—আমিও সেটাই ভাবছি। অম্বল হতে পারে। কী দুধ খাইয়েছিলেন দিদি?
—কৌটোর। ওর বাবা বাড়িতে নেই, আমি তো ভয়ে আধমরা হয়ে আছি। বাড়িতে একা থাকলে কার না ভয় করে!
অনেকক্ষণ পরে ছেলেটা ঘুমোল। সুভদ্রা বলল—আপনি বিছানা করে দিন, আমি শুইয়ে দিচ্ছি। বাচ্চাদের কিছু হলেই জ্বালা, মুখে বলতে পারে না।
কুন্তলা আপ্লুতস্বরে বলল—ছেলেটা আগের জন্মে তোমার কে ছিল কে জান! কেবল তোমাকেই চিনেছে, আমি শুধু গর্ভেই ধরেছি।
সুভদ্রা চুপ করে আছে।
–এবার তোমার কোলে একটা আসুক সুভদ্রা। অনেকদিন তো হল, এমন কোলশূন্য মানায় না।
বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুভদ্রা-ভগবান তো সে ভাগ্য দেননি দিদি।
—ছিঃ, অমন কথা বলতে নেই। মা ষষ্ঠীকে ডাকো, ঠিকই হবে। ডাক্তার টাক্তার দেখাচ্ছে না কেন?
—দেখিয়েও কোনও লাভ নেই। আনমনে বলল সুভদ্রা।
—তাই কি হয়! এখন কতরকম চিকিৎসা বেরিয়েছে, কাগজে পড়ো না!
–বললাম তো দিদি, কোনও চিকিৎসাই আমার কিছু করতে পারবে না। সাধ্য মানুষেরও নেই, ভগবানেরও নেই।
এবার কুন্তলার অবাক হওয়ার পালা–তার মানে?
সুভদ্রা যেন হঠাৎ দমে গেল, তারপর স্বীকারোক্তি করার মতো বলে ফেলে লোকটা আসলে
একমুহূর্তের জন্যে ঘরের মধ্যে থমকানো পরিবেশ। কুন্তলার মাথা ঘুরছে, নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। শুধু কোনওরকমে বলল—এতদিন ধরে…
—সেই ফুলশয্যার রাত্তিরেই আমি জেনেছি, তবু আমরা সুখী, বিশ্বাস করুন। সুভদ্রার গলার স্বর ভীষণ স্পষ্ট আর ধারালো, কোনওরকম আড়ষ্টতা নেই সেখানে। কুন্তলার লু ভাবতে অবাক লাগছিল। তার মনে হচ্ছিল, সুভদ্রা যেন ভাসছে। তীব্র কামনার প্লাবনে সেই ভরা যুবতী এখন নিঃশব্দে ভেসে বেড়াচ্ছে।
কুয়োতলার কাব্য – অশোককুমার কুণ্ডু
বর্ষা এসেছে তিলুর উঠোনে। চোইত বোশেখের পোড়ামাটিতে আজই প্রথম বর্ষার এক ঝট। গন্ধ উঠেছিলো মাটির! আকাশটা তেমন জমেনি। প্রথম বর্ষা তো, কিছুটা কুমারী মেয়ের মন, দাঁড়ালো না। এসেছিলো, চলে গেল, উঁকি দিলো, সবটা দেখা গেল না।
বুও দুকুঠরী ঘরের পশ্চিম মটকার কোণের আকাশ যেন ধান সিজোনো হাঁড়ির কালো মুখ, মিশকালো। যেন মরা বিকেলে আবার নামবে। এই এলো, আবার গোটাও পাততাড়ি, গোয়ালের গরু সামলাও, খামার থেকে তুলে আনো বন্দিনী তিলের শুটি, মাকাই ও সরষের বীজ, রোদ খেতে দেওয়া ঋতুমতী গমের বীজদের। হাওয়া বইলো দমকা মেরে। গাছের ডালে ডালে পাতায় পাতায় গা ঘষাঘষি, ঠেকাঠেকি, অনেকদিন প্র যেন প্রাণখোলা প্রতিবেশী।
এই কদিন দেখতে দেখতে শেষ আষাঢ়ের আরও পাঁচটা দিন গেল। তিলুর ক্যালেণ্ডার বলতে একটি তালপাতা। সে তালপাতায় আছে গোয়ালার গুণ-ছুঁচের হিসাবে দাগ। পাচদিন হলো মনে মনে হিসেব করলো তিলু, কেননা এই পাঁচদিন হয়েছে, কালো গাই-গরুটা ডাকছে। মাঠ দেখানোর সময়। এ সময় এই প্রথম ডাক পার হলে বড় মুশকিল, অথচ এই গরুটা তিলুর বাপের বাড়ির সামগ্রী। বিয়ের পরই দেওয়া, তিলুর বাচ্চা দুধ খাবে।
এই পাঁচদিন তিলুর ভিতরে কোথাও মেঘ জমেছে? কোথাও কি বর্ষার পায়চারি কিংবা কোথাও বেড়ার পাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা আগাম মেহদী ফুলের গন্ধ? তিলু সামান্য নাড়া খেয়েছে, ঐ যে কথায় বলে, আগুনের কাছে ঘি থাকলে গলবেই গলবে।
দুপুরে প্রথম জলের আগেই হুটোপাটি করে সংসারের জিনিসপত্র ভোলাতুলির সময় পেজালি বসেছিলো উঠোনে, ভাতঘুম থেকে ওঠার পর তিলু দেখলো সেইসব পেঁজালিগুলি মুছে গেছে প্রায়। গাই গরুটাকে দেখতে ভূষণ আসবে, আজকে চারদিনের ওষুধ শেষ হয়েছে। গরুটাও দস্যি, বলিহারি যাও! খোঁটার দড়ি ছিঁড়ে লড়াই করে ডাইরে শিং ভেঙে, ও একবারে রক্তের কন্যা। তারপর এই ডাক। বিপদের উপর আরও এক গেরো। এই সব ঘরগেরোস্তো, শ্বশুরবাড়ি, কাঠ কয়লার গনগনে আগুনের মত জা মায়া, আর তার বড় ছেলে, তিলুর বড় ন্যাওটা। এই সব পাঁচমিশেলি ভাবনায় তিলুর মন আজ আনচান। ভূষণ আসবে বিকেলে। ভূষণ এসেছিলো ফিরে লক্ষ্মীবার। সেই মানুষটার কোনো খবর নাই বহুদিন।
খিড়কির পশ্চিমপাড়ে তালগাছ একপায়ে সব কথায় সাক্ষী। পাশের যে পাতাটা ঝুলে পড়েছে সেটায় বাবুই পাখিদের দিনের শেষবেলাকার আলোয় কিছু মজলিশি নালিশ। সেদিকে তাকাল তিলু। ভূষণ কবরেজ আসছে না কেন? শাশুড়ী গেছে পাড়া বেড়াতে। এখুনি এই নাগাদ সন্ধ্যের ফিরবে। ঐ মানুষটার কথার ভাষ্যি নেই। গাছপালার শিকড়কড় খুঁজতে খুঁজতে মাথার মধ্যে কথা শিকড় হয়ে গেছে না হলে আজ এত দেরি? জানে ধ্ব, অথচ কী করছে কে জানে, হয়তো ভুলে মেরে দিয়েছে। নয়তো অন্য গায়ে কোনো খেত আকন্দের ফুলের সন্ধান পেয়েছে। লাছদুয়ারে এসে মুখ বাড়াল তিলু।
ভাঁড়ার ঘরের পাশে ঝিটচালের পাঁচিল অনেকটা পড়ে গেছে। ওখানে এই বর্ষার গন্ধে গজাবে কিছু লতাগুল্ম, বর্ষার স্পর্শে শিহরিত হবে। আর ওদিকে পুকুরের পাড়ে অযত্নে বেড়ে ওঠা বৈচি গাছে সবুজ ফল ধরেছে। এ কদিনে তিলুর মধ্যে বেড়ে উঠেছে একটি গাছ নিতান্তই অবহেলায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো শাশুড়ীর ঘোড় দৌড়। বেড়ার পাশে ঝিঙে ফুলের হলুদ রঙ। শাশুড়ী বেড়ার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললো, ঝিঙে ফুলে বেলা মরলো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে না দেখছো, জল আনতে আমি এই বুড়ো বয়সে যাই, ঠ্যাঙ হাত ছড়িয়ে ভোগ করো তোমরা, আমি মরে গেলে। তিলু নীরব। সরব হয় অন্তরের অন্তরীক্ষে। মাটির দেওয়ালে লাগানো ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখে তিলু।
