ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুর মাথায় নিয়ে মন্মথ বাড়িতে ঢুকল। এখন শুখার মরশুম, বাতাসে আগুনের হলকা। তেষ্টায় গলা ফাটছে মন্মথর। জল দেওয়ার একান্ত মানুষটি ঘরে নেই। সুভদ্রা ফিরল একটু পরে, মন্মথকে বসে থাকতে দেখে বিড়ম্বিত গলায় জিজ্ঞেস করল কখন এলে?
–এসেছি তো অনেকক্ষণ। এক গেলাস জল—তাও হাতের কাছে পাই না।
—ঘরে কি জলের আকাল? নিয়ে খেলেই তো পারতে!
—তার চেয়ে বলো, রান্নাটাও না হয় নিজেই করে খাই। আর তুমি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াও। এমন সংসারের মাথায় কাটা মারি।
—চেঁচিও না তো! আমি কখন পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে বেড়ালাম? দিনান্তে একবারও বুঝি বাইরে যাওয়ার জো নেই! এই সবে একবার কুন্তলাদির বাড়িতে পা দিয়েছি কী দিইনি, এদিকে মহাপুরুষের রাগ মাথায় উঠেছে।
সুভদ্রার দেওয়া জল শেষ করে মন্মথ আগুন-চোখে তাকাল—ফের তুমি ওদের বাড়িতে গিয়েছিলে? ওই প্রফুল্লদের বাড়িতে ঢুকতে নিষেধ করিনি আমি?
–কুন্তলাদি ভালবাসে, যেতে বলে, তাই যাই।
–সবসময় কুন্তলাদি, কুন্তলাদি করে হাঁফিও না তো! সেদিন তোমার ওই কুন্তলাদিকে বিধবা করে ছাড়তাম। তাতে জেল, পুলিশ যা হওয়ার হত। আমার প্রতিবেশী হয়ে আবার আমারই নামে মামলা করবে বলেছে! প্রফুর স্বভাব-চরিত্র জানো?
জানে সুভদ্রা। কুন্তলাদির স্বামী মদ খায়। খারাপ জায়গায় যায়। কোনও কোনওদিন রাত্তিরে বাড়িও ঢোকে না। বদ লোকের সঙ্গে মেশে। তার জন্যে। কুলাদির অবশ্য কোনওরকম অভিযোগ নেই। প্রফুল্প রেশনের ডিলারশিপ নিয়ে দিনদিন পয়সায় একেবারে কেঁপে ফুলে উঠছে। চারিদিকে যখন চালের আকাল তখন সে জানিয়ে দিল দিনের দিন রেশন না তুললে পরের দিন আর পাওয়া যাবে না। গরিব-গুর্বো মানুষগুলো ঠিকসময়ে পয়সা যোগাড় করতে পারে না। তাতে প্রচুর লাভ যোলো আনা। রেশনের চাল বেশি দামে বিক্রি করে ফয়দা তুলেছে সেসময়টায়। সেই নিয়ে মন্মথর সঙ্গে একদিন হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। লক্ষ্মীর ফসল খুঁটে খুঁটে যে দুখবর্ণ চাল বেরোয় তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা! কিন্তু কুন্তলা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। পুরুষের বিবাদ পুরুষদের মধ্যেই থাকুক। তাই কুশুলাদির কাছে যায় সুভদ্রা। অথচ মন্মথ বারণ করে, প্রফুর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে সাবধান করে দেয়। সুভদ্রা শাদা-মাটা। গলায় বলে জানি। সেইজন্যেই বুঝি ওদের বাড়িতে গেলে তোমার ভয় হয় গাছে কুন্তলাদির স্বামীর কুনজর পড়ে আমার ওপরে! তা, হওয়াটাই স্বাভাবিক। তোমার মতো একজন বিচক্ষণ পুরুষের মাথায় এরকম চিন্তা তো সবার আগে আসবে। আহা, ভাবনাচিন্তাটুকু যদি সাতবছর আগে করতে! কেন যে তখন বিয়ে করার শখ হয়েছিল!
–সুভদ্রা, তুমি খুব অসুখী, তাই না! মন্মথর গলা হঠাই খাদে নেমে গেল। হাসল সুভদ্রা, অথচ হাসিটুকু একেবারেই নিষ্প্রভ, বলল—অসুখী কেন? দুঃখের বোঝায় চাপাপড়া এক কন্যাদায়গ্রস্ত ব্রাহ্মণকে তুমি উদ্ধার করেছিলে, এবড় মনুষ্যত্ব কজনের আছে! …..কুন্তলাদির বাড়িতে যাওয়া নিয়ে অনেকবার অশান্তি করেছ, নানসন্দেহ করেছ, আজও করছ। বু আমি কথা শুনি না। কেন জানো? কুন্তলাদির ওই ফুটফুটে ছেলেটা আমাকে বড় চিনেছে, তাই না গিয়ে থাকতে পারি না।
এরকম পারিবারিক অশান্তি গত সাবছরে অনেকবার হয়েছে। তা সত্ত্বেও মিলজুল করে দিব্যি কেটে যাচ্ছে ওদের দাম্পত্যজীবন। মন্মথর রক্তে এক ধরনের সন্দেহপ্রবণতা আজন্ম প্রতিপালিত। অথচ, সুভদ্রা সাময়িক রাগারাগি, অশান্তি করলেও পরক্ষণেই জুড়িয়ে যায়।
একই সংসারের মধ্যে পরস্পরের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ থাকলে অস্বস্তি বাড়ে। সেই পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্যে একসময় সুভদ্রাই বলল-যাদের পিছুটান থাকে না তারা মাঝে মাঝে বাইরে বেড়াতে যায়, তাহলে মনটাও হাকা হয়।
–যাবে? চলল, দিনকয়েক না হয় কোথাও চলে যাই। মন্মথ ঠাণ্ডগলায় বলল।
-–থাক, ওকথা অনেকবার শুনিয়েছ, কান পচে গেছে আমার।
–সত্যি বলছি। আমারও খুব একঘেয়ে লাগে। চলো, সামনের মাসে দেওঘর থেকে ঘুরে আসি। জায়গাটা ভালো। স্বাস্থ্যকরও।
সারাদিন ওদের সংসারে যে গুমোট আবহাওয়া চলছিল, একসময় সেখানে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। সুভদ্রার চুলে বিলি কাটছে মন্মথ। তার সোহাগ চুল থেকে মুখে। গালে। ঠোঁটে। সুভদ্রার মাংসল শরীরের উত্তাপে তৃপ্তি পাচ্ছে মন্মথ। তার যুবতী বউ এই আদরটুকু পেয়েই পরম শান্তিতে চোখ বুজে আছে।
.
একটি নিঃসংকোচ স্বীকারোক্তি
প্রফুল্ল জরুরি কাজে বাইরে গেছে। রাত্তিরে ফিরবে না। কুন্তলা বাড়িতে একা। ছেলেটা সন্ধে থেকেই কাদছে। কী হয়েছে কে জানে, কিছুক্ষণ থামে তো আবার কাঁদে।
কুন্তলা একসময় ভীষণ ভয় পেয়ে সুভদ্রাকে ডাকল—একবার এসো ভাই, : কেন যে ছেলেটা কাঁদছে জানি না, তোমাকে দেখলে যদি থামে।
মন্মথ বাড়িতে নেই। সতীর ডাঙায় গেছে। সেখানে এখন সারি সারি তাবু পড়েছে। লোকজনের ভিড়ে এলাকা জমজমাট। পাথুরে জমির ওপরকার কঠিন আস্তরণ সরিয়ে ফেলে সুপ্ত প্রাণের সন্ধানে শুরু হয়ে গেছে বিরাট কর্মজ্ঞ। সারারাত্তির আলো জ্বলে। বাজেনীলপুরের প্রচ্ছন্ন বেকার মানুষগুলো সেখানে ঠিকে কাজ পেয়েছে। কুমারী মাটির গর্ভে নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।
সুভদ্রা এল। ছেলেটাকে কোলে নিয়ে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে দূরের আলো দেখাল, আকাশের চাঁদ দেখাল। গুনগুন করে গান শুনিয়ে ভোলাতে চাইল শিশুকে। কুন্তলা অসহায়ভাবে বলল-পেটে লাগছেনা তো?
