বিকেলে চা খাওয়ার সময়েই মেজকর্তা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন—জলধর না ফেরা পর্যন্ত আপাতত কাজকর্ম বন্ধ রইল বলেই মনে হচ্ছে। এই আবহাওয়ায় ঘুরে ফিরে কাজের প্ল্যান তৈরী করারও উপায় নেই।
নির্মলবাবু বললেন—আজ আর কিছুই করা সম্ভব ছিল না। এই বৃষ্টিতে থিওডোলাইটই খাড়া করা যেত না। তবে কাল যদি মেঘ কেটে যায় তবে সাইট সার্ভে একটু এগিয়ে রাখবো। শিখিয়ে দিলে বিশুয়া বা ডহরু আয়না চমকাবার কাজ চালিয়ে দিতে পারবে। দেখা যাক কী হয়—
তাঁবুর দরজা দিয়ে বাইরের জলে ভেজা ঝোপঝাড় আর গাছেদের কালো কালো গুঁড়ি দেখতে পাচ্ছি। জলকণা তাঁবুর ভেতরে ঢুকছে। সেই হাওয়ার দাপটেই তাঁবুর দরজার ভেজা ক্যানভাসের পর্দাটা পতপত্ শব্দ করছে। সেদিকে তাকিয়ে যেন কিছু আত্মগত ভাবেই অসিত বিশ্বাস বললেন—এমন জলে ভেজা বাদলার দিনে ছোটবেলার একটা পুরনো ঘটনা মনে পড়ে গেল। আপনাদের শোনাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সে-সব সেকেলে পেঁয়ো গল্প—যাকে বলে ওল্ড ওয়াইভস টেল—তা কি আপনাদের ভাল লাগবে? থাক বরং–
মেজকর্তা চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। এতক্ষণ তিনি নিতান্ত ঝিমিয়ে ছিলেন, এবার গল্পের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় তাঁর চোখে উৎসাহের জ্যোতি ফিরে এসেছে। অসিতবাবুর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন—পেঁয়ো গল্প আবার কী? অমন কিছু হয় না। গল্প দু রকম হতে পারে—ভাল আর খারাপ। আপনার গল্প ভাল হলেই হল।
অসিতবাবু বললেন—এসব গল্পের বোধহয় ঠিক ভাল বা খারাপ হয় না। ছোটবেলার কথা মনে পড়লে মনটা একটু কেমন যেন হয়ে পড়ে, আনন্দও হয়, বিষণ্ণও লাগে। আনন্দটা বেশি হয়। কাজেই আমার তত ভাল লাগবেই। কিন্তু আপনাদের—যাক্, ঘটনাটা বলি।
আমি মেদিনীপুরের মানুষ। দেশের বাড়ি হচ্ছে পানিপারুল গ্রামে, সেখানেই আমাদের বহুপুরুষের বাস। বাবা কাজ করতেন মহিষাদল রাজ এস্টেটে। আমার জন্মও মহিষাদলেই। আবছা আবছা সেখানকার কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে তালগাছের সারি দিয়ে ঘেরা একটা জলে ভরা দীঘির ছবি চোখে ভাসে, তার পাড়ে আমি খেলা করতাম। বেশি বড় দীঘি নয়, কিন্তু তার চারদিকের লতাপাতা আর নির্জনতা জায়গাটিকে কেমন নিভৃত স্বপ্নময় করে তুলেছে। ছবিটা মনে পড়লেই আবার একবার মহিষাদল বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আর কি হবে?
আমার যখন দশ বছর বয়েস, সে সময় বাবা মহিষাদলের কাজ ছেড়ে পানিপারুল ফিরে আসেন। বাবা খুব স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন, হয়ত নিয়োগকর্তার আচরণ তার ভাল লাগেনি। এর পরে আর কখনো উনি পরের চাকরি করেন নি, বাড়িতে থেকেই নিজেদের যা জমিজমা ছিল তার চাষের কাজ দেখতেন আর সকাল-বিকেল গ্রামের ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে বারান্দায় বসিয়ে পড়াশুনো দেখিয়ে দিতেন। এর জন্য কারো কাছে টাকাপয়সা কিছু নিতেন না। গ্রামের লোকেরা তাকে মাস্টারমশাই বলে ডাকত।
আমাদের শৈশবে প্রায় সব পরিবারই ছিল একান্নবর্তী। বাড়ির কোনো ছেলে বড় হয়ে বৌ-ছেলেপিলে নিয়ে আলাদা থাকবে, এমন স্বার্থপরতার কথা কেউ সেকালে ভাবতেই পারত না। জ্যাঠামশাই, বাবা আর দুই কাকা ছাড়া আমাদের পরিবারে ছিলেন জ্যাঠাইমা, মা, দুই কাকিমা আর জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনেরা। চাষের কাজ দেখবার জনাদুই কৃষাণও বাইরের দালানে ঘুমোত। আর ছিল বাড়ির পুরনো কাজের লোকেরা। তারা অবশ্য বহুদিন থেকে থেকে বাড়ির লোেকের মতই হয়ে গিয়েছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কা ছিল অমিয়বালা, সে দেখেছি জ্যাঠামশাইকেও রীতিমত ধমকধামক করত। তাকে নাকি সে ছোট দেখেছে। জ্যাঠামশাইও মাথা নিচু করে তা মেনে নিতেন। এমনই চমৎকার ছিল সে সমাজ।
আমার যখন বছর বারো বয়েস তখন আমার জ্যাঠতুতো দিদি সিন্ধুলতার বিয়ে ঠিক হল। পাত্রের বাড়ি শোলপাট্টায়, নামকরা পরিবারের ছেলে, দানধ্যানের বিষয়ে সমাজে খ্যাতি আছে। পাত্রের বাবা উদারপন্থী মানুষ, এ বিয়েতে কিছু গ্রহণ করবেন না। তিনি নাকি বলেছেন-বাড়িতে আমার মা আসছেন, মাকে একখানা লালপেড়ে শাড়ি আর দুমুঠো ডালভাত দেবার ক্ষমতা এ পরিবারের আছে। খামোকা জিনিসপত্র চাইতে গেলে লোকে যে ‘বিষ্টু মাইতি ছেলে বিক্রি করল’ বলে খ্যাপাবে—তখন কী হবে?
কথাটার পেছনে শুধুই সারল্য বা উদারতা নয়, কিছুটা প্রচ্ছন্ন ধনগর্বও ছিল। কিন্তু বিষ্ণু মাইতি মানুষ এমনিতে খুব ভাল, তাছাড়া এটুকু সামান্য গৌরব করার অধিকার মানুষকে ছেড়ে দিতেই হয়। আর এ কথা তো ঠিক যে, নেহাৎ আমার দিদি খুব সুন্দরী। ছিলেন বলে এখানে বিয়ে ঠিক হয়েছে, নইলে আমাদের মত অতি সাধারণ ঘর থেকে মাইতি মশায় মেয়ে নিতেন কিনা সন্দেহ।
দেশেঘরে যেমন হয়, দল বেঁধে পাড়ার মেয়ে-বৌয়েরা দিদিকে এসে দেখে যেতে লাগলেন। নেমন্তন্ন করে আইবুড়ো ভাত খাওয়াবার ধুম পড়ে গেল। ভালমন্দ খেয়ে দিদি আর পারে না। এমন সময় একদিন এলেন গ্রামের কুঞ্জকামিনী দেবী—সকলের কুঞ্জমাসি। গ্রামের একেবারে প্রান্তে শ্বশুরের ভিটেয় বাস করেন, নিঃসন্তান বালবিধবা। সবাই তার মিষ্টি আর অমায়িক ব্যবহারের জন্য তাকে ভালবাসত। কুঞ্জপিসিমা বাড়িতে ঢুকে উঠোন। থেকে জ্যাঠামশাইয়ের নাম ধরে জোরে ডাক দিলেন কই গোলোক কোথায় গেলে? শুনলাম নাকি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ? তা আমরাও নেমন্তন্ন পাব তো, না কি?
ডাক শুনে মা আর জ্যাঠাইমা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় মাদুর পেতে কুঞ্জপিসিকে বসতে দিলেন। পুজো সেরে জ্যাঠামশাই এলেন, বললেন—আসুন দিদি, আজ বিকেলেই তো আপনার কাছে যাব ভেবে রেখেছি। একটু দেরি হয়ে গেল–
