যাঁহাকে রাধা বাহিরে পাইয়াছিলেন, চক্ষু বুজিলে তো তাঁহাকে দেখা যাইত না, তিনি না আসিলে তো তাঁহাকে পাওয়া যাইত না; সুতরাং একবার মনে হইত, তিনি মুঠার মধ্যে, পুনরায় তাঁহার সঙ্গে বিরহ হইত, পাছে প্রেম ভাঙ্গে, এই ভয়ে মান হইত। কিন্তু আজ যাঁহাকে তিনি পাইলেন, তিনি যেমনই বাহিরে, তেমনই ভিতরে; তাঁহাকে চক্ষু মেলিয়া বিশ্বে স্বপ্রকাশরূপে দেখা যায় এবং চক্ষু বুজিয়া ধ্যান-ধারণার মধ্যেও তেমন পাওয়া যায়। আজ খণ্ডিতা বিপ্রলব্ধা ও কলহারিন্তরাতার পালা শেষ, আজ মাথুরের মম্মান্তিক কষ্ট আর নাই। এই ভাঙ্গা গড়ার অতীত, সর্ব্বপ্রকার চাঞ্চল্যমুক্ত পূর্ণানন্দস্বরূপকে তিনি অখণ্ডভাবে পাইলেন, তাই বিদ্যাপতির রাধা হর্ষোচ্ছ্বাসে গাহিলেন,
‘‘আজ রজনী হাম ভাগে পোহাইনু,
পেখুন পিয়া-মুখ-চন্দ—”
“আজ মঝু দেহ, দেহ করি মানিনু,
আজ মন্তু দেহ ভেল দেহ।’’
আজ সমস্ত সন্দেহ দূর হইল, মান-অভিমানের পালার উপর যবনিকা-পাত, আজ নির্দ্বন্দ্বভাবে তাঁহাকে পাইয়াছি,
‘‘আজ বিহি মোহে, অনুকূল হোয়ল টুটল সবহি সন্দেহ’’
সুতরাং
‘‘সোহি কোকিল অব লাখ ডাকয়ু, লাখ উদর করু চন্দ,
পাঁচ বাণ অব লাখবান হউ, মলয় পবন বহু মন্দ।’’
তখন একটা কোকিল ডাকিলে রাধিকা অস্থির হইয়া পড়িতেন, আজ এই শুভ মিলনরাত্রে লাখ বার কোকিল ডাকুক; পূর্ব্বে কামদেবের একটি সায়ক, আকাশে একটি চন্দ্রের আবির্ভাব হইলে “তব কুসুম শরত্বং শীতরশ্মিত্বমিন্দোঃ” রাধার পক্ষে অবধার্য হইত, ইন্দুসম্বুখে অগ্নিয় জ্বালা উৎপন্ন করিত, পঞ্চবাণ বজ্রসারের মত ঠেকিত, আজ পাঁচবাণ স্থলে লক্ষবাণ পড়ুক, এক চন্দ্রের স্থলে লক্ষ চন্দ্র উদিত হউক, আজ যে শুভ মিলন-রাত্রি। কিছু পূর্ব্বে চণ্ডীদাস এইরূপ উপলক্ষে লিখিয়াছিলেন,
‘‘এখন গগনে উদয় করুক চন্দ,
মলয় পবন বহুক মন্দ,
কোকিলা আসিয়া করুক গান,
ভ্রমরা ধরুক মধুর তান।’’
চণ্ডীদারে এই সরল সুন্দর পদটি লইয়া বিদ্যাপতি তার উপর রং ফলাইতে চেষ্টা করিয়াছেন।
রাধার অবস্থা কৃষ্ণ বিচ্ছেদে বর্ণনা করিতে যাইবা কবি লিখিয়াছেন, “নয়নক সিদ গেও, বয়ানক হাস- ধরণী ধরিয়া ধনী কত বেরি বৈঠত, পুনতহি উঠহ না পারা। কাতর দিঠি করি, চৌদিশ হেরি, হেরি, নয়নে গলতি জল ধারা”–এই আসন্ন মৃত্যু রাধা বিরহের নানা চক্রে, নানা দশায় পড়িয়া আধতনু কালিন্দী-নীরে, অবস্থায় পৌছিয়াছিলেন–এইখানেই মাথুর ভাবের শেষ; কিন্তু বিরহে পুড়িয়া যে ছাই রহিল, গল্প কথিত ফিনিক্সের মত তাহা হইতে রাধার হৃদয় কৃষ্ণপ্রেম নতুন অবয়ব ধরিয়া জন্ম পাইল। বাহিরে হারাইয়া তিনি তাহাকে মনের মধ্যে পাইলেন- ইহাই “ভাব-সম্মেলন”–বঙ্গীয় প্রেম-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ কথা–নূতন আবিষ্কার।
কৃষ্ণ এইরূপে নৃতনভাবে তাহার মনের বৃন্দাবনে আসিবেন, সেখানকার রাধাকুণ্ড, কামকুণ্ড, দ্বাদশবন ও শ্যামকুণ্ড, সকলই মনের, সে বৃন্দাবনের নাম নিত্য বৃন্দাবন- সেখানে কিছু হারায় না, তাহা পাওয়ার দেশ। সথীরা বিলাপ করিতেছিল, কিন্তু অকস্মাৎ রাখা মনে পুলক অনুভব করিলেন, হঠাৎ দূরাগত বংশী-রবের মত কে যেন মনের কাণে কাণে একটা শুভ সংবাদ দিয়া গেল। সে সংবাদ বাহককে রাধা চিনেন না, তথাপি তাহা বিশ্বাস করিলেন। রাধা সখীদের ডাকিয়া বলিলেন,
‘‘আজ কুদিন সুদিন ভেল,
আজ মাধব মন্দিরে আওব তুরিতে, কপাল কহিয়া গেল।’’
রাধার চিত্ত হর্ষে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল–কৃষ্ণ আসিবেন, কে বলিল! রাধা বলিলেন “কপাল কহিয়া গেল”–আমার কপাল, আমার ভাগ্য লক্ষ্মী বলিয়া গেলেন। আমি অভ্রান্ত ভাবে আমার সে সৌভাগ্য বুঝিয়াছি। বহুদিন পরে
‘‘আমার চিকুর ফুরিছে, বসন খসিছে, পুলক যৌবন-ভার।
বাম অঙ্গ আঁখি, সঘনে নাচিছে, দুলিছে হিয়ার হার।’’
কোন দূত বা সংবাদবাহক বলিয়া যায় নাই; বাঁশী আমাকে রাধা বলিয়া ডাকে নাই, এই কথা কোন বাহিরের সূত্র হইতে পাই নাই, আমি তাঁহার পদের নূপুর সিঞ্জনের মধুর শব্দ শুনি নাই–কিন্তু তথাপি বুঝিয়াছি তিনি আসিতেছেন; নতুবা আমার বেণী-মুক্ত কুন্তল হঠাৎ মহাহলাদের সাড়া দিয়া উঠিবে কেন? আমার সুখ রোমাঞ্চিত দেহ হইতে অঞ্চল বারংবার স্খলিত হইয়া পড়িতেছে কেন? আমার বিরহ খিন্ন উপবাস ও জাগরণ ক্লিষ্ট শরীর নব যৌবনের পুলকে অধীর হইয়া উঠিবে কেন? বাম অঙ্গ ও আঁখির নর্ত্তনেও সেই কথা বুঝাইতেছে। আজ সেই আনন্দের ঢেউ লাগিয়া হৃদয়ের স্পন্দনের সহিত বক্ষবিলম্বিত মুক্তাহার দুলিয়া উঠিতেছে।
নিত্যই তো প্রাতঃকালে গাছে গাছে কাকগণ কোলাহল করিয়া আহার বাঁটিয়া খায়; বিদ্যাপতি লিখিয়াছেন “কান্ত কাক-মুখে নাহি সংবাদই।” পুরাকালে দূরগত স্বামীর বিরহে কাতরা রমণীরা হাত জোড় করিয়া কাকের কাছে শত শত বার স্বামীর শুভাশুভ-বার্ত্তা জিজ্ঞাসা করিতেন। কাকের কি রবের কি অর্থ, তাহা কাক চরিত্রে লিখিত আছে। রাধাও প্রতিদিন কত কি জিজ্ঞাসা করিতেন। কিন্তু আজ “পিয়া আসিবার নাম শুনাইতে, উড়িয়া বসিল তায়” কাক শুভস্বর করিয়া আমার নিকটে উড়িয়া আসিল।
আজ “মুখের তাম্বুল খসিয়া পড়িছে, দেবের মাথার ফুল”–অহেতুক আনন্দে কার সোহাগে মুখের চর্ব্বিত তাম্বূল খসিয়া পড়িয়াছে? শিবমন্দিরে প্রণাম করিতে যাইয়া, হঠাৎ শিবের মাথার আশীর্ব্বাদী ফুল আমার হাতে আসিয়া পড়িল।
