কুলিও বোধহয় দেখতে পেয়েছে তাঁকে। চেঁচিয়ে, তারপরে হাতমুখের ইশারা করে সে কী বোঝাল যেন, যোগেশবাবু কিছুই বুঝতে পারলেন না। বুঝতে পারলেও উপায় ছিল না। মালপত্র নিয়ে কুলি ভিতরে রইল, কিন্তু যোগেশবাবু উঠবেন কী করে?
দরজায় যারা ঝুলছে তারা আসলে প্রত্যেকে বসে আছে দুজন কিংবা তিনজন করে লোকের পিঠে। এরা বসে রয়েছে পাদানিতে আর সেই পাদানির লোকগুলোর পা ধরে ঝুলে রয়েছে, একেক পায়ে দুজন করে চারজন লোক। এইভাবে সিঁড়ি ভাঙার অঙ্কের মতো ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে জনতার ডালপালা।
জানলায় কনুই এবং কাঁধের ফাঁকে এক স্কোয়ার ইঞ্চি জায়গা দিয়ে কুলিকে দেখেছিলেন, দরজার কোথাও সেটুকু ফঁক পেলে যোগেশবাবু ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করতে কসুর করতেন না। কিন্তু তাও তো নেই।
দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দের মতো তীক্ষ্ণ সিটি দিয়ে মেল ট্রেনে ছেড়ে দিল। একটু ছুটলেন যোগেশবাবু ট্রেনের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের সীমা পর্যন্ত, তারপর মালপত্রসুদ্ধ তাঁর কুলিকে নিয়ে তাঁর ট্রেন তাকে ফেলে ধীরেসুস্থে গড়িয়ে গেল।
অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে যোগেশবাবু এবার স্টেশনের অফিসের দিকে ছুট দিলেন একটা তদ্বির তদারক কিছু করা যায় কিনা এই আশায়।
এবার আরেকটা কুলি তার পথরোধ করে দাঁড়াল, কেয়া হুয়া?
যোগেশবাবু খেঁকিয়ে উঠলেন, হামারা মালপত্র লেকে কুলি চলা গিয়া।
এই কুলির মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল, কৌন কুলি? চাকতি হ্যায়? যোগেশবাবু চাকতিটা দেখালেন। চাকতিটা দেখে এবার আর গোলমেলে হিন্দি বলল না, স্পষ্ট বাংলায় কুলি বলল, দুশো আশি নম্বর, তা হলে বিরজাবাবু এতদিনে যেতে পারলেন।
প্রথমত স্পষ্ট বাংলা, তারপর এইরকম অর্থহীন উক্তি–যোগেশবাবু রীতিমতো অবাক হলেন, কে বিরজাবাবু?
কুলি বলল, ওই যিনি চলে গেলেন, এই দুশো আশি নম্বর।
যোগেশবাবু থতমত খেলেন, কুলি মানে, বিরজাবাবু মানে?
কুলি যোগেশবাবুর প্রশ্নের পাশ এড়িয়ে বলল, আপনি তো চাকতি পেয়ে গেছেন, আপনি লেগে যান, আপনিও একদিন যেতে পারবেন।
যোগেশবাবু অর্থহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কুলি বলল, এই এইখানে দেখছেন আমরা এখানে কেউই আসলে কুলি নই। এখানে আটকে গিয়ে কুলি হয়েছি। এই আমি, আমি তো সরকারি কাজ করি, বদলি হয়ে যেতে গিয়ে এখানে আটকে গেছি। আমার মালপত্র নিয়ে নবীনবাবু চলে গেছেন।
কিন্তু বিরজাবাবু? যোগেশবাবুর তবুও বিমূঢ় ভাব একেবারে কাটেনি।
বিরজাবাবু তো এই এতদিনে যেতে পারলেন, আড়াই মাস লাগল ওঁর বেরোতে, আমার তো চার সপ্তাহ হয়ে গেল দেখি এবার যেতে পারি কিনা।কুলির মুখে আশা-নিরাশার আলোছায়া।
কিন্তু আমি? যোগেশবাবুর সংশয় তবু যায় না।
আগে হোক পরে তোক আপনিও যেতে পারবেন। বিরজাবাবুর মতোই আরেক জনের মাল নিয়ে ট্রেনে উঠবেন যেদিন পারেন, সে আর উঠতে পারবে না। কুলি ছাড়া আর কে উঠতে পারে? বলতে বলতে যোগেশবাবুর হাত থেকে পিতলের চাকতিটা নিয়ে কুলি যোগেশবাবুর বাহুতে শক্ত করে বেঁধে দিল, তারপর কাঁধে একটা হাত রেখে বলল, কিছু ভাববেন না, এখন কাজে লেগে যান, এইভাবেই সবাই যায়। কেউ কি আর সারাজীবন স্টেশনে পড়ে থাকে? আমি যাব, আপনিও যেতে পারবেন। দুমাস হোক, চারমাস হোক একদিন নিশ্চয় যাবেন। এই বিরজাবাবুর মতোই আরেকজনের মালপত্র নিয়ে নিশ্চয়ই একদিন চলে যেতে পারবেন।
মনোজ সান্যালের গল্প
মনোজ সান্যালের সঙ্গে আর কোনওকালে দেখা হবে এমন মনে হয় না, তাই ভরসা করে এই গল্প লেখা সম্ভব হল। এই গল্পের মা নেই, বাবা নেই, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশী, সহপাঠী-সহযাত্রী-সহকর্মী কেউ নেই–শুধু মনোজ সান্যাল আছেন এবং বলাই বাহুল্য এই গল্পটি মনোজ সান্যালের পক্ষে যথেষ্ট সম্মানজনক নয়।
প্রথমেই বলা উচিত মনোজ সান্যালের চেহারা ভাল ছিল না। অবশ্য যাঁরা মনোজবাবুকে কখনও দেখেছেন তারা বলবেন চেহারা ভাল ছিল না এরকম বললে মনোজবাবু সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না। আসলে তার চেহারা ছিল ভয়ংকর অথবা বলা যায় সাংঘাতিক। নবীনা জননীরা অনেক সময় মনোজ সান্যালের ভয় দেখিয়ে শিশুদের ঘুম পাড়াতেন, বহু শিশু ঘুমের মধ্যে মনোজ মনোজকরে কেঁদে উঠত।
একটু বর্ণনা করা এরপর অবশ্যই প্রয়োজন। অনেকের মাথার চুল কোঁকড়া থাকে, মনোজবাবুরও তাই ছিল, একটু বেশি কোঁকড়া, সেই সঙ্গে দুই পাশে দুটো কানও কোকড়ানো। ওইরকম গোলাপ ফুলের মতো কান কখনও দেখা যায় না। সেই সঙ্গে শিমূলের মতো নাক আছে কি নেই বোঝা যায় না, কারণ সেটা ঢাকা পড়ে গেছে দুই সদাসর্বদা রক্তাক্ত বিশাল চোখের নীচে। পুরু ঠোঁট অথচ সব। মিলে অতিকায় ছোট একটি মাথা, অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় মাথা এবং তার নীচেই একটি বিশাল ধড়। তার মধ্যে বিশালতম ডান পা–একটি মারাত্মক জাতের ফাঁইলেরিয়া আক্রমণের পর থেকে।
মনোজ সান্যাল একটি সওদাগরি ফার্মে ক্যাশিয়ারের কাজ করতেন। প্রথম দিন চাকরিতে যোগদান করার পর তিনি যখন ম্যানেজিং ডিরেকটরের সঙ্গে দেখা করতে যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাকে দেখে আঁতকে ওঠেন, তার সুন্দরী লিপি-লেখিকা হাফ মেমসায়েব সত্যি সত্যিই স্ক্রিম–খাঁটি ইংরেজিতে স্ক্রিম করে ওঠেন।
মনোজবাবু দেখা করে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তের মধ্যে বড়সাহেব মানে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বাহাদুর ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে পাঠালেন।
