যুদি না পারচ?
না পারলে আপনেরা বিচার করবেন?
কী বিচার করুম?
যা আপনেগ মনে লয়।
আউয়াল মানুষটা আমুদে। পবনার কথায় হঠাৎ ভারী ফূর্তি হয় তার! যুদি তুই এক বহায় আড়াই সের আমিত্তি খাইতে পারচ, আমিত্তির দাম তো আমি দিমুঐ আবার কাইল থনে আমার দোকানে তর খাওন-থাকন ফিরি। যতদিন তুই বাঁচবি। আর যুদি না পারচ তাইলে এই বাজার থনে আইজঐ তরে বাইর কইরা দিমু। কুনুদিন এহেনে আর আইতে পারবি না। ক রাজি আছচ নি?
পবনা ফূর্তিতে গর্দান কাৎ করে। ফুরুক করে মুখের ভেতর লালা টেনে নেয় আবার। এক বহায় তো খামুঐ। এক ঢোকও পানি খামু না। উড়ুমও না।
লতিফ এসব কথা খেয়াল করছিল না। আধ মণ মিষ্টির অর্ডার, ষাট-সত্তর টাকার কাজ। ঐ একটা চিন্তায়ই সে মগ্ন। দিন বুঝি তার বদলায়।
আউয়াল বলল, হুনছনি লতিফ?
লতিফ আনমনে বলল, কী? পবনা যদি এক বহায় আড়াই সের আমিত্তি খাইতে পারে তয় আমিত্তির দাম তো আমি দিমু। আবার কাইল থনে আমার দোকানে অর থাকন খাওনও ফিরি।
আউয়াল মৃদু হেসে বলল, কী কচ পবনা?
হাচাঐ কই কত্তা। দিয়া দেহেন না।
আউয়ালের কেন যে এত উৎসাহ। বলল, খাড়া, মানুষজন ডাক দেই। বলেই চেঁচিয়ে আশপাশের দোকানিদের ডাকে। ও মিয়ারা, আহেন ইদিকে। কাম আছে।
শুনে লতিফ হাসে। আর ভেতরে ভেতরে খুশি হয়। আরো আড়াই সের আমৃত্তি বুঝি বিক্রি হয়ে গেল তার। আরো দশ বারো টাকার বুজি কাজ হয়।
আউয়ালের হাঁক ডাকে দুতিনজন আজার দোকানদার এসে জোটে। কী অইল আউয়াল মিয়া? আউয়াল মহা ফূর্তিতে ঘটনাটা বলে, শুনে কাশেম বলল কী কচ পবনা? হাচাঐ পারবি? নাইলে বুজিচ বাজার ছাড়তে অইব। এহেনে আর কুনুদিন আইতে পারবি না।
পবনা খ্যাক খ্যাক করে হাসে। কত্তারা আমি কি আপনেগ লগে মশকরা করতাছি নি? এবার কথা বলে লতিফ। বুইজ্জা দৈক পবনা, আড়াই সের আমিত্তি এক বহায় খাওন। খেলা কতা না।
পবনা বলল, আবার বোজ?
বুজছি বুজছি, দিয়া দেহেন।
এবার উত্তেজনা বেড়ে যায় আউয়ালের। লতিফ। টেকা আমি দিমু।
লতিফ তো মহাখুশি। তবুও মুখে কিছু একটা বলতে যাবে, তাকে থামায় কাশেম। তোমার কী লতিপ বাই, দেও। ইট্টু কষ্ট কইরা আড়াই সের আমিত্তি বেশি বানাইবা! দাঁড়িপাল্লা হাতে নিয়ে লতিফ বলল, আমার অসুবিদা নাই। মাল-সামান আছে। আদা ঘণ্টার খাটনি। আমি চিন্তা করি পাগলার লেইগা।
পবনা বলল, আমার লেইগা আপনের কুন চিন্তা নাই কত্তা। আপনে আমিত্তি বানান আর দেহেন, পাগলায় কেমনে বেবাকটি খায়।
দু পাল্লায় সোয়াসের করে গরম আমৃত্তি মেপে, একটা মাটির খাদায় ঢেলে পবনাকে দেয় লতিফ। তারপর হাসে। অহনও টাইম আছে পবনা বুইজ্জা দেক।
পবনার তখন দিকবিদিকের খেয়াল নেই। হাতের সামনে গরমা গরম আড়াইসের আমৃত্তি। সবগুলোই তার। একলা খাবে। কতকালের সাধ। খাওয়ার সাধ পূরণের যে কী সুখ, পবনা ছাড়া পৃথিবীর আর কে তা এই মুহূর্তে জানে!
প্রথম আমৃত্তিটা মুখে দিয়ে পবনা বলল, আহা কী সোয়াদ গো কত্তা। আইজ রাইতে আপনের দোকানে জ্বিনপরি আইবঐ।
এ কথায় লতিফ একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। বাপের মুখে শুনেছিল, খাঁটি মিষ্টি নিতে পরিস্তান থেকে জ্বিনপরি আসে গভীর রাতে। দোকানের বেবাক মিষ্টি নিয়ে যায়। যত হাঁড়ি মিষ্টি নেয় টাকা দেয় তত হাঁড়ি। ভাগ্যকুলের কালচাঁদ একরাতে সাত হাঁড়ি টাকা পেয়েছিল। সেই টাকায় কালচাঁদ এখন মহা ধনী। কলিকাতায় শয়ে শয়ে মিষ্টির দোকান তার। বাড়ি, গাড়ি।
লতিফ ভাবে, আইজ রাতে যদি হাচাঐ জ্বিনপরি আহে আমার দোকানে! যুদি আধামণ আমিত্তি লইয়া আধামণ টাকা দেয়! ইস তাইলে আর কথা নাই। এই দিন থাকব না। বদলাইয়া যাইব।
গপাগপ দশটা আমৃত্তি খেয়ে পবনা বলল, বেশি খাওন সামনে থাকলে আমার আবার ইট্টু প্যাচাল পারতে অয়, বুজলেননি কত্তারা। আপনেরা আইজ্ঞা করলে কই।
আউয়াল বিড়ি ধরিয়ে বলল, ক। তয় বুজিচ, বেবাক কইলাম খাইতে অইব। ওকাল পাকাল করতে পারবি না।
পবনা হাসে। দেহেন না কত্তা কেমনে খাই।
তারপর আর একটা আমৃত্তি মুখে দেয়। একবার আমার বাপে গেছে চরে ডাকাতি করতে। আমি তহন পোলাপান। সাত-আষ্ট বচ্ছর বয়েস। আমাগ বাড়ি আছিল কোরাটি গেরামে। পদ্মার পারে। অহন আর কোরাটির নামগন্ধ নাই। পদ্মায় ভাইঙ্গা গেছে। তয় আমি করতাম কী, হারাদিন গাঙপার পইরা থাকতাম। মায় আমারে গাঙপার থনে দইরা আইন্না বাতপানি খাওয়ায়।
পবনা আর একটি আমৃত্তি মুখে দেয়।
ততক্ষণে আরো দুচারজন দোকানদার এসে ভিড় করছে লতিফের দোকানের সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বেঞ্চে বসে। সবাই হা করে দেখছে পবনাকে। পবনার পাশে কুত্তাটা। আমৃত্তির লোভ তারও আছে। এর মধ্যেই বার দুয়েক ঘেউ দিয়ে ফেলেছে সে। কী ঠাকুর, আমারে ইট্টু দিবা না! নাকি একলা একলাই খাইবা! আ? পবনা খেয়াল করেনি। সুখের সময় কে কার কথা মনে রাখে!
আমৃত্তি চিবাতে চিবাতে পবনা বলল, বাজানে গেছে চরে ডাকাতি করতে। সাত দিন চইলা যায়, ফিরে না। কুনো সম্বাদ নাই। গাঙপার আটতে আটতে আমার খালি বাজানের কথা মনে অয়। কাসার বাসনে বাত বাইরা দিলে মারে আমি জিগাই, বাজানে আহে না ক্যা মা?
মায় কয়, আইব বড়ো কামে গেছে।
তয় বাজানে কুনওদিন ডাকাতি করতে গিয়া দুই দিনের বেশি দেরি করত না। হেই কথা ভাইবা মনডা কেমুন করে আমার। অইলে অইবো কি, পোলাপান মানুষ, মারে বেশি কতা জিগাইতে পারি না। রাইত-বিরাইত জাইগা হুনি আন্দার গরে মায় জানি। কার লগে কতাবার্তা কয়। বিয়ানে কেঐরে দেহি না। মারে জিগাইলে কয়, আমি গুমের তালে কতা কই।
