মণিবালা নিরাপদ কণ্ঠে বলল, না। ওখানে যাওয়া নেই।
-কেন?
–মা তোমাকে থাকতে দেবেন না।
—তাঁর জামাই জেনেও?
মণিবালা ফোঁস করে উঠল, জামাই! জামাইয়ের মুখে ঝাঁটা। বউরাখার মুরোদ নেই। মামার টাকায় পকেট গরম। তোমার লজ্জা করে না?
ন্যাপা কোনো মতে নিজেকে সংযত রাখল। বলল, এসব কথায় সমস্যা মিটবে না মণি। অন্তত সাতদিনের জন্য কোথায় থাকা যায় বলো। তেমন মনে করলে আমার এই আংটিগুলো বেচে ক-দিন হোটেলে ওঠা যায়। তুমি যেমন বলো।
কাল সন্ধ্যে থেকে একটু আগে অবধি সমানে কেঁদে এইমাত্র মণিবালার চোখ শুকিয়ে গেছে। চোখ দুটো বেজায় ফোলা আর লাল, কিন্তু হঠাৎই একদম নিরস্তু। ও ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা পাফ বার করে চোখের কোণে, গালে, থুতনিতে, কপালে বোলাতে বোলাতে বলল মুরারির ওখানে।
‘মুরারির ওখানে!’ শব্দ দুটো বিশাল দুই মেঘখন্ডের মতো দিনটাকে অন্ধকার করে দিল ন্যাপার। ওর মনে হল গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দেয় নদীর দিকে। স্টিয়ারিঙে মাথা ঠোকারও প্রচন্ড বাসনা হল। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই করল না ন্যাপা। ও শুধু গাড়ি স্টার্ট করে গুটিগুটি রওনা দিল শহরের উত্তর পল্লির দিকে। বউকে বলল, মুরারির বাগানবাড়ি আমি চিনিনে। রাস্তা বলে যাও।
কম অনুরোধ-উপরোধ করেনি মণিবালা। বলেছে, আমাদের বার করে দেওয়ার লোক মুরারি নয়। তুমি থাকো আমার সঙ্গে। আমায় বায়োস্কোপ করতে দাও, এ ঝড় কেটে যাবে।
মুরারি বললে, শোনো নৃপেন, এ বাড়ি আমার। কোনো শালাও তোমায় এখানে থেকে হঠাতে পারবে না। তুমি থাকো এখানে যদ্দিন খুশি মণিমালাকে নিয়ে। এ তোমাদের সুখের সংসার হবে। আমি মাঝে মাঝে আসব, তোমাদের সুবিধে-অসুবিধে দেখব, তোমার সঙ্গে দু পাত্তর না হয় খাবও। তুমি কিন্তু ভায়া যেও না। কোথাও যেও না। আমার বাগান ফাঁকা হয়ে যাবে।
চোখ ফেটে জল আসছিল ন্যাপার। অশেষ চেষ্টায় তা সামলে মুরারিকে বলল, না। আপনার বাগান ফাঁকা হবে না। আপনার মণিমালা রইল। আমি যাই।
বেরিয়ে এসে গাড়িতে স্টার্ট দিতেই কান্নাটা ঠিকরে বেরিয়ে এল। গাড়ি নিয়ে কোথায় যাবে জানে না, তবু গাড়ি চলছে। মণির দেওয়া পান্নার আংটিটা একবার দেখল। একবার ভাবল ছুড়ে ফেলে দেবে, পরমুহূর্তে মনে হল—না থাক, এই একটু স্মৃতিই তো। যত স্বল্পমেয়াদের জন্যই হোক, মণিবালার স্বামীই তো।
একটা মোড়ে এসে আটকে পড়ল গাড়ি। মণিবালার দেওয়া সিগারেটের ফের একটা ধারাল ন্যাপা। ভাবল, স্বামী। দুর দুর নিকুচি করেছে স্বামী। হঠাৎ করে নায়িকার প্রথম স্বামী থেকে পঞ্চম বাবুতে নেমে এসেছে ও।
জ্যাম কাটতে ন্যাপ স্পিড ওঠাল মল্লিকবাজারের দিকে যাবে বলে। গাড়িটা বেচতে পারলে মামার টাকার অন্তত কিছুটা শোধ হয়। মা-র ওখানে চিলেকোঠার ঘরটা যেন ইশারায় ‘আয়! আয় করে ডাকছে। মল্লিকবাজারে গাড়িটা ছেড়ে ন্যাপা স্টপে গিয়ে দাঁড়াল ট্রাম ধরবে বলে। আর ভীষণ একলা একলা লাগল নিজেকে। মাত্র ক-দিনের অভ্যেস, তাতেই কী একটা ঘটে গেছে যেন কোথায়।
মতিনউদ্দিনের প্রেম – সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
মতিনউদ্দিন মেদমাংসশূন্য ক্ষীণ কাঠামোর ক্ষুদ্র আকৃতির মানুষ। ক্ষিপ্রবেগে চলার অভ্যাস সত্ত্বেও পথেঘাটে সে সহজে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। বাচালতা দোষ। নেই বলে অন্যদের মতো অজস্র কথায় সৃষ্ট একটি স্পর্শনীয় দৃশ্যমান চরিত্রও তার নয়। আপিসে দীর্ঘ বারান্দা-ঘরের সহযোগীদের মতো রাজনৈতিক সামাজিক ব্যাপারে তার মতামত থাকলেও কচিই তা সে প্রকাশ করে। কেবল চাল-ডালের দামের কথা উঠলে সে একটি বিশেষ মন্তব্য না করে যেন পারে না। একই ভঙ্গিতে একই স্বরে সে প্ররি বলে, শায়েস্তা খানের আমলে এক মণ চাল পাওয়া যে মাত্র দু-আনায়। উক্তিটা সত্য হলেও তা এখন সময় কালবহির্গত এবং বাস্তব হতে এত দূরস্থিত শোনায় যে তার সে-ঐতিহাসিক মন্তব্যটি শুন্যে বুলে মিলিয়ে যায়। সে-সব্যটিও তার সহযোগীদের মনে তার সম্বন্ধে স্বল্পভাষী নলাজুক মানুষের ছবিটিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনে না।
তবে বাড়িতে পা দেওয়া মাত্র সেমানুষেরই চেহারা-হাবভাবে একটি বিষম পরিবর্তন ঘটে। বাইরে মতিনউদ্দিন এবং ঘরের মতিনউদ্দিনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। ইট-তর্জা, টিনযোগে কোন মনে দাঁড়া করিয়ে রাখা তার ক্ষুদ্র বাসস্থানটি তার নতুন চরিত্রে স্পর্শে প্রাসাদে পরিণত হয়, এবং ঘরে তার স্ত্রী ছাড়া দ্বিতীয় কোন লোক
থাকলেও মনে হয় যেন তার হুকুম তামিল করবার জন্য মোসাহেব-গোমস্তা বাবুর্চি-খানসামা পেয়াদা-কাবরদারের অন্ত নাই। তখন তার ত্রিশ-ইঞ্চি বুক থেকে অহরহ বাঘের মতো আওয়াজ বের হয়। তবে বন-জঙ্গলের শক্তিশালী পশুটির মতো তার সিনাটা গভীর নয় বলে মনে হয়, নিনাদ প্রচেষ্টায় যে-কোন সময়ে তার রগ ফেটে যাবে। মতিনউদ্দিনের খড়মেও কম আওয়াজ হয় না। বরাবর দেখে-শুনে শক্ত মজবুত খড়ম কেনে সে। বস্তুত, তার ঘরের জাদরেল সত্তাটির একধারে তার গলা অন্যধারে। খড়ম।
তিন বছর হলো তাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু তার বউ খালেদা এখনো জানে না। কখন তার স্বামী হুঙ্কার দিয়ে উঠবে, কখন হুড়ুম করে লাফিয়ে যাবে উঠান থেকে কাক কুত্তা তাড়াতে। সেজন্যে সত্যিই পান থেকে চুন খসার প্রয়োজন নাই, উঠানে কাক কুত্তার উপস্থিতির দরকার নাই। দিনের মধ্যে কতবার যে খালেদার বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে, তার ঠিক নাই।
