—কেমন সুর সেটা? কোথা থেকে শিখলেন?
—শিখিনি কোথাও। সেটাই মজা। খাওয়ার আগে জঙ্গলের মধ্যে বেড়াতে গিয়ে একটু পাথরের ওপাশে কুলিরা গাইছিল শুনছিলাম। কী করে যেন একবার শুনেই সুরটা মনে থেকে গিয়েছে।
—কোথায় শুনেছেন? কোনদিকে বেড়াতে গিয়েছিলেন?
আমি আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে বললাম—ওইদিকে।
জলধর বলল—কিন্তু ওদিকে তো আজ কুলিরা কাজ করেনি।
তার দিকে তাকিয়ে বললাম—তা জানি না, কিন্তু গান আমি স্পষ্ট শুনেছি। হয়ত দু-একজন কুলি এমনি গিয়ে পড়েছিল।
জলধর কী একটা বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে মেজকর্তা দাঁড়িয়ে উঠে বললেন—বেশ, বেশ, ঠিক আছে। ওদের ভয় পেতে বারণ কর। আমি নিজে দেখছি ব্যাপারটা–
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—চলুন তো, কোথায় গান শুনেছিলেন সে জায়গাটা একবার দেখে আসি। জলধর সঙ্গে এসো, নির্মলবাবু আর অসিতবাবুও আসুন। জলধর, তুমি কুলিদের সঙ্গে আসতে বারণ কর। ওরা ভয় পেলে কাজ চালানো মুশকিল। হবে।
অরণ্যে নির্দিষ্ট কোনও পথরেখা নেই তা আগেই বলেছি। এখন আন্দাজে আন্দাজে ওঁদের নিয়ে চললাম। মিনিট সাতেক হেঁটে চিনতে পারলাম জায়গাটা। হ্যাঁ, এই তো এই। পাথরটায় হেলান দিয়ে আমি বসেছিলাম। কিন্তু সামনের সেই বড় গাছটা কই? হাতির আকারের বিশাল পাথরটাই বা গেল কোথায়?
আমার মুখের ভাব দেখে মেজকর্তা বললেন–কী হল আপনার?
বললাম-—এই পাথরটায় হেলান দিয়ে বসেছিলাম তখন। কিন্তু সামনে ওই জায়গাটায় একটা বড় পাথর আর একটা বড় গাছ ছিল, সেদুটো দেখছি না। তারই ওপাশ থেকে গান ভেসে আসছিল। ভেবেছিলাম কুলিরা গাইছে বুঝি–
জলধর বলল-না, এদিকে কুলিরা আজ কাজ করেনি।
নির্মলবাবু বললেন-কিন্তু গাছ বা পাথরের কী হল?
মেজকর্তা বললেন—আসুন তো দেখি–
নাঃ, জায়গাটায় কোনওকালে একটা গাছ দাঁড়িয়ে ছিল এমন মনে হল না। কিন্তু একটা জিনিস দেখে আমাদের সকলেরই বুক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
সেখানকার মাটিতে চওড়া, গভীর একটা দাগ। যেন খুব ভারি কোনও জিনিস সেখান দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মেজকর্তা কিছুক্ষণই সেদিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—চলুন তো, এ দাগটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে দেখি—
বেশিদূর যেতে হল না। দশ-বারো গজ দূরে জঙ্গলের আড়ালে পড়ে রয়েছে বিশাল পাথরটা। যেন এখানেই পড়ে আছে আদিকাল থেকে। [ আমার মনের ভেতর অমঙ্গলের বিষাণ বাজছে। ভাল নয়, ভালো নয়, এ জায়গা ভাল নয়। মনে মনেই ঈশ্বরকে স্মরণ করলাম, প্রার্থনা করলাম যেন বিপদ কেটে গিয়ে তাঁর আশীর্বাদ নেমে আসে। বিশ্বাস, প্রার্থনা আর আশীর্বাদের মূল্য সম্বন্ধে তারানাথের কাছে শোনা তার প্রথম জীবনের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। তার সঙ্গে আলাপের। প্রথম দিকে শোনা গল্পটা। বেশ কিছুদিন আগে শুনেছিলাম বটে, কিন্তু হঠাৎই তার সব খুঁটিনাটি মনে ভেসে উঠল। যেন ছবির মত দেখছি সব।
১৫. প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ
প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করার যেমন অনেক আশঙ্কার দিক আছে, তেমনি আবার কিছু মজার ব্যাপারও আছে। রথের দিন আমাদের অফিসে ছুটি থাকে না। কিন্তু সে বছর হঠাৎ রথে একটা হাফ-ছুটি পাওয়া গেল। কলকাতা অফিসের বড়কর্তা বাঙালী, সকালে অফিস গিয়েই শুনলাম তিনি নোটিশ জারি করেছেন আজ দুপুর দুটোয় ছুটি। যদি কেউ ইচ্ছে করে সে মেলা দেখতে যেতে পারে। মেলা দেখার উৎসাহ থাক বা না থাক, দেওয়ালের ঘড়িতে দুটোর ঘণ্টা বাজামাত্র বেরিয়ে পড়লাম।
ছোটবেলায় সবার মুখে শুনতাম প্রতিবছর রথের দিন বৃষ্টি হবেই। আজকে সকাল থেকে আকাশ মেঘলা ছিল, এখন অফিস থেকে বেরুনো মাত্র গুঁড়ি গুড়ি ছাগল তাড়ানো বৃষ্টি শুরু হল। এই আসে এই যায়। মনের আনন্দে ছাতা খুলে শেয়ালদার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। মেলাটা একবার ঢু মেরে তারপর মন্টু লেনে তারানাথের বাড়ি যাব গল্প শুনতে।
পর্বদিনে ছেলেবুড়ো সবার মনেই বোধহয় উৎসবের রঙ লাগে। দেখলাম বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে মানুষের ঢল নেমেছে মেলাতলায়। ভিড়ের চোটে গাড়িঘোড়া সব বন্ধ। কেবল হাসপাতালের গাড়ি চলাচলের জন্য ক্যাম্বেল স্কুলের সামনে একটুখানি ফাঁক। খানিকক্ষণ ধরে ফুল-ফল-নারকেলের চারা, মাটির পুতুল, রঙিন কাচের চুড়ির দোকানে অল্পবয়েসী মেয়েদের ভিড়, পি-পি বাঁশি এসব দেখে বেড়ালাম। তবু বাল্যের সেই আনন্দ আর কই? সে ছিল মিগ্ধ শ্যামছায়াচ্ছন্ন পরিচিত গ্রাম, আর এ হল ইট-কাঠ-পাথরের অচেনা শহর। ঠোঙায় করে কিছু ফুলুরি আর গরম ভাজা জিলিপি নিয়ে হাইকোর্টমুখো ট্রামে উঠে পড়লাম। মন্টু লেনের মুখে যখন নামলাম তখনও বৃষ্টি পড়ছেই। হন্ হন্ করে হেঁটে তারানাথের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে স্বয়ং তারানাথের গলা—আসছি হে, দাঁড়াও একটু–
ভেজা জুতো আর ছাতা বারান্দার কোণে রেখে আড্ডাঘরের পরিচিত চৌকিতে বসে বললাম—নিন, এতে তেলেভাজা আর জিলিপি আছে। চা বলুন একবার–
ঠোঙাটা হাতে নিয়ে তারানাথ বলল—বাঃ, এ যে দেখছি এখনো গরম! চা কিন্তু ঠিক। দশ মিনিট পরে বলব। কিশোরী এসে পড়ক, একসঙ্গে খাব—
অবাক হয়ে বললাম—কিশোরী আসছে নাকি? আপনি কী করে—
তারানাথ হাসল, বলল—এখুনি আসবে। আর সাড়ে আট মিনিট–
এক প্যাকেট পাসিং শো এনেছিলাম। প্যাকেটটা এগিয়ে দিতে তার থেকে একখানা বের করে ধরালো তারানাথ। বাড়িতে সাধারণতঃ হুঁকো খায়, কিন্তু পাসিং শো ব্র্যাণ্ডটা তার খুব প্রিয়। তার কাছে গল্প শুনতে যাবার সময় আমি আর কিশোরী মন্টু লেনের মোড় থেকে দশ পয়সা দিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে নিয়ে যাই। প্রতিবারই তারানাথ সস্নেহে স্বচ্ছ মোড়ওয়ালা চিমনির মত টুপিপরা ধূমপানরত সাহেবের ছবিসুদ্ধ কালচে লালরঙের প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে বলে—হ্যাঁ, এই হচ্ছে সিগারেট। নেশার আসল কথা হচ্ছে মৌজ, ছবির সাহেব কেমন মৌজ করে গোল গোল রিং ছাড়ছে দেখেছ?
