আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে পনেরো কী কুড়ি হাত দূরে সাদা গুড়িওয়ালা বিশাল একটা গাছ দাঁড়িয়ে। কী গাছ তা ঠিক চিনতে পারলাম না। গাছের গোড়ায় হাতির মত অতিকায় একখানা পাথর পড়ে। তার ওধারে বোধহয় কয়েকজন কুলি কাজ করতে করতে মৃদুস্বরে গান গাইছে। সম্ভবত মুণ্ডারি ভাষা, গানের কথা কিছুই ধরতে পারলাম না। কিন্তু সুরটা ভারি আশ্চর্য স্বপ্নময়, শুনলে কী যেন একটা কথা মনে পড়ে যায়। আর–
আর কেমন যেন একটু গা ছমছম করে।
এরকম অদ্ভুত সুর কোথা থেকে পেল বনচারী আদিবাসীরা? যেন পড়ন্ত বেলায় পশ্চিম আকাশে মেঘের গায়ে বদলে বদলে যাওয়া রঙের প্রতিফলন সুর হয়ে ফুটে উঠেছে, যেন কতদিন আগে ভোরবেলার স্বপ্নে এই সুরটা আমি কাকে বাঁশিতে বাজাতে শুনেছি।
যারা গান গাইছিল তারা গান গাইতে গাইতেই দূরে চলে যাচ্ছে।
চারদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ আমার মনে হল—আশ্চর্য তো, আচমকা সমস্ত শব্দ একসঙ্গে। থেমে গেল কী করে? এই তো কিছুক্ষণ আগেও কতরকম পাখি ডাকছিল, তারাই বা চুপ। করে গেল কেন? আমার একটা সিগারেট খেতে যতক্ষণ সময় লেগেছে তারই ভেতর ঘটেছে পরিবর্তনটা। বাতাসও যেন থেমে গিয়েছে। ঝড় আসার আগে প্রকৃতি এইরকম নিঃঝুম আর শান্ত হয়ে যায়। অবশ্য ঝকঝকে সূর্যের আলোয় দিনদুপুরে নিশ্চয়ই ঝড় আসবে না। হয়তো সবটাই আমার মনের বিভ্রম, হয়তো অরণ্যে মাঝে মাঝে এমন অকস্মাৎ নিস্তব্ধতা নামে।
যাই হোক, এরপর আর বেশিক্ষণ সেখানে বসে থাকতে ভাল লাগল না। তাঁবুতে ফিরে এসে দেখি উঠোনমত জায়গাটায় ফোল্ডিং টেবিল পেতে তার ওপর কনটুর ম্যাপ রেখে জোর আলোচনা চলেছে। পাশে দাঁড়িয়ে জলধর পণ্ডা কোনদিক দিয়ে কাজ আরম্ভ করলে ভাল হয়, কোথা দিয়ে কোথায় যাওয়া চলে—এসব বুঝিয়ে দিচ্ছে। অসিতবাবু তাঁবুর ভেতরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে লিখছেন। আমাকে দেখে একটু হাসলেন।
দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা হল বাইরে খোলা জায়গায়। মাটিতে বসে শালপাতায় খাওয়া, বেশ বনভোজনের মত ব্যাপার। কিন্তু এখানেও পাখি ডাকছে না, সমস্ত অঞ্চলটাতেই অদ্ভুত শ্বাসরোধী ঘেরাটোপ নামছে যেন। মেজকর্তা আর নির্মলবাবুও কিছু একটা আন্দাজ করেছেন, খেতে খেতে তারাও কেমন একটু অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছেন। ভাল কাণ্ড! ‘পাখি’রা সব গেল কোথায়? জঙ্গলে এমনিতেই পরিবেশ স্তব্ধ, কিন্তু শুধু পাখি না ডাকলে সে স্তব্ধতা যে কতখানি প্রকট হয়ে ওঠে তা বুঝলাম।
তবে আমাদের পাচকের রান্না খুব সুন্দর। গরম খিচুড়ি, সোনামুগ ডালের গন্ধ ভুরভুর করছে। তার সঙ্গে উৎকৃষ্ট গাওয়া ঘি, মুচমুচে করে ভাজা বেগুনি আর ডিমের অমলেট। লরিযাত্রা এবং জঙ্গলে বেড়ানোর শ্রমে দারুণ খিদে পেয়ে গিয়েছিল, অমৃততুল্য খাদ্য ভক্ষণ করতে করতে অন্যদিকে মন দেবার সুযোগ ছিল না।
খাওয়ার পর কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করে কর্তারা আবার কাজে বসে গেলেন। অসিতবাবুর ডায়েরি লেখা বাকি ছিল, তিনি ফের লেখা শুরু করলেন। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে পায়চারি করতে লাগলাম। ওপাশে তাঁবুগুলোর পেছনে মাটিতে গর্ত করে উনুন বানিয়ে কুলিরা রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করেছিল। তারা এখন দলবেঁধে খেতে বসেছে। তাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি।
পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থমকে থেমে গেলাম।
কী সুর গাইছি আমি? এ তো বনের ভেতর বড় পাথরটার ওপাশ থেকে ভেসে আসা সেই অদ্ভুত গান! কখন এ গান শিখলাম আমি? জীবনে গান শিখিনি, তাহলে এই জটিল আর কঠিন সুর গলায় এল কি ভাবে? তাছাড়া মাত্র একবার শুনে কোনও সুর শেখা যায় নাকি? থমকেই রইলাম।
ওপাশে কুলিদের কোলাহল হঠাৎ থেমে গিয়েছে। ওরাই বা চুপ করে গেল কেন? না, একেবারে চুপ করে গিয়েছে, এমন নয়, ওই তো কয়েকজন জলধরকে উত্তেজিত গলায় কী যেন বোঝাচ্ছে। কী বলছে ওরা?
মেজকর্তা একটু বিরক্ত হয়ে ডাকলেন—জলধর! কী হয়েছে? কী বলছে ওরা?
জলধর ডাক শুনে এগিয়ে এসে বলল—কিছু না আঁইজ্ঞা, ওরা সব জংলি লোক, কী জন্য যেন ভয় পেয়েছে। আমি কথা বলে সব ঠিক করে দিচ্ছি—
মেজকর্তা বললেন-ভয় পেয়েছে? ডাকো তো ওদের–
আমাদের কথাবার্তা শুনে অসিতবাবুও তাবু থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তার মুখে। সপ্রশ্ন বিস্ময়। জলধর তিন-চারজন কুলিকে সঙ্গে নিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল। কুলিদের। মুখ শুকিয়ে গিয়েছে, তাদের চেহারায় ভয়ের চিহ্ন। মেজকর্তা জিজ্ঞাসা করলেন কী হয়েছে তোমাদের? কী বলছিলে জলধরকে?
কুলিদের মধ্যে নেতাগোছের লোকটি দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলল। মেজকর্তা
বললেন—-ও কী বলছে জলধর?
জলধর বলল—ও বলছে এখানে পাসাং মারার ডাক শোনা গিয়েছে, এখানে কোম্পানি কাজ করতে পারবে না।
—পাসাং মারা আবার কী? কীভাবে কখন সে ডাকল?
জলধর প্রশ্নটা কুলি সর্দারকে বুঝিয়ে দিতে সে আবার দ্রুতবেগে ঝড়ের মত কী বলে গেল। জলধর এদিকে ফিরে বলল—ও বলচে পাসাং মারা খুব খারাপ অপদেবতা, জঙ্গলের মধ্যে যেখানে সে থাকে সেখানে বাইরের কাউকে সে ঢুকতে দেয় না। অমঙ্গল আর মৃত্যুর সুরে সে গান গায়। একটু আগে নাকি এখানে কেউ সেই সুরটা গাইছিল। তাই ওরা ভয় পেয়েছে—
মেজকর্তা অবাক হয়ে বললেন—এখানে? এখানে কেউ গান গাইছিল বটে। কে সে?
গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম—আমি একটা সুর ভাঁজছিলাম ঠিকই, সেটাই হয়তো ওরা শুনতে পেয়েছে। সুরটা সত্যিই একটু কেমন অদ্ভুত মত–
