দাদা গর্জে উঠেছিল, সরসী তো শত্রুপক্ষের মেয়ে। তোমার গতবারের কথা মনে নেই। ওর কাছে। কী শিখব, ও ইচ্ছে করে ভুল শেখাবে।
দাদা এই কথাগুলো যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঠাকুমাকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিল, সরসীপিসি তখন। ওঁদের বাড়ির জানলার পাশে টেবিলের সামনে এসে খাতায় কী যেন লিখছিলেন, দাদার কথা শুনে একবার মুখ তুলে জানলা দিয়ে দেখে ফিক করে হেসে আবার লেখায় মনোনিবেশ করলেন।
আমি বারান্দায় দাদার পাশেই ছিলাম। দাদার সদ্য ব্যবহৃত শত্রুপক্ষের মেয়ে কথাটি আমার চেনা। কয়েকদিন আগেই এই নামে একটা নতুন বই এসেছে আহমদিয়া লাইব্রেরির শো কেসে, ইস্কুল যাওয়ার। পথে দাদা আর আমি দুজনেই সেটা দেখেছি। ঢাকা বা কলকাতা থেকে নতুন কোনও বই এলে প্রথম কিছুদিন সেগুলো কাঁচের শো কেসে রাখা হত। খালধারের বইয়ের দোকানগুলোর পাশ দিয়ে ইস্কুলে যাতায়াতের পথে আমরা সেগুলো খুঁটিয়ে দেখতাম।
এখনও সরসীপিসির কথাই শুরু হল না। শত্রুপক্ষের ব্যাপারটা যথা সময়ে বলা যাবে।
সরসীপিসি যেবার ম্যাট্রিক পাশ করলেন সে বছর আমাদের শহরের মাত্র পাঁচজন ম্যাট্রিকে ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছিল, তার মধ্যে সরসীপিসি একা মেয়ে। শুধু তাই নয় আমাদের শহরে অনেক কালের মধ্যে মাত্র দুটি মেয়ে ফাস্ট ডিভিশন পেয়েছিল, তার একজন ওই সরসীপিসি আর অন্যজন সরসীপিসিরই দিদি অতসীপিসি। ম্যাট্রিক পাশ করার পর পর আমাদের তখন খুব অল্প বয়েস, অতসীপিসির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। এখনও একটু একটু মনে পড়ে বিয়ের বাসর-ঘরে অতসীপিসির বর হেঁড়ে গলায় এখনি উঠিবে চাঁদ আধো আলো আধো ছায়াতে গেয়েছিলেন।
এসব অনেককাল আগেকার কথা। এত বছর পরে অত অল্প বয়েসের কোনও কিছু মনে থাকার কথা নয়। কিন্তু কেমন যেন মনে পড়ে সেদিন খুব ঘন জ্যোৎস্না উঠেছিল। বাসরঘরের সামনের উঠোনে এক ঝক কাঠচাপা গাছের ফুল-পাতা মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল চাঁদের আর হ্যাঁজাকের আলোয়।
অতসীপিসিমার বাসরঘর হয়েছিল আমাদের দালানের সবচেয়ে বড় ঘরটায়, যে ঘরটায় আত্মীয়স্বজন এলে থাকতেন। তখন আমাদের ওখানে এরকমই হত। পাড়ায় একটা বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশন হলে ব্যাপার হত আশেপাশের বেশ কয়েকটা বাড়ি মিলে। বিয়েটা হত নিজের বাড়িতে, বরযাত্রীরা উঠত অন্য এক বাড়িতে, বাসরঘর হয়তো আরেক বাড়িতে যেখানে ভাল খালি ঘর আছে।
আমাদের পাশাপাশি বাড়ি। সরসীপিসিদের বাড়ির চলতি নাম ছিল পশ্চিমবাড়ি। লাগোয়া পাশের বাড়ি আমাদের সেই অর্থে বাড়ির পরিচয় হওয়া উচিত পূৰ্বাড়ি নামে, কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে আমাদের বাড়ি হল দক্ষিণবাড়ি। এবং ততোধিক অজ্ঞাততর কারণে পূর্ববাড়ি নামে কোনও বাড়ি ছিল না। এমনকী উত্তরবাড়িও ছিল না।
এই নিয়ে কারও মনে কখনও কোনও সংশয় দেখা গিয়েছে বলে শুনিনি। আরও অনেক কিছুর মতোই এসব আমরা জন্মতক মেনে নিয়েছিলাম। বোধহয় শহর যখন নতুন পত্তন হয় সেই সময় সীমানা নির্দেশক এই সব নামকরণ হয়েছিল। আর নামাঙ্কিত বাড়িগুলোও স্থান বদল করেছিল। আমাদের বাড়িইনাকি আগে ছিল নদীর পাশে, বারবার ভাঙনের মুখে শহরের এপাশে উঠে এসেছিল। স্থানবদল, দিকবদল হয়েছিল কিন্তু বাড়ির নামবদল হয়নি।
পুরনো দিনের কথা লিখতে গিয়ে কী যে সব অবান্তর কথা চলে এল। স্মৃতিঠাকুরানির ঝুলিতে কী যে অবান্তর আর কী যে অবান্তর নয় আমি হেন সামান্য রচনাকার সেটা কিছুতেই ধরতে পারি না।
বরং সরসীপিসির কথা যেটুকু এখনও মনে আছে, শেষবার ভুলে যাওয়ার আগে সেটা লিখে রাখি। সরসীপিসির দেখতে সুন্দরী ছিলেন না। শ্যামলা, ছিপছিপে বাঙাল মফস্সল শহরের ফ্যাশনহীন অনাধুনিকা। একটু আধুনিকতা অবশ্য ছিল, সেটা হল পুরনো বাংলা ধরনে শাড়ি না পরে ড্রেস করে মানে আজকালকার মতো কুচিয়ে শাড়ি পরা।
সুন্দরী না হলেও বুদ্ধিমতী ছিলেন সরসীপিসি। বুদ্ধি ও মেধা তার যথেষ্টই ছিল। তাঁর চোখেমুখে বুদ্ধির একটা আভা খেলে যেত। তবে তার সবটাই সুবুদ্ধি নয়। কিছুটা দুষ্টবুদ্ধিও ছিল।
না হলে, শুধু শুধু আমাকে কেন শিখিয়েছিলেন লিঙ্গ পরিবর্তন করে নদ যেমন নদী হয়, বালক যেমন বালিকা হয়, সিংহ হয় সিংহী, তেমনই নস্য হয়ে নস্যি।
এই গল্পের নাম নস্যি। সেই জন্যেই বোধহয় নস্যির প্রসঙ্গটা স্বাভাবিক ভাবেই এসে গেল।
আমাদের সেই বাল্যকাল, সেটা ছিল নস্য বা নস্যির সুবর্ণযুগ। নস্যির দোকান যত্রতত্র, যেকোনও দোকানে নস্যি।
নস্যিই বা কতরকম। র, পরিমল, রোজ। তার কত রকম গন্ধ। র নস্যির কড়া ঘ্রাণ, রোজের গোলাপি সৌরভ, পরিমলে মধুর সুবাস।
উকিল-ডাক্তার, মাস্টার-ছাত্র, মুহুরি-মক্কেল, ঝি-চাকর সবাই নস্যি নিত। তখন নাকি বাকিংহাম প্যালেসে রাজবাড়ির ডিনার শেষে নস্যি পরিবেশন করা হত ব্রান্ডির বা লিকারের পাশাপাশি সোনার নস্যদানিতে।
নস্যদানিও যে কত রকম ছিল। টিনের, পিতলের, রুপোর, পাথরের, হাতির দাঁতের। তার আবার কত কারুকার্য। অধিকাংশ নস্যির নেশার লোকের পকেটে দুটো করে রুমাল একটা ময়লা, মোটা কাপড়ের নস্যির রঙে চিত্র-বিচিত্র, অন্যটি শৌখিন সাধারণ ব্যবহারের রুমাল। বাড়ির কাজের লোক সেসব ঘৃণিত নস্য কলঙ্কিত রুমাল কাঁচতে চাইত না, গিন্নিরা নিজেদের চানের সময় বাঁ হাতে আলগোছে ধরে নাক সিঁটকিয়ে কর্তব্য পালন করতেন ওই রুমাল কেচে।
