রাজাবাহাদুর বললেন—এত কষ্ট করে আপনি যে আসবেন সে ভাবতেই পারিনি। বড় আনন্দ হল। চলুন চলুন, ওপরে চলুন।
এত গুণ না থাকলে কি আর রাজা হয়! একেই বলে রাজোচিত বিনয়।
রাজাবাহাদুর বললেন—আগে স্নান করে রিফ্রেশড হয়ে আসুন, টি ইজ গেটিং রেডি বোয়, সাহেব কো গোসলখানামে লে যাও।
চল্লিশ বছরের দাড়িওয়ালা বয় নিঃসন্দেহে বাঙালী। তবু হিন্দী করে হুকুমটা দিলেন রাজাবাহাদুর, কারণ ওটাই রাজকীয় দস্তুর। বয় আমাকে গোসলখানায় নিয়ে গেল।
আশ্চর্য, এই জঙ্গলের ভেতরও এত নিখুঁত আয়োজন! এমন একটা বাথরুমে জীবনে আমি স্নান করিনি। ব্র্যাকেটে তিন-চারখানা সদ্য পাট-ভাঙা নতুন ভোয়ালে, তিনটে দামী সোপকেসে তিন রকমের নতুন সাবান, যাকে দামী দামী তেল, লাইমজুস অতিকায় বাথটাব, ওপরে ঝাঁঝরি। নিচে টিউবওয়েল থেকে পাম্প করে এখানে ধারাস্নানের ব্যবস্থা একেবারে রাজকীয় কারবার কে বলবে এটা কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেল নয়!
স্নান হয়ে গেল। ব্রাকেটে ধোপদুরস্ত করা ফরাসডাঙার ধুতী, সিলকের লুঙ্গি, আদ্দির পাজামা দামের দিক থেকে পাজামাটাই সস্তা মনে হল, তাই পরে নিলাম।
বয় বাইরেই দাঁড়িয়েছিল, নিয়ে গেল ড্রেসিংরুমে। ঘরজোড়া আয়না, পৃথিবীর যা কিছু প্রসাধনের জিনিস কিছু আর বাকি নেই এখানে
ড্রেসিংরুম থেকে বেরুতে সোজা ডাক পড়ল রাজাবাহাদুরের লাউঞ্জে রাজাবাহাদুর একখানা চেয়ারে চিত হয়ে শুয়ে ম্যানিলা চুরুট খাচ্ছিলেন। বললেন, আসুন চা তৈরী।
চায়ের বর্ণনা না করাই ভালো। চা, কফি, কোকো, ওভালটিন, রুটি, মাখন, পনির, চর্বিতে জমাট ঠাণ্ডা মাংস। কলা থেকে আরম্ভ করে পিচ পর্যন্ত প্রায় দশ রকমের ফল।
সেই গন্ধমাদন থেকে যা পারি গোগ্রাসে গিলে চললাম আমি। রাজাবাহাদুর কখনো এক টুকরো রুটি খেলেন, কখনো একটু ফল। অর্থাৎ কিছুই খেলেন না, শুধু পর পর কাপ তিনেক চা ছাড়া। তারপর আর একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন—একবার জানালা দিয়ে চেয়ে দেখুন।
দেখলাম প্রকৃতির এমন অপূর্ব রূপ জীবনে আর দেখিনি। ঠিক জানলার নিচেই মাটিটা খাড়া তিন চারশো ফুট নেমে গেছে বাড়িটা যেন ঝুলে আছে সেই রাক্ষুসে শূন্যতার ওপরে। তলায় দেখা যাচ্ছে ঘন জঙ্গল, তার মাঝ দিয়ে পাহাড়ী নদীর একটা সঙ্কীর্ণ নীলোজ্জল রেখা যতদূর দেখা যায়, বিস্তীর্ণ অরণ্য চলেছে প্রসারিত হয়ে তার সীমান্তে নীল পাহাড়ের প্রহরা।
আমার মুখ দিয়ে বেরুলো—চমৎকার!
রাজাবাহাদুর বললেন রাইট। আপনারা কবি মানুষ, আপনাদের তো ভালো লাগবেই আমারই মাঝে মাঝে কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে মশাই। কিন্তু নিচের ওই যে জঙ্গলটি দেখতে পাচ্ছেন ওটি বড় সুবিধের জায়গা নয়। টেরাইয়ের ওয়ান অব দি ফিয়ার্সেস্ট ফরেস্টস। একেবারে প্রাগৈতিহাসিক হিংস্রতার রাজত্ব।
আমি সভয়ে জঙ্গলটার দিকে তাকালাম। ওয়ান অব দি ফিয়ার্সেস্ট! কিন্তু ভয় পাওয়ার মতো কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না। চারশো ফুট নিচে ওই অতিকায় জঙ্গলটাকে একটা নিরবচ্ছিন্ন বেঁটে গাছের ঝোপ বলে মনে হচ্ছে, নদীর রেখাটাকে দেখাচ্ছে উজ্জ্বল একখানা পাতার মতো। আশ্চর্য সবুজ, আশ্চর্য সুন্দর। অফুরন্ত রোদে ঝলমল করছে অফুরন্ত প্রকৃতি-পাহাড়টা যেন গাঢ় নীল রঙ দিয়ে আঁকা। মনে হয়, উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়লে ওই স্তব্ধ গম্ভীর অরণ্য যেন আদর করে বুকে টেনে নেবে রাশি রাশি পাতার একটা নরম বিছানার ওপরে। অথচ–
আমি বললাম—ওখানেই শিকার করবে নাকি? ক্ষেপেছেন, নামব কী করে! দেখছেন তো, পেছনে চারশো ফুট খাড়া পাহাড়। আজ পর্যন্ত ওখানে কোনো শিকারীর বন্দুক গিয়ে পৌঁছোয় নি। তবে হ্যাঁ, ঠিক শিকার করি না বটে, আমি মাঝে মাঝে মাছ ধরি ওখান থেকে।
—মাছ ধরেন!—আমি হাঁ করলাম মাছ ধরেন কিরকম? ওই নদী থেকে নাকি?
—সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য দরকার হলে পরে দেখতে পাবেন রাজাবাহাদুর রহস্যময় ভাবে। মুখ টিপে হাসলেনা আপাতত শিকারের আয়োজন করা যাক, কিছু না জুটলে মাছের চেষ্টাই করা। যাবো তবে ভালো টোপ ছাড়া আমার পছন্দ হয় না, আর তাতে অনেক হাঙ্গামা।
—কিছু বুঝতে পারছি না।
রাজাবাহাদুর জবাব দিলেন না, শুধু হাসলেন। তারপর ম্যানিলা চুরুটের খানিকটা সুগন্ধি ধোঁয়া ছড়িয়ে বললেন—আপনি রাইফেল ছুঁড়তে জানেন?
বুঝলাম কথাটি চাপা দিতে চাইছেন। সঙ্গে সঙ্গে জিহ্বাকে দমন করে ফেললাম, এর পরে আর কিছু জিজ্ঞাসা করাটা সঙ্গত হবে না, শোভনও নয়। সেটা কোর্ট-ম্যানারের বিরোধী।
রাজাবাহাদুর আবার বললেন, রাইফেল ছুঁড়তে পারেন?
বললাম—ছেলেবেলায় এয়ার গান ছুঁড়েছি।
রাজাবাহাদুর হেসে উঠলেন—তা বটে। আপনারা কবি মানুষ, ওসব অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপার আপনাদের মানায় না। আমি অবশ্য বারো বছর বয়সেই রাইফেল হাতে তুলে নিয়েছিলাম আপনি চেষ্টা করে দেখুন না, কিছু শক্ত ব্যাপার নয়।
উঠে দাঁড়ালেন রাজাবাহাদুরা ঘরের একদিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করে আমি দেখলাম—এ শুধু লাউঞ্জ নয়, রীতিমতো একটা ন্যাচারাল মিউজিয়াম এবং অস্ত্রাগার। খাওয়ার টেবিলেই নিমগ্ন ছিলাম বলে এতক্ষণ দেখতে পাইনি, নইলে এর আগেই চোখে পড়া উচিত ছিল।
চারিদিকে সারি সারি নানা আকারের আগ্নেয়াস্ত্র। গোটাচারেক রাইফেল, ছোট বড় নানা রকম চেহারা। একটা হুকের সঙ্গে খাপে আঁটা একজোড়া রিভলভার ঝুলছে তার পাশেই ঝুলছে খোলা একখানা লম্বা শেফিল্ডের তলোয়ার—সূর্যের আলোর মতো তার ফলার নিষ্কলঙ্ক রঙা মোটা। চামড়ার বেলটে ঝকঝকে পেতলের কার্তুজ রাইফেলের, রিভলভারের। জরিদার খাপে খান তিনেক নেপালী ভোজালি। আর দেয়ালের গায়ে হরিণের মাথা, ভালুকের মুখ, নানা রকমের চামড়া–বাঘের, সাপের, হরিণের, গো-সাপের একটা টেবিলে অতিকায় হাতীর মাথা—দুটো বড় বড় দাঁত এগিয়ে আছে সামনের দিকে। বুঝলাম—এরা রাজাবাহাদুরের বীরকীর্তির নিদর্শন।
