাজা নন কেন?
এ রকম একটা প্রশ্ন করলে বোকার মতো দাঁত বের করে থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আমিও তাই করলাম
—বলতে পারলেন না?
–না।
—আপনি মানুষ মারতে পারেন?
এ আবার কী রকম কথা! আমার আতঙ্ক জাগল।
–না।
তা হলে বলতে পারবেন না। ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি হোপলেস।
উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন রাজাবাহাদুর। বলে গেলেন আই পিটি ইউ।
বুঝলাম নেশাটা চড়েছে। আমি আর কথা বাড়ালাম না, চুপ করে বসে রইলাম সেখানেই। খানিক পরেই ঘরের ভেতরে নাক ডাকার শব্দ। তাকিয়ে দেখি তাঁর লাউঞ্জের সেই চেয়ারটায় হাঁ করে ঘুমুচ্ছেন রাজাবাহাদুর, মুখের কাছে কতকগুলো মাছি উড়ছে ভনভন করে।
* * * *
সেইদিন রাত্রেই শিকারের প্রথম অভিজ্ঞতা।
জঙ্গলের ভেতর বসে আছি মোটরে। দুটো তীব্র হেডলাইটের আলো পড়েছে সামনের সঙ্কীর্ণ পথে আর দুধারের শালবনে। ওই আলোর রেখার বাইরে অবশিষ্ট জঙ্গলটায় যেন প্রেতপুরীর। জমাট অন্ধকার রাত্রির তমসায় আদিম হিংসা সজাগ হয়ে উঠেছে চারিদিকে অনুভব করছি সমস্ত স্নায়ু দিয়ে। এখানে হাতীর পাল ঘুরছে দূরের কোনো পাহাড়ের পাথর গুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, ঝোপের ভেতরে অজগর প্রতীক্ষা করে আছে অসতর্ক শিকারের আশায়, আসন্ন বিপদের সম্ভাবনায় উৎকর্ণ হয়ে আছে হরিণের পাল আর কোনো একটা খাদের ভেতরে জ্বলজ্বল করছে। ‘ক্ষুধার্ত বাঘের চোখা কালো রাত্রিতে জেগে আছে কালো অরণ্যের প্রাথমিক জীবনা।
রোমাঞ্চিত ভীত প্রতীক্ষায় চুপ করে বসে আছি মোটরের মধ্যেকিন্তু হিংসার রাজত্ব শালবন। ডুবে আছে একটা আশ্চর্য স্তব্ধতায়। শুধু কানের কাছে অবিশ্রান্ত মশার গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মাঝে মাঝে অল্প বাতাস দিচ্ছে—শালের পাতায় উঠেছে এক একটা মৃদু মর্মর। আর কখনো ডাকছে বনমুরগী, ঘুমের মধ্যে পাখা ঝাপটাচ্ছে ময়ূর। মনে হচ্ছে এই গভীর ভয়ঙ্কর অরণ্যের প্রাণীগুলো যেন নিশ্বাস বন্ধ করে একটা নিশ্চিত কোনো মুহূর্তের প্রতীক্ষা করে আছে।
