আমাদের উৎকণ্ঠিত আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল বিশুয়া–আমাদের জিপের ড্রাইভার।
অসিতবাবু অবাক হয়ে বলেলেন—আরে, এ তো বিশুয়া! তুমি ছিলে কোথায়?
আমি বললাম-কী ব্যাপার বিশুয়া? কোথায় গিয়েছিলে?
বিশুয়ার চোখমুখে কেমন একটা হতচকিত ভাব। সে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু পুরোপুরি যেন এখানে নেই। গভীর ঘুম থেকে হঠাৎ কাউকে ডেকে তুললে যেমন হয়।
অসিতবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন-কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
হাতের তালু দিয়ে মুখটা একবার মুছে নিয়ে বিশুয়া বলল—ওদিকে ওই বনের মধ্যে একটু গিয়েছিলাম, ইয়ে–ঘোট বাইরে করতে। কেন বাবু, কী হয়েছে?
বললাম—এত সময় লাগল? প্রায় তিন কী চার ঘণ্টা। বেড়াচ্ছিলে নাকি?
বিশুয়ার মুখে অকৃত্রিম বিস্ময় এবং না-বোঝার ভাব ফুটে উঠল। একবার আকাশের দিকে এবং চারধারে তাকিয়ে সে বোধহয় আন্দাজ করবার চেষ্টা করল এখন কতটা বেলা, কিন্তু মেঘলা দিনে সময় বোঝা খুব কঠিন। সে বলল—আমি তত বেশিক্ষণ যাইনি বাবু, এই—পাঁচ কী সাত মিনিট। বেড়ানোর সময় আর পেলাম কোথায়?
অসিতবাবু বললেন—ঠিক আছে। যাও, তুমি খেয়ে নাও গিয়ে। পরে কথা হবে–
বিশুয়া অবাক হয়ে বলল—সে কী, এর মধ্যে রান্নাও হয়ে গিয়েছে! এই তো সবে সকাল।
আমি কথা বলতে যাচ্ছিলাম, অসিতবাবু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন–হ্যাঁ, আজকে একটু তাড়াতাড়ি রান্না হয়ে গিয়েছে। যাও তুমি–
বিশুয়া চলে যেতে আমরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম। অসিতবাবু বললেন কী বলতে যাচ্ছিলেন আপনি? তখন থামালাম বলে কিছু মনে করবেন না–
বললাম—বিশুয়ার জীবনে কোনো আশ্চর্য উপায়ে চারঘণ্টা সময় উপে গিয়েছে। ও ভাবছে এখনো বুঝি সকাল। এ আবার কী ব্যাপার?
–জানি না। কিন্তু ওর ভুল এখনই ধরিয়ে দেবার দরকার নেই। ঘাবড়ে যাবে। দুতিনদিন এই নির্জনে আমরা ক-জন মাত্র আছি, এর মধ্যে বিশুয়ার কিছু হলে খুব মুশকিল।
কিন্তু বিশুয়া অত সহজে বুঝলো না। সে সরল বটে, কিন্তু বোকা নয়। ডহরুর কাছে ঘড়ি নেই, বিশুয়া আমাদের কাছে বারবার এসে জিজ্ঞাসা করতে লাগল, এখন ক’টা বাজে। মেজকর্তা আর নির্মল কাঞ্জিলাল ব্যাপারটা শুনেছেন। যেহেতু তারাই কর্তা, আমরা শেষপর্যন্ত বিশুয়াকে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। মেজকর্তা বললেন—কী বিশুয়া, তোমার নাকি কী অসুবিধে হচ্ছে, কী ব্যাপার!
বিশুয়াকে দেখলে মনে হয় তার যেন ঘোর লেগে রয়েছে। চোখ-ভাসা-ভাসা, মুখ ঈষৎ হাঁ। প্রশ্নের উত্তরে সে বলল—কর্তা, এখন বেলা কটা হল?
—কেন, সে খোঁজে তোমার কী দরকার?
–বলুন না কর্তা। আমাকে খেতে দেওয়া হল, অথচ এত বেলা তো হবার কথা নয়–
মেজকর্তা একটুখানি ভাবলেন, বুঝলাম তিনি মনে মনে স্থির করছেন কতখানি সত্যকথা বিশুয়া একবারে নিতে পারবে। তারপর বললেন—তা বেশ বেলা হয়েছে, দুটো কী আড়াইটে তো হবেই–
বিশুয়া যেন কেমন হয়ে গেল, বলল—তা কী করে হবে কর্তা? এই তো সবে ওদিককার বনে ঢুকেছিলাম, জলধরা চলে যাবার পরে পরেই। তখন সকাল নটা। এরমধ্যেই বেলা দুটো হয়ে গেল!
–কী করে জানলে জলধর যখন গেল তখন বেলা নটা?
বিশুয়া বলল—আমি আর কী করে জানব বাবু? আপনারাই তো বলাবলি করছিলেন।
মেজকর্তা হেসে বললেন–আসলে কী হয়েছে জানো বিশুয়া, তুমি বনের মধ্যে কোথাও বসে বিশ্রাম করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তাইতে বেলা হওয়া বুঝতে পারোনি–
বিশুয়া বুদ্ধিমান না হোক, বোকা নয়। সে বলল–তাই বলছেন কর্তা? তা হবে হয়ত। কিন্তু তাহলে তো আমার খুব খিদে পেত, তাই না? খিদে পায়নি কিন্তু–
বাচ্চা ছেলেকে সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে মেজকর্তা বললেন—এক একদিন অমন হয়, কিছুতেই আর খাওয়ার ইচ্ছে হয় না। এই তো, আমারই পরশু হয়েছিল।
ভাল কর্মচারীর লক্ষণ যদি প্রশ্নহীন আজ্ঞাবহতা হয় তাহলে বিশুয়া একজন গুণী কর্মচারী। মুখের ওপর কোনো কথা না বলে সে চলে গেল বটে, কিন্তু তার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলাম তার মনে ধাঁধা রয়েই গেল।
বেলা এগুবার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার ক্রমেই চারদিক থেকে আরও ঘনিয়ে আসতে লাগল। বৃষ্টি কখনও টিটিপ করে পড়ছে। কখনও বা ঝরঝর করে বেশ এক পশলা বর্ষণ হয়ে যাচ্ছে। বিকেলের চা আমরা কাজের তাঁবুর ভেতরে বসেই খেলাম। ছোটবেলায় ইস্কুলে পড়বার সময়ে ‘আদিম পৃথিবীর ইতিহাস’ নামে একখানি বই পড়েছিলাম। পাঠ্যতালিকার বাইরেও ভালো সাহিত্য আর সাধারণ জ্ঞানের বই বাবা ডাকমারফৎ আনিয়ে আমাকে উপহার দিতেন। তাতে পড়েছিলাম সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে, যখন কৃষিকাজ, সভ্যতা বা বিজ্ঞান কিছুই ছিল না, তখন আদিম মানুষেরা দুর্যোগের দিনে গুহার মধ্যে একজায়গায় জড়াজড়ি করে বসে বাইরে প্রাকৃতিক শক্তির মাতামাতি দেখতে। আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই আমরা রক্তের গভীরে অন্ধকারের প্রতি ভয় ও বিস্ময়ের ভার বহন করে চলেছি। অসময়ে অন্ধকার হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মনের মধ্যে সেই আদিম, যুক্তিহীন ভয় ফিরে এল। মুখে হয়তো কেউই কিছু বললাম না, কিন্তু সকলেই বুঝতে পারলাম ভেতরে আমরা ভালো নেই।
সেই রাত্তিরে বড় অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখখামুখি হলাম। সেই দু’দিন দু’রাত্তিরের কথা ভাবলে এখনো গা শিউরে ওঠে, মনে হয়—যা দেখেছিলাম তা সব সত্যি তো?।
