মেয়েটি বলল, কি ভাবছ?
ভাবছি শহরে গিয়ে বন্ধুর বাসায় ওঠব। কিন্তু কতদিন একজনের ঘাড়ে থাকা যায়। এই বিদ্যেয় চাকরি জুটবে না। কেমন করে চলব তোমাকে নিয়ে!
ওসব এখন ভাবতে হবে না।
না ভেবে উপায় কি বল। ঝোঁকের মাথায় তোমাকে নিয়ে পালালাম, শেষটা যদি সামলাতে না পারি।
শেষটা মানে!
যদি তোমাকে ঠিকমতো খাওয়াতে-পরাতে না পারি।
সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
কেমন করে হবে?
আমি আমার সব গয়নাগাটি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বেশকিছু টাকাও আছে। ওই টাকা আর গয়না বিক্রি করে মোটামুটি ভালো একটা টাকা হবে তোমার। তোমার বন্ধুর বাসায় মাসখানেক থাকতে পারব না আমরা?
তা পারব।
ওই একমাসের মধ্যে তুমি সব গোছাবে।
কি গোছাব?
গয়না বেচার টাকা, আমার নগদ টাকা একত্র করে তুমি একটা ছোটখাটো দোকান করবে। তারপর একটা বাসা ভাড়া করে আমরা সেই বাসায় ওঠে যাব। আমরা কোনও পাপ করিনি সুতরাং আল্লাহ আমাদের সহায় হবে। দেখো তুমি খুব উন্নতি করবে। প্রচণ্ড আবেগে ছেলেটি কোনও কথা বলতে পারে না। চোখে জল আসে তার। মেয়েটি তখন আস্তেধীরে ঘুমিয়ে পড়ছিল।
.
মাথার ওপর দাঁড়িয়ে প্রেম-ভালোবাসার একটা মনোরম দৃশ্য দেখে বনের গাছপালা। বনফুল ঝোপটার আড়ালে, ছায়ায় বসে আছে একজন যুবা পুরুষ। আর তার কোলে মাথা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে যুবতী এক নারী। একপাশে রাখা আছে বেতের স্যুটকেস। সামনে অবহেলায় পড়ে আছে খাদ্যদ্রব্য বাঁধার ন্যাকড়াটা, জলের খালি বোতল। বহুদূর থেকে এসেছে তারা, বহুদূর যাবে। দেখে গাছপালাদের বলতে ইচ্ছে করে, সুখে থাকো। বাছারা, সুখে থাকো। কিন্তু গাছপালারা কথা বলতে পারে না। ঈশ্বর তাদের কথা বলতে বারণ করেছেন।
মন খারাপ করে অন্যদিকে মুখ ফেরায় গাছেরা। তখন দেখতে পায়, দীর্ঘকায় বুড়ো মানুষটা ক্লান্ত হয়ে জিরাতে বসেছে একটা ঝোপের মিঠেল ছায়ায়। দেখে চমকে ওঠে তারা। বিষধর প্রাচীন সাপটা যে ওখানেই নিদ্রামগ্ন। শব্দ পেলেই, শরীরে স্পর্শ পেলেই মাথায় রাগ চড়ে যাবে তার, দংশাবে।
গাছপালাদের ইচ্ছে করে মানুষটিকে ওখান থেকে সরিয়ে আনে। কিন্তু তারা চলাফেরা করতে পারে না। ঈশ্বর তাদের চলাফেরা করতে বারণ করেছেন। ভয়ে ঝিম মেরে থাকে বনের সব গাছপালা।
.
অনেকক্ষণ হাঁটাচলার ফলে ভারী একটা ক্লান্তি বোধ করে বুড়ো মানুষটা। ঝোপের আড়ালে বসে হাত পা মেলে দেয় সে। তখনি ডানহাতে শীতল একটা ছোঁয়া পায়। কচুরিপানা ভর্তি পুকুরের জল শীতকালে যেমন হিম হয়, স্পর্শটা সেরকম। চমকে হাতটা টেনে নেয় সে। তার আগেই সুখন্দ্রিায় বিপ্ন দেখে ফুঁসে ওঠেছে সাপটা। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেছে তার। মাথায় রাগ চড়ে গেছে। পাতার মতো ফনা তুলে মুহূর্তেই রাগটা ঝেড়ে দিল সে।
তারপর বুড়ো মানুষটার দীর্ঘ চিৎকারে কেঁপে ওঠে বনভূমি। দুঃখে নীরব হয়ে থাকে অসহায় গাছপালা। ভয় পেয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় সাপটা। বসন্তকালীন মোলায়েম বাতাসটা মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। একটাও পাতা নড়ে না। কোথাও রোদ থাকে স্থির হয়ে। ফুল কোন গন্ধ দেয় না। মধুপোকা, প্রজাপতি ওড়ে না। ঘাসবনের পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ স্তব্ধ হয়ে যায়। যুবাপুরুষের কোলে শুয়ে থাকা যুবতীটি ভয় পেয়ে লাফিয়ে ওঠে। ছেলেটি একহাতে স্যুটকেস অন্য হাতে মেয়েটির একটা হাত ধরে দৌড়াতে শুরু করে।
নিরীহ গাছপালা নীরব দর্শক হয়ে জগৎসংসারের এইসব খেলা দেখে।
গাহে অচিন পাখি
হাওয়ায় কী একটা ভাজা পোড়ার গন্ধ ওঠে। ভারী মনোহর। সেই গন্ধে মাছচালার ধুলোবালি থেকে মুখ তোলে বাজারের নেড়িকুত্তাটা। তারপর প্রথমেই তার প্রভু পবন ঠাকুরকে খোঁজে। নেই। গন্ধ আর প্রভুর টানে কুত্তাটা তারপর ওঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে পুরোনকালের রোঁয়া ওঠা মদ্দা শরীরখান টানা দেয়। তখন দেখে দূরে খাদ্যি খাওয়ার দোকানটার সামনে প্রভু বসে আছে। গন্ধটাও সেদিক থেকেই আসছে।
কুত্তাটা তারপর কিছু না ভেবে গন্ধের দিকে, প্রভুর দিকে ছুটে যায়।
.
আমার বাপে আছিল ডাকাইত। বিরামপুরের বুড়া মাইনষের মুখে হোনবেন কেষ্ট ঠাকুরের নাম ডাক। মাইনষে কইত কেষ্টা ডাকাইত। যাগ বয়েস পাঁচ কুড়ি ছয় কুড়ি। আমার বাপের নামে হেই আমলে গেরস্তরা রাইত্রে গুমাইত না। রাইত্রে বিচনায় হুইয়া পোলাপান কানলে বউ-ঝিরা কইত, কেষ্টা আইল। কেষ্টার নামে পোলাপানেও ডরাইত। কান্দন থামাইত, গুমাইয়া পড়ত। গেরামে গেরামে মাইনষে চকি দিত। দল বাইন্দা। কেষ্টারে ঠেকাও। অইলে অইব কী, কাম অইত না। বাপে আমার ঠিকই মাইনষের মাতায় বাড়ি মারত। সব্বশান্ত করত। দিবেননি কত্তা একখান আমিত্তি? লতিফ ময়রা। খুব মনোযোগ দিয়ে রসে ডোবা আমৃত্তি তুলে মাটির ঝুঁজরে রাখছিল। ঝাজরের নিচে। বসানো একখান বালতি। আমৃত্তির রস চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে তাতে।
লতিফ বসে আছে মাটি থেকে হাতখানেক উঁচু একটা চৌকির ওপর। তার ডান দিকে দোকানের ভেতর মিষ্টির আলমারি। ওপরের দুটো রেকে সাজানো চমচম, বালুসাই কালোজাম, সন্দেশ, আমৃত্তি ও গজা। আর নিচের রেকে পেতলের বিশাল গামলায় রসে ডোবা রসগোল্লা, লালমোহন ছানার আমৃত্তি। সারা দিনে সতের বার আলমারির কাঁচ মোছে লতিফ। পদ্মার জলের মতো ঘোলা কাঁচ। একটার এক কোণা ভাঙ্গা। আর দুটোতে হিজিবিজি ফাটল। হলে হবে কী, কাঁচ পাল্টায় না লতিফ। অযথা পেচ্ছাব পায়খানার মতো কিছু পয়সা বেরিয়ে যাবে। দরকার কী! ভাঙ্গা আলমারি কি কম দেয়!
