আমার রিকশা তখন দ্রুত ভিড় পেরিয়ে যাচ্ছে।
.
আশরাফ মিয়া বসেছিল বটতলায়। এখন রোদ হেলে গেছে বটগাছের পশ্চিমে। তলায় পড়েছে দীর্ঘ ছায়া। গাছে ছিল রাজ্যের কাক। সকাল থেকে টানা চিৎকার করছিল। এখন ক্লান্তিতে ঝিমুচ্ছে সব। চারদিকের পৃথিবী চুপচাপ হয়ে আসছে। এবার গরমটা পড়েছে খুব।
আশরাফ মিয়ার ঝিমুনি ধরছিল। এক জায়গায় তিন ঘণ্টা বসে। ঝিমুনি তো ধরবেই। তা ছাড়া আশরাফ মিয়া ওঠে খুব সকালে। প্রায় রাত থাকতে। অনেক দিনের অভ্যেস। ভোররাতে শুলেও ঘুম ভেঙে যাবে ঠিক আযানের সঙ্গে সঙ্গে। তারপর ওঠে প্রস্রাব ও পায়খানা, হাতমুখ ধোয়া, নাশতা করা। এসব করতে করতেও বেলা ওঠে না। তবুও আশরাফ মিয়া বারান্দা থেকে ত্রিশ বছরের সাইকেলটা নিয়ে বেরোয়। বেরিয়ে কত জায়গায় যে যায়। কত রকমের কাজ থাকে মানুষটার। ম্যালা লোকজনের কাছে টাকা পয়সা পাওনা, ম্যালা লোকজনকে আগাম টাকা দিতে হয়। আশরাফের পার্টিরা সব কন্ট্রাক্টর। কিছু আছে দোকানদার, সিমেন্ট রডের কারবার। আবার কিছু আছে দালাল। আশরাফের কাছ থেকে মাল কিনে অল্প লাভে বেহাত করে। এইসব লোকজনের কাছে। সকাল থেকেই যাতায়াত শুরু হয় আশরাফের। পুরোনো সাইকেলটা আস্তে ধীরে, মাঝ বয়েসী শরীরে টেনে টেনে লোকজনের কাছে যায়। দুধারের বুক পকেটে জাম থাকে টাকা। আশরাফের ভাগ্য বটে, যেখানে হাত দেয় সেখান থেকেই ওঠে আসে কড়কড়ে নোট।
আশরাফ এত টাকা দিয়ে কী করে?
সংসারে বউটা ছাড়া আর কেউ নেই আশরাফের। বিয়ে করেছে পঁচিশ বছর, ছেলেপান হয়নি। বাপের কালের বস্তিবাড়ি শিংটোলায়। একটা ঘরে আশরাফ আর আশরাফের বউ। বাকি চৌদ্দ পনেরটা ঘরে ভাড়াটে। সব রিকশাঅলা পান দোকানদার ওস্তাগার লেবার ধরনের মানুষ। মাসকাবারি পয়সা। ভাড়ার পয়সায়ই চলে যায় আশরাফের। তবুও দালালিটা সে করে। ছেলেপান নেই, কার জন্যে করে কে জানে!
সকাল থেকে আজ আশরাফের মনটা খারাপ হয়েছিল। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ফরাশগঞ্জের এক পার্টিকে দিয়েছিল দশ হাজার টাকা। গতকাল মাল দেবার কথা। সারাদিন বসে থেকে লোকটার কাল পাত্তা পাওয়া গেল না। শালা টাকাটা নিয়ে ভাগল! বলা যায় না, দশ হাজার টাকার ব্যাপার। এই চিন্তায় রাতে ঘুম আসেনি। কারবারে নামা ইস্তক লোকসান করেনি আশরাফ। ভারি হিসেবি মানুষ। হিসেবি মানুষ না হলে এত টাকা-পয়সার মালিক হতে পারত না। বাপে তো টাকা-পয়সা কিছু দিয়ে যায়নি। শিখিয়েছিল ওস্তাগারি। মরে যাওয়ার আগে বাড়িটা আর বউটা দিয়ে গেল। তারপর পঁচিশ ত্রিশ বছর। বউটার ছেলেপান হল না। আশরাফের টাকা-পয়সার খরচা বাড়ল না। এ জন্য আশরাফের কী কোন গোপন দুঃখ আছে।
প্রথম কিছুকাল ওস্তাগারি করেছে আশরাফ। বাড়িভাড়ার পয়সা তখন ছিল কম। তবুও দুজন মানুষের সংসার চলে যেত ভালোই। এ সবের ফাঁকে ফাঁকেও আশরাফ টাকা পয়সা কিছু জমিয়ে ফেলল। তারপর শুরু করল দালালি। প্রথম কিছুদিন পার্টনার ছিল ফরাশগঞ্জের এক সিমেন্ট দোকানদার। লোকটা লাইনটা বুঝত। বছর দুয়েক করার পর আশরাফ নিজেও লাইনটা বুঝে গেল। তারপর পার্টনারশিপ দিল ছেড়ে।
সেই শুরু। দিনে দিনে পয়সা আসতে লাগল। লস নেই, ব্যবসায় লস নেই আশরাফের। টাকা লাগাতেই টাকা। কিন্তু এত দিয়ে আশরাফ কী করবে। তার কোন ছেলেপান নেই। খাবে কে? বউটা মরল, আশরাফ মরলে সব তো কাক চিলে খাবে।
তো আশরাফের ভিতরে ভিতরে একটা ইচ্ছে আছে। বস্তিটা তুলে চারতলা একটা বাড়ি বানাবে। ওস্তাগারিটা তো জানেই। নিজেই করবে কাজটা। তারপর মরে যাবার আগে বউর গলা ধরে, ছেলেপানের দুঃখে একদিন খুব কাঁদবে।
কিন্তু চারতলা বিল্ডিং তুলতে কত টাকা লাগে আশরাফ জানে না। আন্দাজ করে আরও বছর পাঁচেক দালালিটা করতে হবে। তারপর! কিন্তু পাঁচ বছর আশরাফ বাঁচবে তো। বুকের ভেতর সময়ে অসময়ে আজকাল কেমন করে। রাতেরবেলা ঘুম হয় না। সাইকেল চালিয়ে শিংটোলা থেকে ফরাশগঞ্জ যেতে ক্লান্তি লাগে। শুনেছে মরার আগে মানুষের এরকম হয়। তাহলে আশরাফ কি আর বেশিদিন বাঁচবে না। শেষ ইচ্ছেটা কী—এইট্টুকু ভাবতে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। ফরাশগঞ্জের দোকানদারটার কথা মনে পড়ে। দশ হাজার টাকা আগাম দিয়েছে। মাল দেয়ার কথা ছিল কাল। দেয়নি। দিলে হাজার আড়াই টাকা লাভ। পার্টিও ঠিক করে রেখেছে আশরাফ। কিন্তু লোকটাকে কাল পাওয়া যায়নি। হায় হায়, দশ হাজার টাকা না মেরে দেয় শালা। তাহলে সময় যে আর বেড়ে যাবে। পাঁচ বছরে কুলাবে না।
আজ একবার লোকটার কাছে যাবে, আশরাফ কাল রাতেই ভেবে রেখেছে। কিন্তু সকালে ওঠেই মনে হয়েছে আজ মঙ্গলবার। মিউনিসিপালিটির গোডাউন থেকে আজ সিমেন্ট সাপ্লাই দেবে। দুএকটা পার্টি ধরতে পারলে টাকা-পয়সার কাজ হবে। সকালবেলা তাই আশরাফ অন্য কাজে না গিয়ে এখানে চলে এসেছে। পার্টি অবশ্য একটা সকালবেলা এসেই জুটিয়েছে আশরাফ। আরিফ কন্ট্রাক্টর। মাল পাবে চল্লিশ ব্যাগ, বিশটাই ছেড়ে দেবে। খরচাপাতি বাদ দিয়ে আশরাফের কাজ হবে টাকা পঞ্চাশেকের। তার ওপর রহিম বলেছে এক আধটা পার্টি ধরে দেবে। কিন্তু হারামজাদার পাত্তা নেই। তিন ঘণ্টা আগে গেছে ঠেলাগাড়ি আনতে। সঙ্গে নিয়ে গেছে আশরাফের সাইকেলটা। এত দেরি করছে কেন!
